বড় বসার হলঘরটির পাশের ঘরে মেয়েরা জমায়েত হয়েছে। এ ঘরটি অনিন্দিতা প্রথমেই তাদের দেখিয়েছিল। এটি তাদের গেস্টরুম। চকিতে মনে পড়ল ওদের বাড়িটার কথা। তাদের বাড়িতে দুজন অতিথি এলেই, শ্যাম তার ছেলেকে নিয়ে ওই এক চিলতে বারান্দায় গিয়ে শোয়। বাচ্চাটাকে একবার ইঁদুরে কামড়েছিল। সে কী কাণ্ড মাঝরাতে। রক্তারক্তি ছেলের কান্না, পাড়ার ডাক্তারকে ঘুম থেকে তুলে এনে ওষুধ আর ইনজেকশন এবং সবকিছু মিটে যাওয়ার পর শুরু হয়েছিল দীপার উগ্রপন্থী হানা শ্যামের উপর। সেবার ওদের বাড়িতে দীপারই মা আর দাদা বেড়াতে এসেছিল। ওদের দুজনকে সাক্ষী মেনে শ্যামকে তুলোধোনা করেছিল সে। মা আরা দাদা অবশ্য ওকে ঠাণ্ডা করতে চেয়েছিল। দীপা আঙুল তুলে শাসিয়েছিল ভাল বাড়ি কিংবা জমির ব্যবস্থা করতে না পারলে সে তার ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে। অন্য পুরুষ মানুষ হলে সেও রোখ দেখাত। বলত, দেখেশুনেই তো বিয়ে দিয়েছিল তোমার। বাড়ির লোক। না পোষায় পথ দেখ। কিন্তু শ্যামের পথটা সেরকম না। কথার পিঠে কথা তার আপনিই আসে কাগজে আর কলমে। কিন্তু দীপার তিরস্কারের সময় সে। দাঁড়িয়েছিল দরজার পাশে অপরাধীর মতো। দীপার অগ্নিবাণ হানা শেষ হলে শ্যাম বলেছিল, হ্যাঁ এবার একটু জমি কিংবা বাড়ি ব্যস এইটুকুই।
অতিথিদের ঘরটাও দেখবার মতো। ঘরটা দেখলেই মনে হয়, থেকে যাই ক’টা দিন। মস্ত মস্ত জানলায় আলপনা দেওয়া গ্রিল। রোদ আর বাতাস ঘরে ঢুকছে ডাকাতের মতো। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে স্বকিছু। একটা সিঙ্গল খাট, এক কোণে আলমারি, একটি লেখার টেবিল আর চেয়ার ধ্বই দামি কাঠের। পালিশের গন্ধে নাক জ্বালা করে সামান্য, আবার ভালও লাগে। এঘরের রঙ হয়েছে ডিমের খোলার রঙ-এ। চার দেওয়ালে চারটি বাহারি আলোর শে। কত দাম কে জানে? কথায় কথায় অনিন্দিতা জানিয়েছিল এ ঘরের অনেক আসবাবই এখনও নাকি বাকি। দীপা ভাবল, সব কটা আলো জ্বালিয়ে দিলে ঘরটাকে কেমন দেখাবে।
এ ঘরটিতে দীপার পরিচিত্র চেয়ে অপরিচিত মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেশি, শ্যামের বন্ধুদের স্ত্রী যারা তাদের সামনে দীপা তবু সহজ হতে পারে। কিন্তু এরা যে দীপার কাছে একেবারেই ভিনদেশি। মহার্ঘ শাড়ি গয়না আর বিদেশি রূপটানের চোখ ধাঁধানো জৌলুসে দীপার কোণঠাসা অবস্থা। আবার তার অস্বস্তি শুরু হয়। অনেকেই দেখছে তাকে। বহুচোখের দৃষ্টির আড়াল খুঁজতে সে জায়গা করে নিল শিবাজীর স্ত্রীর। পাশে। এক অতি ভয়ঙ্কর দর্শনা সুন্দরীর সঙ্গে শিবাজীর স্ত্রী মীরা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছিল। দীপা পাশে বসতেই মীরা হাসল। বলল, ‘বস। আলাপ হয়েছে তো? মিসেস চাকলাদার। সৌরভদার অফিস কলিগ।’ ভীষণ দর্শনার চোখ দুটি মস্ত বড়। অনেকটা আতসকাঁচের পিছনে থাকা চোখকে যেমন দেখায়। সে চোখে নানা অভিব্যক্তি ভেসে বেড়াচ্ছে। মহিলার ডান হাতে জলের গ্লাস খুব কায়দা করে ধরা। আলাপ হতেই বাঁ হাতের দুটো আঙুল আরশোলার গুঁড়ের কায়দায় নাড়িয়ে বলল, হ-ই-ই, বলেই সামান্য চুমুক দিল জলের গ্লাসে। দীপা গালের পেশিগুলোকে খুব কষ্ট দিয়ে সামান্য হাসি ফোঁটাল।
