বুড়ি যাওয়ার পর শ্যামের চোখে তো জলই এসে গেল। মানুষ কেন যে আমাকে এত ভালবাসে? খুবই আবেগের সঙ্গে জানতে চেয়েছিল সে। দীপার উত্তরটাও হয়েছিল জুতসই। ও বলেছিল, সত্যি আমিও ভাবি লোকেরা কি দেখে তোমায় এত ভালবাসে? এক এই আমিই রয়ে গেলাম পৃথিবীতে। চেষ্টা করেও ভালবাসতে পারিনি। খোঁচাটা অবহেলায় হজম করে শ্যাম। আমতা আমতা করে বলে,
না এসব কী বলছ? তুমি তো সবারই আগে। বলতে কি তোমার জন্যই তো বু বেঁচে থাকাটা যাচ্ছে। নইলে কী যে হত? শ্যাম অসহায় ভাবে গালে হাত ঘষছিল তখন। দীপার একতরফা আক্রমণে রাব্বই বিপর্যস্ত বোধ করে শ্যাম। গলা তুলে ঝগড়া করতেও শেখেনি নোকটা। যা ইচ্ছে বলো, শুনে যাবে, তারপর ভুলে যাবে। সবকিছু। ওর এই আলুথালু অবস্থা দেখে আগে দীপার মায়া হত, এখন হয় না। সয়ে গেছে। খুব বাড়াবাড়ি রকমের চ্যাঁচামেচি হলে, শ্যাম তার স্বভাবমতো গালে হাত ঘষতে ঘষতে পাশের ঘরে যায়। তার ছোট্ট এক চিলতে লেখার টেবিলে সে খাতা খুলে বসে। দীপার ঝাঝালো কথাবার্তা কখনও বা শ্যাম তার গল্পের নায়িকার মুখে বসায়, খুবই নাকি বাস্তব হয় সে সব সংলাপ। তার লেখা গল্প কিংবা কবিতা এদিক ওদিক ছাপা হয় আজকাল। আর তাতেই সে গর্বে এবং আল্লাদে আটখানা। লেখার টেবিলে বসলে যাই বল আর যাই কর, শ্যাম তখন সমাধিস্থ প্রায়। এ মানুষকে নিয়ে কী যে হবে?
তুমি এখানে কী করছ? তোমাকে খুঁজছি যে আমরা আনন্দে আইসক্রিমের মতো গলতে গলতে বলল অনিন্দিতা। বিষম ভাল লাগছে চারপাশের ধ্বকিছু। এখানটায় এসে তাই আটকে গেছি, আধ-সত্যি কথাটা বলে দীপা অনিন্দিতার দিকে চেয়ে রইল। মেয়েটা বেশ আলাভোলা টাইপের। কখনও সিরিয়াস হয় না। দিব্যি বিশ্বাস করল কথাটা। বৈ আবার কিছু সারল্যও দেয় তাহলে? দীপা ভাবল। অনিন্দিতা বলল, ‘হ্যাঁ গো। জায়গাটা দেখেই প্রেমে পড়ে গেলাম। সুন্দর বলেই তো বাড়িটা বানালাম এত খরচাপাতি করে। কলকাতার কাছেই অথচ দেখ কেমন দিব্যি গ্রাম।‘ ‘এখানে বরাবর তোমরা থাকবে?’ দীপার প্রশ্নে ভুরু কোচকাল অনিন্দিতা। ভারী সুন্দর লাগল ওকে এই ভঙ্গিটিতে। ‘খেপেছ? দশ মাইলের মধ্যে কোনও আত্মীয়স্বজন নেই। ক্লাব নেই, ডাক্তার নেই, পার্লার নেই—আরও কত কিছু যে নেই। তা ছাড়া জানই তো আমার ছেলে দেরাদুনে সায়েব তৈরি হচ্ছে। বড় হয়ে এ বাড়িতে উইকএন্ড কাটাতে আসবে। মাঝে মাঝে আসব আমরা হাওয়া বদলাতে।‘
ব্যালকনির তলায় বেশ সুন্দর মরসুমি ফুলের গাছ বসানো হয়েছে। কয়েকটা গাছে ফুল ধরতেও শুরু করেছে। দীপা নিশ্চিত এ বাগান একদিন ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে। একবার রাসবিহারীর রথের মেলা থেকে একটা বিশুদ্ধ বেলফুলের গাছ। কিনেছিও। তাদের বলরাম বসু লেনের বাড়ির এক চিলতে বারান্দায় রাখা হয়েছিল সে গাছ ক’বছর আগে। গাছটা অবশ্য বেঁচে আছে আজও। তবে ফুল ধরেনি। আর এদের এই নতুন বাগানে গাছ লাগাতে না লাগাতেই কেমন ফুল ধরতে শুরু করে দিয়েছে। ফুলোও বুঝি বড়লোকদের বাগানে ফুটতেই বেশি ভালবাসে। এই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দীপার নজরে এল, ওদের পাঁচিলের ধারে বেশ কয়েকটা মারুতি আর দু একটা অ্যামবাসার জমা হয়েছে। গাড়িতে আগত সকলেই সৌরভদের সহকর্মী এবংশৈশবের ক’জন বন্ধু।
গাড়িতে চড়ে অবশ্য দীপাও এসেছে। শ্যামের বন্ধু অমিতাভ থাকে এলগিন রোডে। দীপা আর শ্যামকে ওই-ই তুলে এনেছে। নইলে ট্রেনে আর বাসে আসতে হত। ওদের পক্ষে সেটাই অবশ্য দেখাত স্বাভাবিক। নিজে কস্মিনকালেও একটা গাড়ি কেন গাড়ির একটা চাকাও কিনতে পারবে কিনা সন্দেহ। অথচ বন্ধুবান্ধবদের গাড়ি চড়ার সময় শ্যামের সে কী ফুতি। যেন নিজেরই গাড়ি। অমিতাভর পাশে বসে হেঁড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে এল অর্ধেকটা পথ। বেহায়া আর কাকে বলে।
—আরে এই চলল, ভিতরে চলো।
অনিন্দিতা সুরে বাজল।
-হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। কর্তারা স্ব গেলেন কোথায়?
