“বুঝবে না, বুঝবে না–।” যুথিকা অধৈর্য হয়ে উঠেছে, “মেয়ের তোমার গরম জামার অভাব আছে কিনা তাই একটা আঁটবুক, আধ কোমরে মেমজামা কিনে আনলে? ছি ছি,– চোখেরও একটা ভাল-মন্দ জ্ঞান থাকে মানুষের!”
“ফ্রকের সঙ্গে অমন জামাই ত পরে; মানানসই বলেই না কিনেছি।”
“যে পরে পরুক, আমার মেয়েকে আমি পরতে দেব না। বেহায়াপনার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছ তোমরা বাপবেটিতে। কী ভাবে লোকে—ছি ছি–! পনরো বছরের আইবুড়ো মেয়েকে তুমি-তুমি-” যূথিকা ঠোঁটের কথাটা যেন চেপে নিয়ে অনেক কষ্টে অন্য কথা টানল, “তুমি ফ্রক পরিয়ে রাস্তা-ঘাট ঘুরিয়ে আনছ!” ঘৃণায় নাক, চোখ, মুখ কুঁচকে ওঠে যুথিকার।
“বয়সটা এমন কি বেশি?” হিমাংশুকেও যেন আজ তর্কের নেশায় পেয়েছে, “শাড়ি সামলাতে পারবে কেন পুতুল?”
“আমরা কিন্তু পেরেছি।” যুথিকার গলায়, ঠোঁটে শ্লেষ ফুটেছে তীক্ষ্ণতর হয়ে, “পনরো বছরেই আমার বিয়ে হয়েছে; যোত বছরে মা হয়েছি। শুধু শাড়ি নয়, মেয়েও সামলেছি।”
বলার কথা আর খুঁজে পায় না হিমাংশু। তর্কের নেশাটাও হঠাৎ থিতিয়ে যায়। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে যেন ও পনরো বছরের সেই কিশোরী যুথিকাকে খেজবার চেষ্টা করছে এবং তুলনা করবার চেষ্টা করছে এই একত্রিশ বছরের যুথিকার সঙ্গে।
যুথিকাও উঠে পড়েছে। স্বামীর পাশে বসে থাকার মতন ধৈর্য নেই আর তার। অদ্ভুত একটা রিরি সারা গায়ে-মনে। অস্বস্তিকর, অসহ্য জ্বালা। বাইরে শীত; তবু সেই শীতের হাওয়ায় গিয়ে না দাঁড়ালে ঘামের মতন লেপটে থাকা এই অস্বস্তিকর জ্বালা থেকে যেন মুক্তি নেই।
বাঁ পা-টা টেনে টেনে যুথিকা চলে যায়। হিমাংশু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
তারপর দুটো দিন যূথিকা গুম হয়ে থাকে। যতদূর সম্ভব কম কথা বলে, গলার স্বর খাদে নামিয়ে সংসারে তার উপস্থিতিটাকে নিরাসক্ত রাখতে চায়। তিন দিনের দিন গুমট ভাবটা কাটতে শুরু করে, প্রদা চড়ে যুথিকার স্বরের। আড়ালে বাপ আর মেয়ে মজা পাওয়ার হাসি হাসে। ওরা জানে, যুথিকার রাগের বহর কতখানি, তার পরিণতি কোথায়। এবার জেরটা একটু বেশীক্ষণ স্থায়ী হল, এই যা। তা হোক, গুমট ভাবটা কাটার সঙ্গে সঙ্গে হিমাংশু আর পুতুল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। এখন কিছুদিন শাসনের রাসটা একটু আলগাই থাকবে। যূথিকার স্বভাবই তাই। মেয়ে বাপ-দুজনাই তা জানে। আর সেই কথা ভেবে দুজনাই পরম খুশি।
চারদিনের দিন পড়ল শব্বির। জানা গেল দুপুরে যুথিকা যাবে শিপ্রাদিদের বাসায়। ফিরবে সন্ধ্যেবেলায়। পুতুল স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতে একাই থাকবে, হিমাংশু যেন অফিসের ছুটির পর আড্ডা মারতে না গিয়ে সকাল সকাল বাড়ি ফিরে আসে।
স্কুলের বাসে ওঠার আগে পুতুল চুপি চুপি হিমাংশুকে তারিখটা স্মরণ করিয়ে দেয়, “আজই কিন্তু থারটিন্থ বাবা; ভুলো না! সেই রসিদটা আমি তোমার শার্টের বুকপকেটে রেখে দিয়ে গেলাম।”
রসিদের কথা ভোলেনি হিমাংশু, কিন্তু অফিসের পর অন্য এক ঝামেলায় পড়ে তার দেরি হয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে বেশ বিকেল। পুতুল তখন ঝি রাসমণির সাহায্যে পিঠের ওপর সাপের মত দুই বেণী ঝুলিয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছে।
বাবার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে খুশির দাপটে পুতুল বললে, “আমি ভাবছিলাম তৈরিই হয়নি বোধ হয়; দর্জিদের কাণ্ড ত! তুমি এত দেরি করলে কেন, বাবা?”
