হরিপ্রিয়া ব্যাকুল হয়ে এসেছে কমলের এখানে।
কমল বলে চলো মহাশ্মশানে। শ্মশানে এক নতুন সাধু এসেছেন। কে জানে হরিদা মনের দুঃখে সন্ন্যাসী হয়ে গেল কি না।
ওকথা বলিসনি কমল। তার কিসের দুঃখ যে সন্ন্যাসী হবে।
কমল বলে–মনের দুঃখে। দুঃখ তত তুমি তাকে কম দাওনি।
আর ও বলিস না। আমার রে শিক্ষা হয়েছে। চল যদি সন্ধান পাই তার।
.
কাশীপুর শ্মশানে একটা নদীর ধারে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে শিরিষ, শেওড়া, নিম, আকাশমণি আর নিচে ঘন লতার জঙ্গল। ওরই এখানে ওখানে দু’একজন সাধু ধ্যানস্থ হয়ে রয়েছে। হরিপ্রিয়ার দামী শাড়ি ধূলায় লুটোচ্ছে। কাটা ঝোঁপ আকন্দ বনের ভিতরে সে খুঁজছে একজনকে ব্যাকুল ভাবে।
।কমল অবশ্য স্টেজ রেডিকরে রেখেছিল। সকালে হরিমাধবকে মেকআপ দিয়ে এখানে একটা বড় শেওড়া গাছের নীচে চালা করে বসিয়ে দিয়ে গেছে।
ইয়া দাড়ি, পরণে রক্তাম্বর গলায় অনেক হাবি জাবি মালা গায়ে ছাইও মাখানো। হরিমাধবের দাড়ি কুটকুট করছে। হঠাৎ হরিপ্রিয়াকে দেখে চাইল।
হরিপ্রিয়া দেখেই চিনেছে। পিছনে কমল। হরিপ্রিয়া এসে পায়ে লুটিয়ে পড়ে কান্না ভিজে গলায় বলে একি হাল হয়েছে তোমার? এই শেওড়া গাস্ত্রে নীচে বসে আছো নিজের ঘর সংসার ছেড়ে। ওগো ঘাট হয়েছে বাড়ি চলো।
হরিমাধব এবার বাল্মিকীর সেই ডায়লগ বলে–সংসার! ওসব মায়া। অনিত্য। সেই মায়ার সংসার ছেড়ে মহামায়ার কৃপালাভের জন্যই এখানে এসেছি। তুমি বাড়ি ফিরে যাও।
—ছেলেরা বৌমারা কত ভাবছে তোমার জন্যে দাদুভাই কত কাঁদছে।
—দুদিন কাঁদবে তারপর ভুলে যাবে। একবার যখন অনিত্যকে ছেড়ে এসেছি আর ওখানে যাবো না। ওঁ হরি ওম বলে হরিমাধব নীরব হয়ে যায়। যেন সমাধি লাভই করেছে।
হরিপ্রিয়া এবার পায়ে মাথা ঠোকে। আমার ঘাট হয়েছে, আর ওসব পাপ কথা কোনদিন মুখে আনবো না। তোমার পা ছুঁয়ে বলছি ওগো ঘরে চলল। তপস্যা সেখানেই করবে। কাজকর্ম করবে, এও করবে শান্তিতে আমি কোন কথা বলব না আর। পোড়া জিব আমার খসে যাবে।
কমল বলে হরিদা, দিদি এতকরে বলছে ঘরেই চলুন সংসারই তো স্বর্গ, ঘরই তো মন্দির।
হরিমাধব বলে–তুমি বলছ কমল? শেষে আবার সেই অশান্তি।
হরিপ্রিয়া বলে–তোমার পা ছুঁয়ে বলছি, আমার ভুল ভেঙ্গেছে। যে এককথায় ঘর সংসার ছাড়তে পারে তার মনে কোন পাপ নেই। তুমি ঘরে চলো।
হরিমাধব অস্ফুট স্বরে বলে–হরি ওম্ ঔৎ সৎ চলো।
তবে কথার খেলাপ হলে এবার হিমালয়ে চলে যাবো।
কমল বলে দিদি তুমি বাড়িতে যাও। আমি হরিদার দাড়িফাড়ি কাটিয়ে ধাপ দুরস্ত করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।
যদি না যায়! হরিপ্রিয়া বলে।
কমল বলে আমি তো আছি, ওকে নিয়েই বাড়ি ফিরবো। ভয় নেই।
পাড়ার সকলে জানে হরিমাধব কেদারবদরী থেকে ফিরেছে। বাড়িতে আজ আনন্দের পরিবেশ। সন্ধ্যায় কমল আজ বেলাতী মদ নিয়ে এসেছে। হরিমাধব কাটলেট খাচ্ছে। কমল বলে— ক্যামন বুঝছে হরিদা।
হরিমাধব বলে— অল কোয়ায়েট ইন দি হোম ফ্রন্ট। তোমার দিদি এখন একেবারে অন্য মানুষ হে। আর কোন কথা নাই। বেশ শান্তিতে কাজটা হয়েছে ঘরেও শান্তি নেমেছে।