–কোথায় আর যাবেন? একজনের হাতেই তো সবার ঝুঁটি বাঁধা। তিনি যেখানে তাঁরাও সেখানে।
দীপা বুঝল, শ্যাম তার অভ্যেসমতো ইস্কুল খুলে বসেছে। কাজের মধ্যে তো তার এই বই আছে। হয় চেয়ারে কুঁজো হয়ে বসে গল্প কিংবা কবিতা ফাঁদছে। নয় নানারকম বই পড়ে তা থেকে জ্ঞান ফেরি করে বেড়াচ্ছে। ওর বন্ধুরা ব্যস্ত মানুষ। পড়াশোনার সময় কম। কাজেই অবরে ঘরে শ্যামের এসব কথা শুনতে তাদের ভালই লাগে। তারা তাই ছাত্রের মতো মনোযোগী হয়ে শোনে শ্যামের মুখামৃত। বন্ধুরা তাই এরকম জমায়েত হলেই বসে শ্যামের ইস্কুল। আর বোকারাম তাতেই কৃত কৃতার্থ।
একতলাতে নেমে এল ওরা। বদ্বার ঘরটা একটা ছোটখাটো হলঘরের মতো। সেখানে জোর আড্ডা বসেছে। হাল্কা বুজ প্লাস্টিক পেন্টে রাঙানো ঘরে, খরগোশের ললামের মতো তুলতুলে কার্পেট। ইতস্তত পাতা হয়েছে উজ্জ্বল কমলা রঙ-এর গদি আঁটা হাল ফ্যাশনের সোফাসেট এবং বেত অথবা বাঁশের তৈরি দেখনদার চেয়ার। মাঝে মাঝে সেন্টার টেবিল পাতা রয়েছে। ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিদেশি ফ্রেশনারের গন্ধ। পুরুষেরা বসে আছে কাছাকাছি। শ্যামের বন্ধুরা ছাড়াও সৌরভের কিছু অফিস কলিগ এবং দু’একজন আত্মীয়ও রয়েছে সেই দলে। বেশির ভাগ মানুষের হাতেই পানীয়ের গ্লাস। হুইস্কির গন্ধটা দীপার চেনা। এরকম জমায়েত হলেই গন্ধটা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ব্যতিক্রম শ্যাম। ওর হাতে ধরা একটি স্কোয়াশের গ্লাস। সবাই শ্রোতা এ ঘরে। বক্তা একজনই। ঘর জ্বালানে-পরভোলানে শ্যাম। দীপা শুনল স্টিফেন হকিং-এর ব্রিফ হিষ্ট্রি অফ টাইম বইটি নিয়ে শ্যাম তার বক্তব্য রাখছে, বইটা কিছুদিন আগে লাইব্রেরি থেকে এনে রাত জেগে শেষ করেছিল। উৎসাহ নিয়ে দীপাকেও জানিয়েছিল সে বই সম্বন্ধে। দীপা দেখল শ্যামকে। যেন এক অচেনা মানুষ। চারপাশের মানুষজন এখন তার কাছে অদৃশ্য। মহাবিশ্ব, ছায়াপথ, কৃষ্ণগহ্বর এবং সময়ের মতো জটিল ব্যাপার নিয়ে শ্যামের এখন তুরীয় অবস্থা। সহসা দীপাকে দেখে সে মুহূর্তের জন্য আড়ষ্ট হয়। একটু অপ্রতিভ হাসি হেসে বোকার মতো ডান হাতটা একটু তুলল। তারপরেই ডুবে গেল ফের মহাবিশ্বের অলৌকিক গহ্বরে। এমনভাবে বইটা সম্বন্ধে অনর্গল বলে যাচ্ছে যেন এ তারই লেখা। মন খারাপ হওয়া সময়ের মাঝেও সামান্য গর্ব হল দীপার।
