বাবার এই এক অজুহাত। সংসারে সতীশ সামান্য বেশি আয়ের চাকরি করে বলে এবং বিদ্বান বলে সব চাপ ওর উপর। সুরমা সংসারে বড় ঘর থেকে আসায় এবং মা বাবার অমতে বিবাহের দরুন সকলেই সুরমার প্রতি যেন সংগোপনে আক্রোশ বহন। করে বেড়াচ্ছে। কারণ বিয়ের আগে সতীশ শেষ কপর্দক মায়ের হাতে দিয়ে দিয়েছে। এবং সংসারে সেই প্রায় সব ছিল। কোথাকার এক উটকো যুবতী এসে সতীশকে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। সতীশ চিঠিটা সুরমার হাতে দিয়ে বলল, ভেবেছি বাবুলকে দাদার কাছে দত্তক দিয়ে দেব।
সুরমা বলল, তার মানে?
সতীশ হাসতে হাসতে বলল, দাদার পুত্রসন্তানের বড় শখ।
—শখ না বলে বল স্বার্থপর মানুষ। সুরমা ক্ষেপে গেল। এই মানুষ সতীশ যেন উৎসর্গীকৃত প্রাণ। সব দায়-দায়িত্ব তার। কেন বাপু-সুরমার রুগ্ন হাত-পা কাঁপতে থাকল, অন্য দুই ভাই আছে তোমার, ওরা কাজ করছে। লেখাপড়া শেখাবার চেষ্টায় এটি ত তুমি করনি। শুনেছি তুমি টিউশনি করে, পত্রিকা হকারি করে তোমার পড়ার খরচ চালিয়েছ। আর তুমি ছোট ভাইদের পড়ার জন্য কি না করেছ—ওরা মানুষ না হলে কার দায়। সামান্য একটানা কথা বললেই সুরমা বড় বেশি কাতর হয়ে পড়ে। সে বিছানায় উঠে বসল।—ওরাও কিছু কিছু করে বাবাকে সাহায্য করতে পারে।
সতীশ তেমনি সরল সহজ মুখে বলল, দেখলে ত মাথা খারাপ কে করছে।
সুরমা বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, আমার বাবুলকে আমি দিতে যাব কেন?
–না দিলে দাদা রেস চালিয়ে যাবে। সতীশ ঠাট্টা করে বলল।
—রেস চালালে দারিদ্র্য বাড়বে। তাতে আমার কি। সুরমা ক্রমে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। সতীশের ভালো লাগছিল সুরমাকে রাগিয়ে দিতে। বলল, দাদার কাছে। থাকাও যা আমার কাছে থাকাও তাই।
–বাবুল আমার! সংসারে তুমি তোমার মা বাবা-দাদার জন্য সব ধরতে পার। আমি পারি না। তোমার যা চাকরি-কবে কোনদিন সব যাবে তামাদের। আমরা পথে গিয়ে দাঁড়াব। কি সঞ্চয় তোমার বল? এতদিন চাকরি করে কি করেছ তুমি? মিন্টু বড় হচ্ছে। ওদের দিকে তুমি একবার ভালো করে তাকাও। তোমার কারখানা, শ্রমিক, মা বাবা-দাদা ওরাই সব। তারপর আরও কি বলতে গিয়ে সুরমা থেমে গেল। এই এক অভ্যাস সুরমার। রেগে গেলে সকলকে টেনে আনবে। কোথায় যেন সুরমা অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সতীশ নিজেও মাঝে মাঝে জীবনযাপনের নিরাপত্তাবোধের অভাবে ভুগছে। কারখানায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে ঋণ বাড়ছে এবং কারখানার নাভিশ্বাস উঠছে। সে যেন কোনোদিকে পথ খুঁজে পাচ্ছে না। পুরনো। যন্ত্রপাতি এবং প্রাচীন সব পদ্ধতির জন্য প্রতিযোগিতায় ক্রমে তারা হটে যাচ্ছে। ফলে কারখানার দৃশ্য চোখের উপর ভেসে উঠলেই মনে হয়, এক বড় অগ্নিগোলক, অতিক্রম করতে পারলেই রাজার মাথায় টুপি। সতীশ বার বার প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেই অগ্নিগোলক অতিক্রম করতে পারছে না। সতীশ জামাকাপড় পরার সময় ভাবল, বাবুলকে আজ হোক কাল হোক সে একটা টুপি কিনে দেবে। সে রাজার টুপি পরে রাম অথবা রাবণ সেজে বাবাকে ভয় দেখাবে। সে ডাকল, বাবুল তোমার পড়া হয়েছে?
