—তার পিছনে কে বসবে? কারণ বাবুলের গাড়ি চার কামরার। সে এবার কি ভাবল। জানলায় পাতাবাহারের গাছ। তারপর পথ। এই প্রাসাদের মতো বাড়ির ভিতর এক ফালি ঘর নিয়ে সতীশ রয়েছে। স্ত্রী সুরমা আছে। এই বড়বাড়ির দু’পাশে ফুলের বাগান, বাগানে কত বিচিত্র ফুল। এবং বাগান পার হলে পুকুর, পাড়ে পাড়ে আমলকি গাছ। এখন কি মাস সতীশের যেন মনে আসছিল না। ওই আমলকি গাছের ছায়া এবং বন, তার পরে মাঠ, মাঠ পার হলে রেল কলোনির লাল ইটের বাড়ি এসব তার মনে আসছিল।
বাবুল তখন বলল, তার পেছনে দিদিমা।
—আর কেউ নয়?
–না।
—তোমার ঠাকুমা ঠাকুরদা।
এবারেও সে দ্বিধায় পড়ে গেল। সে কিছু না বলে গাড়িটাকে টেবিলের উপর রেখে দিল। তারপর একটা চেয়ারে বসে ইতিহাসের পাতা খুলে পড়তে বসল। রাম রাবণের ছবি। রামের মাথায় রাজার টুপি। বড় লম্বা টুপি দেখলে বাবুলের মনে হয় এই বুঝি রাজার টুপি। সে বাবাকে কবার এমন একটা টুপি কিনে দিতে বলেছিল, সতীশ বলেছিল রথের মেলা থেকে কিনে দেবে। কিন্তু রথের মেলা থেকে না রথ, না টুপি। সে লম্বা এক রেলগাড়ি কিনে এনেছে।
বাবুল কি ভেবে ফের নিবিষ্ট হলো ছবিতে। সতীশ কি ভেবে জানলাতে পাতাবাহারের গাছ দেখল। আর সুরমা দরজায় উঁকি দিয়ে দেখল ঝি মঙ্গলা এসেছে কিনা। অফিসের সময় হয়ে যাচ্ছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল। ক্লান্ত এবং বিষণ্ণ চোখ সুরমার। দুই সন্তানের জননী সুরমা। চোখে-মুখে বিস্বাদের ছাপ শুধু। সে উঠতেই বাবুল বলল, আমি আর পড়ব না মা।
—কেন পড়বে না?
–বাব বলেছিল টুপি কিনে দেবে, রাজার টুপি। টুপি না দিলে আমি প না। বলে সে একটা খাতা টেনে ছবি আঁকতে বসে গেল।
সুরমা ধমক দিল এবার। বাবুল তুমি পাকা পাকা কথা বলবে না। এখন পড়াশোনা কর। কেবল ছবি এঁকে খাতা নষ্ট করা। সতীশ এলে বলল, তোমার ছেলেমেয়েকে বলে যাবে দুপুরে বাইরে বের না হতে।
এই এক ভয় সুরমার। সুরমার কেন, সতীশেরও। বাড়ির বাইরে ফুলবাগান, বাগান পার হলে বড় জলাশয়। জলে কালো রঙের শ্যাওলা। এবং বড় গভীর। এত বড় বাড়ির এক কোণায় সতীশের তিন কামরার ঘর। প্রাসাদের মতো এই বাড়ির কোন ভগ্নাংশে যেন সতীশ এবং সুরমা তাদের দুই সন্তানের প্রতি স্নেহ নিয়ে জীবনের বাকি অংশটুকু কাটিয়ে দিচ্ছে। সতীসর ভয়, বাবুল একা একা যখন সুরমা দুপুরে ঘুমিয়ে পড়বে, নির্জন দুপুরে পাতাবাহারের গায়ে কিছু পাখি ডাকবে–তখন এই বাবুল তালপাতার টুপি মাথায় দিয়ে কাঁধে খেলনার বন্দুক নিয়ে দৈত্য শিকারে বের হয়ে পড়বে। আর সঙ্গে থাকবে মিন্টু। দুই ভাইবোনে চুপি চুপি বের হয়ে ফুল ফল পাখির জন্য দারোয়ানদের খুপরি ঘরগুলো অতিক্রম করে আমলকির বনে হারিয়ে মার। অসুখের দৈত্যটাকে খুঁজবে।
এই বড় শহরে এসে সুরমার স্বাস্থ্য ভেঙে গেল। সতীশ সেই পাতাবাহারের পাতা দেখতে দেখতে কথাটা ভাবল। এই বড় শহরে বড় নিঃসঙ্গ সে। ক্রমে সে অস্থির হয়ে উঠছে। কারখানার কিছু কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে এ সময়। সতীশ একদা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করত। সুরমা শিক্ষয়িত্রী ছিল। বড় মাঠ ছিল সামনে। মাঠ পার হলে স্টেশন। স্টেশনে রেলগাড়ি এসে থামত। বাবুল আর