কমল বলে তাহলে আমার এলেম আছে বলল। হরিমাধব আজ কমলের কেরামতিকে অস্বীকার করতে পারে না।
রাজার টুপি – অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
জলের মতো রঙ ছিল সেদিন আকাশের। সুরমা বিছানায় শুয়েছিল। সুরমা রুগ্ন। বাবুল বারান্দায় রেলগাড়ি চালাচ্ছিল। সতীশ রথের মেলা থেকে বাবুলকে রথ কিনে না দিয়ে রেলগাড়ি কিনে দিয়েছিল। রেলগাড়ির চাকায় সামান্য শব্দ হচ্ছিল; পাখি ডাকছিল আকাশে। ভোরের সূর্য উঠে আসছে। জানলায় পাতাবাহারের গাছ। গাছে লাল, নীল, হলুদ পাতা। বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় পাতার উপরে পরিচ্ছন্ন ভাব : সতেজ এবং স্নিগ্ধ। বাবুল গাড়ি চালাতে চালাতে ডাকল, বাবা আমার গাড়িটা চলছে না।
সতীশ গাড়িটাতে দড়ি বাঁধা দেখল। গাড়ির চাকা ঘুরছে না বলে বাবুল দড়ি ধরে টানছে এবং চালাবার চেষ্টা করছে। সতীশ নুয়ে গাড়িটা উল্টে দিল। আর পিন লাগালে গাড়ির চাকা আবার ঘুরতে থাকল। বাবুল রেলগাড়িটা টানতে টানতে দেয়ালে বোধহয় পাখি দেখল, বোধহয় পাখি উড়ে গেলে দেয়ালে সে নিজের ছায়া দেখে থেমে গেল এবং কেমন ভয় পেয়ে বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে।
বুঝতে না পেরে সতীশ বাবুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বড় চোখ বাবুলের। হাসলে গালে টোল পড়ে। কালো রঙ। মুখের ভিতর চোখ দুটোই সার। ছোট করে ছাঁটা চুল এবং মুখশ্রীতে কেমন যেন যাদু আছে। যেন দূরের কোনো মাঠে বৃষ্টিপাতের পর সামান্য জ্যোৎস্না-জ্যোৎস্নায় ছোট্ট শিশু দু’হাত তুলে ছুটছে। সতীশ মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কি বললে?
বাবুল এবার গাড়িটা বগলে নিয়ে সতীশের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বলল, এখানে তুমি আমি বসব। বলে সে এনজিনের দিকটাতে স্থান নির্দিষ্ট করলে সতীশ বলল, মা কোথায় বসবে? কথা শুনে বাবুল একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। মা পাশে না বাবা পাশে? কে পাশে বসবে সে এ-মুহূর্তে কিছুই স্থির করতে পারল না। ওর চোখে মুখে ক্লিষ্ট এক ভাব ফুটে উঠছে। সুতরাং সতীশ বলল, তুমি যেখানে বসবে আমরা সেখানেই বসব। তোমার গাড়িতে কে কোথায় যাবে তুমিই ঠিক করবে। বাবুল এবার গাড়িটা ফেলে মায়ের কাছে ছুটে গেল। সুরমা এখন ঘুম থেকে ওঠেনি। ওর দেরি করে ওঠার অভ্যাস। ঝি আসবে এসে সব হাতের কাছে এনে দিলে সে রান্না করবে। ওর পেটে কী যেন কষ্ট সব সময়। সামান্য অপারেশনের দরকার। এবং অপারেশন হলেই সুরমা মরে যাবে এমন একটা ভয় তার। বাবুল বিছানার পাশে আসতেই সুরমা মাথায় হাত রাখল। বলল, ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে খেলতে নেই। এখন পড়তে বোস। এমন কথায় বাবুল বিষণ্ণ হয়ে গেল। সতীশের দিকে না তাকিয়েই বলল, বাবা তুমি আমার পাশে বসবে। মা দিদি পিছনে বসবে। ভোর হলে সূর্য আপন মহিমায় যেমন আকাশে উঠে আসে, এই বাবুল, ছোট্ট বাবুল সেইরকম দাপাদাপি করে এই সংসার ভরে তুলছিল। পড়ার কথায় সে বিষণ্ণ হয়ে গেল।
