তারপর বাবুলের পাশে বসে আহত স্থানগুলোতে নরম নরম চাপ দিলে দেখতে পেল টেবিলে নীল আলো জ্বলছে। রাত ক্রমে গভীর হয়ে আসছে। কোথাও আর যেন রাতের কীটপতঙ্গ ডাকছে না। ধরণী শান্ত এবং স্থির। সে দেখতে পেল তখন। নীল আলোর ভিতর দুই ছবি। রাম রাবণের ছবি। রামের মাথায় রাজার টুপি রাবণের মাথায় কাক। নীচে বাবুল ভালো নামে সই করেছে–শুভাশিষ। রাত ক্রমে আরও গভীর হয়ে আসছে। সতীশের এখন সারাদিনের ঘটনা এক দুই করে মনে হতে থাকল। তেওয়ারীর বউটা বোধহয় বসে বসে এখনও কাঁদছে। সংসারে কি যে শুভ কি যে অশুভ এ সময় সে কিছুই স্থির করতে পারল না। কেবল দেখল বাইরে বাবুলের রেলগাড়িটা সাদা জ্যোৎস্নায় পড়ে আছে। বর্ষাকালের বৃষ্টি—এই আসে এই যায়, এই সাদা জ্যোৎস্না এই অন্ধকার। বাবুলের রেলগাড়িতে সে যেন এখন একা বসে আছে। কেউ নেই। সকলে ওকে এক বড় মাঠে ফেলে কোন এক অজ্ঞাত স্টেশনে নেমে গেছে। সে শুধু এনজিনটা নিয়ে মাঠের ভেতর ভূতের মতো রেলগাড়ি হয়ে গেছে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠলে সে আর রেলগাড়ি থাকল না। বাবুলের জন্য রাজার টুপি কিনে আনতে হবে, সুতরাং সতীশ ঘরের সব দরজা-জানলা খুলে দিল। সে যে ক্রীতদাস এ সংসারে—তা আর মনে থাকল না। সে বাবুলকে কাঁধে নিয়ে পাতাবাহারের গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে ভোরের সূর্য দেখতে দেখতে বলল, সামনের দিকটাকে আমরা পুবদিক বলি, ডানদিক দক্ষিণ, পেছনের দিকে সূর্য অস্ত যায় বলে পশ্চিম এবং বাঁদিকে—তুমি যত দূরেই চলে যাও না উত্তর দিক হবে। সতীশ ছেলেকে কাঁধে নিয়ে ভোরবেলায় আজ কি ভেবে দিকনির্ণয় শেখাতে থাকল।
রোদ বৃষ্টি কুয়াশা – বামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
একটা চকচকে নতুন বাড়ি দেখলেই মানুষের মন ভাল হয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দীপার বেলায় ঘটল ঠিক উল্টোটা। ওদের সবাইকে নতুন রান্নাঘরটা যখন খুব উৎসাহ নিয়ে দেখাচ্ছে অনিন্দিতা, সকলের অলক্ষ্যে সেখান থেকে গুটিগুটি বেরিয়ে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়াল দীপা। তার থেকে থেকে কী যে হয়। বেশ চলছিল। স্বকিছু। কিন্তু নতুন বাড়ি দেখানো শুরু হতেই, ধ্বকিছু অসহ্য লাগতে শুরু করল। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই ধানের গন্ধ মাখা বাতাস দৌড়ে এসে দীপাকে এলোমেলো করে দিল। ঝড়ের মতো হাওয়া বইছে সময় এ জায়গাটাতে। ওদের বলরাম বোস লেনের এঁদো বাড়িতে প্রবল ঝড়ের সময়েও এরকম হাওয়া কখনও ঢোকে না। সূর্য এখন বেশ খানিকটা উপরে উঠে এসেছে। শীতের রোদ বলতে যা বোঝায় তা বোধহয় এই, অনিন্দিতা আর সৌরভদের নতুন বাড়িতে। এমন বাড়িতে থাকলে মানুষের মনখারাপ হয় না। আলো, হাওয়া আর চারপাশের নিবিড় গাছগাছালিই তা হতে দেয় না। দীপা রেলিং-এ ভর দিয়ে দৃষ্টি মেলে দিল অনেকদূরে।
