।সতীশ এবার চেঁচিয়ে উঠল।-এখানে প্লেট বিক্রি হয় না। এখানে প্লেট কেনা। হয়। সে কেন জানি সহসা মাথা গরম করে ফেলল। মাথা গরম করা বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়। সে খুব শান্তশিষ্ট বালকের মতো মুখকরে বসে থাকার চেষ্টা করে দেখল, ওরা কিছু বলার চেষ্টা করছে। বলুন। ওরা সাহস পেল যেন বলতে। স্যার অনেক কোম্পানী ত আজকাল কোটা বের করে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
আমরা দিচ্ছি না। অথচ সতীশ জানে আজকাল ব্যবহারের চেয়ে বিক্রি ভালো। বিক্রিতে লাভ বেশি। কর্তৃপক্ষের বিক্রির দিকে একটা ঝোঁকও আছে। অথচ এইসব মিথ্যাভাষণের দায়দায়িত্ব তার থাকবে। সে অত্যন্ত কষ্ট করে যেন বলল, এখানে তা হয় না। তোক দু’জন উঠে গেলেই একটা কোলাহল শুনতে পেল। সকলে মিলে অফিসের দিকে ছুটে আসছে। ফ্যাক্টরির ভিতর মোটর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চাকা থেমে গেছে।—কি, কি হলো? সতীশ অবিনাশকে বলল, দেখুন ত কি ব্যাপার! ওরা সকলে ছুটে আসছে কেন! তখন বাইরে গলা পাওয়া গেল-স্যার অ্যাসিডেন্ট। তেওয়ারীর হাত উড়ে গেছে। এখন অ্যাসিডেন্ট রিপোর্ট হাসাপাতাল এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ওদের কোলাহল আসছে না। সতীশ অন্য এক সহকারীকে ডেকে বলল, ওরা সকলে বাইরে কেন। ওদের ভেতরে যেতে বলুন, কাজ করতে বলুন। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
দু’জন লোক তেওয়ারীকে হাসপাতালে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সতীশ ওদের ডেকে বলল, এবার তোমরা বল কি বলবে?
-স্যার পাঞ্চিং মেসিন খারাপ ছিল।
—সুপারভাইজারকে রিপোর্ট করেছ?
ওরা বলল, করেছি। তবু সুপারভাইজার ওকে কাজ করতে বলেছেন।
সতীশ মনে মনে হাসল। কারণ এমন সব অভিযোগে সব সময় সত্যমিথ্যা জড়িত থাকে। শ্রমিকপক্ষ সব সময় কর্তৃপক্ষের উপর দোষটা চাপাতে চায়, কর্তৃপক্ষ শ্রমিক পক্ষের উপর। সে কী চিন্তা করে বলল, চল দেখি। ভিতরে ঢুকে সে নিজেই প্যাডেলে চাপ দিল এবং বলল, কই ডাবল ত পড়ছে না। ঠিক আছে মেশিন। নিশ্চয়ই তেওয়ারী অন্যমনস্কভাবে কাজ করছিল। তারপর সে চাবিটাতে হাত দিলে বুঝল ভিতরে চাবির ঘাট ক্ষয়ে গেছে। ঘাট ক্ষয়ে গেলে মাঝে মাঝে চাবি ধরবে না এবং ডবল পড়ার সম্ভাবনা আছে। ভিতরে ভিতরে তার বুক কাঁপছিল। মেশিন আজই খুলে ফেলতে হবে। অন্য চাকা এবং চাবি লাগিয়ে দিতে হবে। সে অজুহাত বের করার তালে চারিদিক কি খুঁজে দেখল, কিছু ভাজাভুজির অংশ নিচে এবং নিচের দিকে চোখ রেখেই বলল, এখানে এসব কেন? নিশ্চয়ই খেতে খেতে পাঞ্চিং চালাচ্ছিল তেওয়ারী। সে অভিযোগটাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে পারলে কোনো ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন থাকবে না। দায়দায়িত্ব সব শ্রমিকের। ইউনিয়নের দু’জন পাণ্ডা লোক ডেকে চারপাশটা দেখাল—এখানে এসব কি হয়! সে সুপারভাইজারকে পর্যন্ত শাসাল। ঘটনাটাকে এবার হুস করে কাক তাড়ানোর মতন ফুসমন্তরে মুছে দিতে চাইলে।
