–আজ্ঞে, আমাকে ডাকছেন স্যার।
—দেখুন ত তেওয়ারীর বউটা এখনও কাঁদছে কিনা।
–না স্যার কঁদছে না। কখন ওরা চলে গেছে।
সতীশ কেমন নিশ্চিন্ত মনে এবার বসে পড়ল। সে দুই হাতলে হাত রেখে শরীর সোজা করে দিল। কোনো দিকে তাকাল না। বোনাস সম্পর্কে কথা বলতে হবে আজ, সম্ভবত ঘেরাও করবে শ্রমিকেরা এবং ওদের দাবিদাওয়া নিয়ে চীৎকার চেঁচামেচি হবে। সে নিজেকে রক্ষা করবার জন্যে কোম্পানির যে কী ভয়ঙ্কর দুরবস্থা চলছে, আর এভাবে চললে বেশিদিন কাজ চালানো যাবে না, উৎপাদন না বাড়ালে প্রতিযোগিতায় হটে যেতে হবে—এসব নিয়ে নিজের মনেই যুক্তি-তর্কের জাল বিস্তার করতে করতে কখন দেখল সতীশ আর সতীশ নেই—সে এক ভাঙা রেলগাড়ি হয়ে। গেছে। ওকে সাইডিং-এ ফেলে ঝকঝকে নীল রঙের ট্রেন ওর সামনে ছুটে বের হয়ে যাচ্ছে। সে আবার সোজা হয়ে বসল এবং বলল, হবে না। শ্রমিকেরা বলল, তা কি করে হয়। সে বলল, পাঁচ বছরে আমি তোমাদের বেতন ডাবল করেছি, তোমরা উৎপাদন এক বিন্দু বাড়াওনি। কোম্পানি সেই অনুপাতে মালের দাম বাড়াতে পারেনি। আমরা ক্রমশ হেরে যাচ্ছি—কোম্পানির ক্রমশ ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বলা নিরর্থক, ওরা কিছুই শুনবে না। উৎপাদন বাড়াবে না। সে এবার বলল, সরকার তোমাদের বোনাসের যে রেট বেঁধে দিয়েছে তাই পাবে। মানে ফোর অর ফরটি..বলে সতীশ শেষ করতে পারল না। সমস্বরে চীৎকার শোনা গেল-আমাদের দাবি মানতে হবে। সতীশ এবার অবিনাশবাবুর দিকে তাকাল। অবিনাশবাবু বিনোদবাবুর দিকে তাকাল–ওরা সকলে ঘেরাও হয়ে গেল ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কথা বলতে পারছিল না। ক্ৰমে এ-অঞ্চলে অন্ধকার নেমে আসছে শুধু এইটুকু ওরা টের পাচ্ছে। তোমরা দরজা ছেড়ে দাও—আমরা যাব। সতীশের বলার ইচ্ছা হলো। কিন্তু দরজার মানুষগুলো আরও জট পাকিয়ে বসল। এবার ওরা তেওয়ারীর কথা তুলবে। জুলুমের কথা তুলবে। সতীশ ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে লাগল। বাবুলটা এখন কি করছে কে জানে! যা ছেলে! মার অসুখ বাড়লে ছেলের ফুল ফলের জন্য যেন আকর্ষণ বেড়ে যায়। সে এবার অনিশবাবুর দিকে তাকিয়ে। বলল, চলুন তবে উঠি। কিন্তু যারা দরজা আগলে বসে ছিল তার বসেই থাকল। উঠল
কেউ। সতীশ অথবা অবিনাশকে দরজা ছেড়ে দিল না। ওদের দাবি না মেনে নিলে সতীশ এবং অবিনাশ যেতে পারবে না। ওদের পাংশু এবং ভয়ঙ্কর চোখ কেমন ব্ৰিত করছে সতীশকে। সতীশ ক্রমে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। এমন মুখ ওদের দেখলে মনেই হয় না সামান্য কথায় এখন দাঙ্গা বেধে যেতে পারে। সে বলল, দরজা ছেড়ে বস। আরা যাব। ওরা আরও ঘন হয়ে বসল, দরজা পুরোপুরি আটকে দিল। আমাদের দাবি মানতে হবে দরজা আটকে দিয়ে এমন কথা বলতে চাইল।
—তবে তোমরা আমাদের আটকে রাখতে চাও।
—সে আমরা পারি স্যার!