আজ সৌরভদের গৃহপ্রবেশ। দীপার স্বামী শ্যাম সৌরভের শৈশবের বন্ধু। সেই কোন আদ্যিকালে স্কুলের প্রথম বছরটি থেকে ওরা একসঙ্গে পড়েছে। শ্যাম বাদে আরও তিনজন শৈশব্রে সহপাঠীকে সৌরভ সস্ত্রীক নেমন্তন্ন করেছে। এছাড়া রয়েছে ওদের কিছু আত্মীয়স্বজন এবং অফিস কলিগ। সৌরভ এক মালটিন্যাশনাল কোম্পানির ডিরেক্টর, ওর স্ত্রী অনিন্দিতা কলকাতার এক নামী মেয়েদের কলেজের প্রফেসর, ওদের একটি মাত্র ছেলেকে ওরা ডুন স্কুলে পড়াচ্ছে। তবে সুখ আর বৈভবের মহাসমুদ্রে ভেসে বেড়ালেও ওরা ওদের বন্ধুবান্ধবদের প্রতি অকৃত্রিম এবং নির্ভেজাল। আর সেফ সেই খাতিরেই শ্যামের আজ এখানে সস্ত্রীক আমন্ত্রণ। সে কথা দীপা বোঝে ভাল করেই। সৌরভ আর শ্যামের মতো আরও যে তিনজনের এখানে সস্ত্রীক আমন্ত্রণ, তারা হল শিবাজী, অমিতাভ এবং সমরেশ। এই তিনজন এবং আজকের গৃহকর্তা সৌরভ এরা চারজনেই শ্যামের প্রাণের বন্ধু। একেবারে সেই স্কুলের প্রথম দিনটি থেকে। ওদের সঙ্গে মেলামেশা করে দীপা এটুকু বুঝেছে যে শ্যামের বাঁচা আর ওদের বেঁচে থাকার ফারাক কয়েক যোজনের। ওদের বাড়িঘর, ওদের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বাড়ির কাজের লোক প্রতিটি ব্যাপারেই একটা তুল্যমূল্য মিল খুঁজতে গিয়ে বারে বারে এই সত্যিটা মস্ত বড় হয়ে উঠেছে দীপার কাছে। বৈভব কিংবা বিত্তের অহঙ্কার চাপা থাকার নয়। কটুগন্ধি রসুনের মতোই তা শরীর ভেদ করে বেরোয়। মাঝেমাঝেই কথাবার্তার ফাঁকে ঢুকে পড়া কয়েকটি শব্দ দীপাকে বুঝিতে দেয় যে এ আসরে তারা কিছু কমজোরি।
দীপা অবশ্য এটা মানে যে শ্যামের বন্ধুরা শ্যামকে ভালবাসে তাদের অজ্ঞ। দিয়েই। সেভাবে চিন্তা করলে, জীবনের দৌড়-প্রতিযোগিতায় সবার পিছনে থাকা শ্যামকে যে তারা বন্ধু হিসেবে মানে এটা তার ভাগ্যই বলতে হবে। শ্যামও ভালবাসে তার বন্ধুদের। অবশ্য তার ভালবাসার লোকের সংখ্যা এ সংসারে কিছু কম নয়। নইলে বাজারে যে বুড়ির কাছ থেকে শ্যাম রোজ শাকপাতা কিংবা লেবু লঙ্কা কেনে, সে-ও কিনা তাদের বাড়িতে আসে শ্যামের খোঁজে। শ্যামের সেবার ক্যালকাটা ফিবার হয়েছিল। কদিন বাজারে যেতে পারেনি। আর তাতেই সে বুড়ি আকুল হয়ে ছুটে এসেছিল বাবুর খোঁজে। তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে শ্যামের সে কী উচ্ছ্বাস। বুড়ির সঙ্গে তার মারি সম্পর্ক পাননা। পুজোর সময় বুড়ি নাকি নতুন কাপড় পায়। দায়ে অদায়ে শ্যাম যে তাকে দু’পাঁচ টাকা দিয়ে থাকে তা জানাতেও কসুর করেনি বুড়ি।