মেয়ের কাছে কৈফিয়ত দিতে দিতে হিমাংশু চেয়ারে বসল পা ছড়িয়ে। টানটান হয়ে। ঝুপ করে বাবার পায়ের কাছটিতে বসে পড়ল পুতুল। তড়িৎ হাতে জুতোর ফিতে খুলে, মোজা খুলে—জুতো জোড়া হাতে করে উঠে দাঁড়াল। ঘরের এক কোণে রাখল। বলল, “আমি তোমার চা করে আনি, হাতুমি একটু জিরও।”
“তা না হয় জিরচ্ছি! কেমন করল ওটা দেখলি না?”
“দেখব দেখব। দাঁড়াও না। তোমায় চা দিয়ে নিই আগে। হাত-মুখ ধুয়েই একবারে পরব।” সাপের মত দুই লিকলিকে বেণী নাচিয়ে পুতুল ছুটল চা তৈরি করতে।
চা শেষ করে হিমাংশু আরাম করে সিগারেট ফুঁকল। উঠে ট্রাউজার ছেড়ে ধুতিটা জড়িয়ে নিল। বাইরের কঁকা দালানে অন্ধকার নেমেছে ততক্ষণে। তাতে কী? বেশ একটা আমেজ আর আরাম লাগছে। হিমাংশু চেয়ারের ওপর এলিয়ে চোখ বুজে পড়ে থাকল। টুক করে আলো জ্বলে উঠল ঘরের। চোখ খুলে হিমাংশু দেখে, পুতুল একেবারে ঘরের মাঝটিতে দাঁড়িয়ে, আলোর তলায়। সদ্যপরিচ্ছন্ন ধবধবে মুখটিতে ফুটফুটে হাসি। চোখের তারায় ফুলঝুরির দীপ্তি। গায়ে তার সদ্য-আনা ক্রিমসন রঙের সেই লুজ ফ্রক। চুলের একটা বিনুনি গলার পাশ দিয়ে বেঁকা হয়ে বুকের মাঝটিতে এসে পড়ছে আগায় যার সাদা জরির রিবন তৈরি ফুল। ঝিমিক করছে আলোয়। ঠিক যেন একটি লতান ডাটার ওপর এক থোকা ফুল ফুটে রয়েছে। আশ্চর্য, আশ্চর্য সুন্দর এই পুতুল। কি নিখুঁত অঙ্গ! কপাল, মুখ, চোখ, ঠোঁট, গলা—সব যেন সামঞ্জস্য করে কেউ এঁকেছে নিপুণ তুলিতে। দুটি হাত যত নিটোল তত কোমল; দুটি পা তাও যেন লালচে মোমের ছাঁচে গড়া, মসৃণ, মোলয়েম, মধুর।
“মন্দ করে নি, না বাবা?” পুতুল লাজুক হাসি হাসে।
মেয়ের গলার স্বরে তন্ময়তা ফিকে হয় হিমাংশুর।
“ওয়ান্ডারফুল! রঙটা তোকে বিউটিফুল মানিয়েছে।”
“একটু কিন্তু বেশি ঢিলে করে ফেলেছে, যাই বল–।” মেয়ে খুঁত ধরছে এবার। “নাম যখন লুজ ফ্রক তখন ত একটু ঢিলে-ঢালা হবেই, বোকা–!”