–কি আমার বিনয়ের অবতার-সতীশ যথার্থই ক্ষোভে-দুঃখে বলে ফেলল। সে অবিনাশবাবুর দিকে তাকাল–কি করবেন এখন, এমন বলার ইচ্ছা। অবিশ্বাবু একটা কাগজদলা পাকাচ্ছিল। কাগজের সেই খণ্ড বিনোদবাবুর দিকে ছুঁড়ে দিল-যেন একধরনের খেলা। অশ্বির কাগজের গুলতি তৈরি করে পাখি শিকার করনে এমন এক মুখ করে উঠে দাঁড়ালেন। একমাত্র পুলিশের সাহায্য এইসময় দরকার। এই মানুষ বিনয়ের অবতার অথচ ফোনে হাত রাখলে হা হা করে ছুটে আসবে। সুতরাং অবিনাশ ঘরের ভিতর উটের মতো মুখটি তুলে পায়চারি করার সময় বিনোদবাবু সংকেতে কি সব বলে দিতেই তিনি বের হয়ে গেলেন। প্রায় একশত মুখ এখন দরজায় জানলায়। কিছু কিছু মানুষ সামনের মাঠের অন্ধকারে উঁকি দিয়ে আছে। সাহস সঞ্চারের জন্য ওরা মাঝে মাঝে ধ্বনি দিচ্ছিল—আমাদের দাবি মানতে হবে। যেন ওরা বাঘের মতো থাবা উঁচিয়ে বসে আছে, অবিনাশ অথবা সতীশ বের হলে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়বে। তখন বিনোদবাবু সদর রাস্তায় হাঁটছিল—হ্যাঁতে আবেদনপত্র—উই আর রংফুলি কনফাইন্ড। সে রাস্তায় নেমে চিঠিটা পড়ল এবং দৌড়ে থানায় জমা দিলে পুলিশগাড়ি এল। নিমেষে ধ্ব কিছু ফাঁকা হয়ে গেল। সতীশ পুলিশের গাড়িতে বসে কেমন কাপুরুষের গলায় বলল, তেওয়ারীর বউটা খুব কাদছিল অবিনাশবাবু।
.
ঘরে ফিরে সতীশ দেখল, সুরমা শুয়ে আছে। ক্ষোভ-দুঃখ হতাশা ক্রমে জোয়ারের জলের মতো বাড়ছে। সুরমাকে শুয়ে থাকতে দেখে সে কেমন ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে। তুমি এখন শুয়ে আছ, বলার ইচ্ছা সতীশের। ও-ঘরে কার। গলা!-কে এল সুরমা! সুরমা না তাকিয়েই বলল, বড়দা এসেছে। সতীশ বলল, বল কোথায়!
–বাবুল দাদাকে কবিতা শোনাচ্ছে।
—তুমি কখন এলে? সতীশ দরজায় মুখ রেখে বলল। বাবুল লাফাচ্ছে, গাইছে এবং ছুটে ছুটে কবিতা আবৃত্তি করছে। এখন পড়ার সময়। কেউ এলেই বাবুলের দাপাদাপি বেড়ে যায়। সে এখন পড়াশোনায় কঁকি দিচ্ছে। তুমি পড়তে বসো বাবুল। সে বাবুলকে ধমক দেবার সময়ই মনে করতে পারল কাপুরুষের মতো সে আজ পালিয়ে এসেছে। এই কাপুরুষ ভূমিকার জন্য সে কেমন নীচ হীন হয়ে পড়েছে! নিশ্চয়ই বড়দা কেননা কাজ উদ্ধারের আশায় এসেছেন। বড় মেয়েটিকে বাবার কাছে রেখেছে, মেজ মেয়েটিকে আমার কাছে…কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, চা জলখাবার খেয়েছ?
—খেয়েছি সব। এখন তুই তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে আয়। কিছু জরুরি কথা আছে।