কোথায় বাবুল! তখন বাবুল টেবিলের নীচে বসে মা’র অসুখের দৈত্যটাকে খুঁজছে। হাতে বন্দুক কোমরে বেল্ট এবং তাতে আঁটা চকচকে লোহার পাত। সব রাংতা দিয়ে মোড়া। মনে হয়, বাবুল যথার্থই সৈনিক সেজে এই সংসার থেকে সব অমঙ্গল দূর করে দিতে চাইছে। বের হবার সময় সুরমা ফের সতীশকে বলল, ওদের তুমি বারণ করে যেও।
সতীশ বলল, মিন্টু—তুমি বাবুলকে নিয়ে দুপুরে বের হবে না।
বাবুল টেবিলের নীচে থেকে বলল, না বাবা, আমি বের হব না। দিদি আমাকে কেবল যেতে বলে।
মিন্টু বলল, হ্যাঁ আমি তোমাকে কেবল যেতে বলি। নিজে যেন যেতে জান না। ওদের ঝগড়া দেখে সতীশ বলল, তুমি যাবে না। তুমি সাঁতার জান না। জলে পড়ে গেলে কেউ টের পাবে না। তারপর ভয় দেখানোর জন্য বলল, পুকুরটাতে বড় একটা অজগর সাপ আছ। যাবে না। গেলেই খেয়ে ফেলবে। এক জলাশয়ের দৃশ্য সতীশকে কেমন ভীত বিহ্বল করে রাখে। অথবা অফিসে সময় সময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে মনে হয়, বাবুল এবং মিন্টু যেন এক প্রাচীন দীঘির পুরনো ভাঙা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কি যেন তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মা রুগ্ন। মা সারাদিন শুয়ে থাকেন। মা’র জন্য। বনের ফুল ফল অথবা মা’র জন্য অদ্ভুত ফল তুলে আনতে হবে। জলাশয়ের পারে পারে ওদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য সতীশকে মাঝে মাঝে বড় অন্যমনস্ক করে দেয়।
পথে বের হলেই মিশনারিদের এক বড় দেয়াল এবং সদর গেট। একটু পথ হেঁটে বাসে উঠতে হয়। সেখানে এক কুষ্ঠরুগীর মুখ, তার হাত হাওয়ায় নিয়ত দুলতে থাকে। বয়সে প্রাচীন সেই নারীর গলিত শবেরমতো হাত পা মুখ; আর কী করুণ ইচ্ছা তার দু হাতে সূর্য স্পর্শ করার। সতীশ এখানে এলেই সামান্য সময় দাঁড়ায়, কিছু সাহায্য দেয়।…তারপর যদি তুমি কোনোদিন দ্যাখো সংসারের সব দুর্যোগ তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে? এমন কথা মনে হয়, তখন? সতীশ তখন ছুটে পালাতে চায়, কিন্তু কে যেন তখন পাখির মতো ডেকে ডেকে বলে, বাবা তুমি আমায় রাজার টুপি কিনে দেবে না? তুমি আমাকে বড় মাঠে নিয়ে যাবে না?
.
অফিসে ঢুকেই সতীশ শুনল, দু’জন লোক ওর সঙ্গে দেখা করবে বলে বসে আছে। সে টেবিলের উপর কিছু চিঠি পড়ে আছে দেখতে পেল। লোক দু’জন বাইরে বসে আছে। সে বেল টিপে অবিনাশবাবুকে ডাকাল। বলল, কারা এসেছে? কি চায় ওরা? ইউনিয়ন থেকে আসেনি তো! সতীশ ওদের ডাকাল। এবং বলল, আপনি বসুন অবিনাশবাবু। ওরা এলে বলল, কি চাই? ওরা জবাবে বলল, স্যার প্লেট কিনতে চাই।