করালবদনা ফের ফিরে গেল তাদের আলোচনায়। টাটা-সিয়েরা আর মারুতি ওয়ান থাউজেন্ড এর মাঝে তুল্যমূল্য একটা আলোচনা হচ্ছে। মীরা যখন দীপার সঙ্গে মেশে তাকে তখন দিব্যি আটপৌরে আর ঘরোয়া মনে হয় কিন্তু এখন সে পাল্লা দিয়ে ভীষণ দর্শনার সঙ্গে বাড়ির আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ব্যাপারে অবশ্য মীরা অনেক ঋই রাখে। ওর স্বামী শিবাজী নামকরা সার্জন। ছুরি ধরলেই নাকি দশ হাজার তার দক্ষিণা। বছরে একবার গাড়ি পাল্টায় সে। এ ঘ খবর গর্বভরে শ্যামই শুনিয়েছে তাকে। গাড়ির আলোচনা শুনতে শুনতে দীপার মনে হল, আজ সে একটা ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। অনিন্দিতা অনেকগুলো জলের গ্লাস নিয়ে ঢুকছে। গ্লাসগুলোর খুব কায়দা, যেন স্ফটিকের তৈরি, এটা কী কাটগ্লাস? কে জানে? তবে জলের গ্লাস দেখে দীপার তেষ্টাটা হঠাৎ চাগাড় দিয়ে উঠল। গলা তো এসে ইস্তক শুকিয়ে আছে। প্রখর গ্রীষ্মে মরে যাওয়া কোনও নদীর মতো। আসন ছেড়ে উঠে একটা গ্লাস তুলতে যেতেই অনিন্দিতা মাথা নাড়ল। মৃদু স্বরে বলল, তোমারটা আনছি ভাই। দীপা ভাবল, ওকে আলাদা করে আপ্যায়ন করার জন্য অনিন্দিতা বোধ হয় রবত দেবে ওকে। ও তাই ব্যস্ত হয়ে বলল, না না, আমাকে শুধু জলই দাও। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। অনিন্দিতা সু ট্রেটা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল অন্য দিকে। অনেকেই দেখল ব্যাপারটা আর তাতেই অপমানে শরীর গরগর করে উঠল। সামান্য এক গ্লাস জল চাওয়াতে অনিন্দিতা এরকমটা করল? ব্যাপারটা মীরারও নজর এড়ায়নি। দীপার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, ওটা জল নয় ভাই। জিন উইথ লাইম। জলের মতো দেখায়। দীপা বুঝে নিল, ওর অজ্ঞতাকে সামান্য মেরামত করে দিল ও। ইতিমধ্যে অনিন্দিতা তড়িঘড়ি এক গ্লাস জল পাঠিয়েও দিয়েছে। তু ওই কয়েক মুহূর্তের জন্য অপদস্থ হওয়ার গ্লানি ওকে খোঁচাতে থাকল অনবরত।
এখন সবে বেলা এগারোটা। কজি উলটে ঘড়ি দেখল দীপা। সারাটা দিন পড়ে আছে। অপ্রস্তুত হওয়ার মতো আরও কত কী বাকি কে জানে। এই ব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ও প্রতিজ্ঞা করল, এই শেষ। আর কখনও এদের সঙ্গে মিশবে না। ছেলেটাকেও যদি আজ সঙ্গে আনত, ওর সময় কাটত। কিন্তু মদ্যপানের ব্যবস্থা থাকলে সেখানে বাচ্চাদের আনা যাবে না—এমন একটা চুক্তি আছে শ্যামের বন্ধুদের। দীপা একবার ভাবল, শ্যামের কাছেই গিয়ে বসে। কিন্তু মানুষটার উপর এত রাগ জমা হচ্ছে যে চিন্তাটাকে ও নির্দয়ভাবে সরিয়ে দিল মন থেকে, একটু পরই সৌরভ এল ঘরে। চেঁচিয়ে বলল, শ্যামের গল্প পাঠ শুরু হচ্ছে। যারা শুনতে চান, চলে আসুন এ ঘরে। অনেকেই গেল। অমিতার স্ত্রী কল্পনা বলল, চল, তোমার কর্তার গল্প শুনবে না? দীপার খেয়াল হল, বাড়ি থেকে বেরুবার সময় একটা ঝোলাতে লাল খেরোর খাতা একটা পুরেছিল বটে শ্যাম। বাহাদুরি নেওয়া হবে এখন, দীপা বলল, আমার শোনা তো ধ্বই। তোমরা যাও। আমি একটু ঘুরে ফিরে দেখি। র ফাঁকা হতে ও আবার ব্যালকনিতে গিয়ে চোখ মেলে দিল সুদূরে। দুপুরে খেতে বসে ছেলেটার কথা খুব মনে হচ্ছিল। ভাল মন্দ খেতে ভালবাসে পাপুন। কলকাতার সেরা কেটারারকে দিয়ে রান্না করানো হয়েছে। ছাদে ম্যারাপ বেঁধে সেখানেই হয়েছে রান্না আর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। এক এক রকমের খাবার পাতে পড়ছে তো পড়ছেই। মস্ত বড় সোনালি গলদা চিংড়িটা যখন পাতে পড়ল, দীপা চমকে উঠল মাছের সাইজ দেখে, এত বড় চিংড়িও হয় তাহলে। ওর খুব লজ্জা করছিল মাছটা খেতে। ছোটখাটো জাহাজের চিমনির মতো মস্ত চেহারা নিয়ে মাছটা পড়েছিল ডিশের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে। ও দেখে নিল চারপাশের কে কীভাবে মাছটাকে বাগে আনছে। একটু দূরেই শ্যাম বসেছে খেতে বন্ধুদের মধ্যমণি হয়ে। দীপা দেখল সে খাচ্ছে যা তার চেয়ে গল্পই করছে বেশি।