মিন্টু রেলগাড়ি এলে জীবন দপ্তরীর কাঁধে মাঠ পার হয়ে স্টেশনে উঠে যেত। বারান্দায় ইজিচেয়ার থাকত। সুরমা এবং সতীশ বসে বসে ওদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখত। এখন কেন জানি সে ছবি স্বপ্নের মতো মনে হয়। এখন শুধু কানে কারখানার ঘন্টা পেটানোর শব্দ ভেসে আসে। কে যেন অন্ধকারে লাল বলের মতো এক অগ্নিগোলক বুলিয়ে রেখেছে এবং কারা যেন মাথায় রাজার টুপি রবে বলে ক্রমান্বয় ঘন্টা পিটিয়ে যাচ্ছে। এই ঘন্টা পেটানোর শব্দ কানে এলেই সতীশের হাত-পা কাঁপতে থাকে। কেবল মনে হয় কারা যেন সব সময় হা করে ওর পেছনে ছুটে আসছে। আজ সোমবার। বোনাস সম্পর্কে শ্রমিক পক্ষ থেকে কথা বলতে আসছে। কথায় কথায় বচসা হবে। নানারকমের ভয়-ভীতিতে ওর গলা শুকিয়ে আসছিল। সে কি মঙ্গলাকে ডাকল। জল, এক গ্লাস জল দিতে বলল মঙ্গলাকে। তার জলটা কক করে খেয়ে ফেলল এবং মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আজ ফিরতে দেরি হতে পারে। অযথা আমার জন্যে ভাববে না।
সুরমা মুখ ফেরাল না। বলল, তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।
—কি কথা?
–বাবার চিঠি এসেছে। অফিস ফেরত চিঠি পড়ে মাথা ঠিক রাখতে পারবে না বলে দিইনি।
সতীশ সামান্য হাসল। –কই দেখি চিঠিটা। সুরমা বালিশের নীচ থেকে চিঠি ঝে করল এবং সতীশের হাতে দেবার সময় বলল, এ নিয়ে তুমি মাথা গরম করবে। সুরমা সতীশকে শপথ করাতে চাইল। সতীশ জবাব দিল না। চিঠির ভাজ খুলে সেই বৃদ্ধ মানুষটির হস্তাক্ষর দেখল। হস্তাক্ষরের সতেজ ধ্বল ভাবটা ক্রমে কেটে যাছে। পরম কল্যাণএখন এই শব্দ এবং অর্থ ক্ৰমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। সতীশ গত মাসে বাড়িতে নিয়মিত যে টাকা দেয় তা দিতে পারেনি। তার কোম্পানীর অবস্থা খারাপ হবার দরুণ রোজগার কমে গেছে। সুতারং বাজেট ঘাটতি। বাবা নিশ্চয়ই চিঠিটা খুব রেগে গিয়ে লিখেছেন। সে পড়ল—তুমি অবিবেচক হয়ে পড়েছ। শুনেছি তোমার আয় পাঁচশত টাকার মতো। আমাকে প্রতি মাসে একশত টাকা দাও। আমরাও চারজন, তোমরাও চারজন।..এ মাসে সেই সামান্য দান তুমি আরও সংক্ষিপ্ত করেছ। এই বৃদ্ধ বয়সে অনাহারে দিন যাপন করতে হবে ভাবতে কষ্ট লাগে। কল্যাণীর সম্বন্ধ এসেছিল। পাত্রপক্ষ কলকাতায় তোমার বাসার কাছেই থাকে।.. সতীশ কেমন অন্যমনস্কভাবে চিঠিটা পড়ছে। পাত্রপক্ষের খোঁজ-খর নেবে। নিম্নে ঠিকানাটা দেওয়া থাকল। শেষে আরও অস্পষ্ট কয়েকটি শব্দ। সতীশ চোখের কাছে এনে উদ্ধার করতে পারল। যতীনের আবার একটি মেয়ে হয়েছে। দাদা কি ক্ষেপে গেলেন। সতীশ কেমন অসহিষ্ণু গলায় না বলে পারল না। এবার পত্রের খুব নীচে ‘পুনঃ’ এই শব্দ ব্যবহারে চিঠি শেষ করেছেন। তুমি লিখেছ একা তোমার পক্ষে সংসারের দায়দায়িত্ব বহন কার ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। তুমি বলতে চাইছ, যতীন সংসারে সামান্য সাহায্যে করুক। যতীন রেলে চাকুরি করে। সামান্য তিনশত টাকা মাহিনা। ছয়টি কন্যাসন্তান এবং ওরা দুজন। তাও বড় মেয়েটিকে আমি এমাসে নিয়ে এসেছি বলে রক্ষা। তিনি যেন দয়া করে পত্র শেষ করেছেন। চিঠিটা সতীশ ভাঁজ করে সুরমাকে দিয়ে দেবার সময় কথাটা না ভেবে পারল না।