সে রিপোর্টে লিখল, কাজে অন্যমনস্কতা এবং দুর্ঘটনা। দু’জন শ্রমিককে সাক্ষী নিয়ে রিপোর্ট লিখে দিতেই প্রাণের ভিতরে কেমন যেন এক রক্তশোষা জীব উঁকি দিয়ে ফের রক্তের ভিতরে ডুবে গেল। যা হয়—প্রাণের চেয়ে মানের মূল্য বেশি, দুই মুখ তখন উঁকি দেয়—মিন্টু বাবুলের মুখ। রক্তশোষা জীবন যেন এবার ওদের তেড়ে যাচ্ছে। বাবুল একবার ছবিতে রাম রাবণের যুদ্ধ দেখেছিল। যুদ্ধ দেখে বলেছিল, বাবা আমি রাম সাজব। আমাকে রাজার টুপি কিনে দেবে বাবা। রিপোর্টে সই করার পরই সতীশের মেজাজটা কেমন রুক্ষ হয়েগেল। রথের মেলা থেকে রাজার টুপি কিনতে হবে সেকথা সে ভুলে গেল।
সে অফিসে বসে অন্যমনস্কভাবে কতগুলি বিল সই করল। চিঠি সই করল। চিঠি অথবা বিল সই করার সময় অন্যান্য দিনের মতো সে সবটা পড়ে সই করল না। এমনিক একবার চোখও বোলাল না। এই এক বিশ্রী অভ্যাস তার, ভিতরে কোনো পাপবোধ কাজ করতে থাকে সে কেমন ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। সংসারের বিবিধ কারণ শিয়রে তার সোনার কাঠি রাখতে দিচ্ছে না। সে অসহায় আর্ত এক মানুষ। তার আদৌ ইচ্ছা ছিল না তেওয়ারীর রিপোর্ট এমন হোক। তবু কার জন্য, বুঝি দুই শিশু সন্তান এবং যুবতী রুগ্না স্ত্রী আর বাবা ভাইবোনের কথা ভেবে সোনার কাঠি সে শিয়রে রাখল না। সব ফেলে দিয়ে সে কেমন অমানুষ এবং ক্রীতদাস হয়ে গেল।
ট্যাক্সিতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় তেওয়ারীর বউটা কাঁদছিল। জানলা দিয়ে সতীশ সেই মুখ দেখল। সতীশ ক্রমে ক্ষেপে যাচ্ছে। এই ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না সে সহ্য করতে পারছে না। ক্রমে সে অসহায় হয়ে পড়ছে। সে উঠে দাঁড়াল এবং অফিসের ভিতর পায়চারি করতে থাকল—যেন সে সাহস সঞ্চয় করছে। সে অবিনাশকে ডেকে বলল, ওদের এবার যেতে বলুন। এখানে কান্নাকাটি করে আর কি হবে। বস্তুত সতীশ এখন নিরালম্ব মানুষের মতো। সংসারের অন্ধকারে এক কালো ঘোড়া আছে তাতে চড়ে নিরস্ত্র ডাইনি বুড়িটা মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে যেমন হয়—কোনো দুঃখের ছবি, আর্তের কষ্ট আর নিরাপত্তাবিহীন জীবিকা দেখলে যেমন হয়, সংসারে পাখি ওড়ে না। মরুভূমির মতো মাঠ শুধু সামনে, আর এক উট—দীর্ঘ পথবাহী নদীনালা-বিহীন মাঠে অনবরত উট ছুটছে। সতীশ তেমনি নিজেকে কিসের আশায় ছুটতে দেখল। কারা যেন পেছনে তাড়া করছে, ফুটপাথের বাসিন্দা, অনাহারে মৃত বালকের ছবি এবং সেই কুরুগী। সে এবার চীৎকার করে উঠল, অবিনাশবাবু।
