কমল বেশ কৃতি পুরুষ। ব্যবসাতে ভালো করছে। নানা জনকে চরিয়ে খায়। সদরের নেতাদেরও সকলে কমলবাবুকে সম্মান করে। তার কাছে নানা পরামর্শ নিতে আসে আপদে বিপদে।
হরিমাধব বলে— কমল তোমার মাথায় অনেক রকম মতলব খেলে শুনেছি। আমাকে পরিত্রাণের এক পথ বাতলাও ভায়া। নাহলে শেষ মেষ সংসার ছেড়েই চলে যাবো কোথাও।
কমল তখন কয়েক পেগ চড়িয়েছে। নেশাটা গোলাবী রং ধরেছে। কমলের মাথায় এবার আইডিয়াটা আসে। বলে সেহরিদা, একটা পথ আছে।
মারধোর করতে হবে না তো? হরিমাধব ওইসব অপ্রিয় কাজ করতে পারবে না। তাই ওই কথা বলে।
না না, এ একেবারে অন্য পথ। ঠিকমত চাল দিতে পারলে দিদি একেবারে মাৎ হয়ে যাবে। তোমার পূজার ছুটেতে কোর্ট কতদিন বন্ধ থাকে।
—তা ধরো মাসখানেক। হরিমাধব জানায়।
-তাহলে ক’টা দিন মুখ বুজে দিদির থ্যাতলানি খাও। তারপরই ব্যস। কুমোরের ঠুকঠুক, কামারের এক ঘা। একেবারে মোক্ষম ঘা।
—তা কি করতে হবে বলবে তো। হরিমাধব শুধোয়।
কমল বলে, সময়েই বলবো।
.
হরিমাধবের জীবন যেন বিষিয়ে উঠেছে গিন্নীর ওই বাতিকে। সাবিত্রীর কাজ চলে গেছে ছেলেরা কদিন চেষ্টা করে ছোট বৌ-এর গ্রাম থেকে এক বয়স্কা বিধবাকে এনেছে কাজের জন্য। ছোট ছেলে মাকে বলে— সারা পাড়ার লোক, কাজের লোকেরা জেনে গেছে তোমার কথা। আর পাগলামী কোরো না।
হরিপ্রিয়া বলে— তোরা আমার দোষই দেখলি, তোদের বাপ! তার গুণের কথা জানিস? আদালতে এক মানুষ আর ঘরে পাড়ায় নজর দোষ গেল না।
ছেলে সরে পড়ে। বৌরা আড়ালে হাসাহাসি করে। হরিমাধববাবু সেদিন না খেয়েই আদালতে চলে যান। কাজে মন লাগে না। পূজার ছুটিও পড়ে গেল।
রাতের বেলায় উঠে বাথরুম যাবেন, দেখেন তার ধুতির সঙ্গে গিন্নী জম্পেশ করে শাড়ির আঁচল বেঁধে রেখেছে। অর্থাৎ হরিমাধব বাবুকে যেন বেঁধে রাখা হয়েছে। গিন্নীও জেগে গেছে। শুধোয় কোথায় যাওয়া হচ্ছে চুপে চুপে। এা নতুন মেয়েটার দিকে নজর পড়েছে এর মধ্যে।
—থামবে।
—কেন থামবো। হরিপ্রিয়াও গর্জে ওঠে।
ছেলে বৌমা জেগে গেছে। বড় ছেলে বলে মা কি পাগল হয়ে গেল। ছোট বউ বলে ডাক্তারকে কি ব্যাপার গো! রাত দুপুরেও বুড়োবুড়ির নাটক।
হরিমাধব বাবু চুপ করে যান। অবশ্য হরিপ্রিয়া তখনও গজগজ করছে, স্বভাব যায় না মলে, ইৎ যায় না ধুলে।
হরিমাধবের মনে পড়ে এবার কমলের কথাগুলো। এবার সেও তৈরী।
পুজো আসছে। বাড়িতে সমারোহ শুরু হয়েছে, হঠাৎ সকাল থেকে হরিমাধবকে পাওয়া যাচ্ছে না। আদালত বন্ধ। কিন্তু লোকটা গেল কোথায়?
হরিপ্রিয়াও ভাবনায় পড়ে। বলা নাই কওয়া নাই পুজার মুখেই লোকটা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
বড় ছেলে, বড় বৌমা, ছোট ছেলে, ছোট বৌমা এবার মাকেই দায়ী করে।
লোকটা শিবের মত সৎ, দিনরাত খেটেছে পয়সা এনেছে তাদের মানুষ করেছে, আর মা তুমি সেই সম্মানীয় লোকটাকে দিনরাত শুধু শাসন করেছে আর যা তা কথা বলেছো। ছোট ছেলে জানায়।
সারা শহরের মানী লোকটাকে তুমি পদে পদে অপমান করেছে। আর তাই অতিষ্ঠ হয়ে লোকটা ঘর ছেড়েই চলে গেল।
পুজো এসেছে, হরিপ্রিয়া এখন একেবারে নীরব। বাড়িতে যত ঝগড়া হোত তার স্বামীর সঙ্গেই। আজ সেই লোকটা নেই। উৎসব আনন্দের দিনে কোথায় রইল কে জানে।
অবশ্য ছেলেরা পরামর্শ করে অন্যদের জানিয়েছে বাবা কেদারবদরী গেছেন। তারা আসল খবরটা জানে না।
হরিপ্রিয়া নাওয়া খাওয়া ছেড়ে এবার চোখের জলই ফেলে, মানুষটাকে হারিয়ে আজ বুঝেছে যে সত্যিই স্বামীকে সে অকারণে লাঞ্ছনা অপমানই করেছে। এবার দেবতার চরণে মাথা ঠোকে মানুষটাকে ফিরিয়ে এনে দাও ঠাকুর।
কিন্তু পূজা কেটে গেল হরিমাধবের কোন খবর নাই। ছেলেরাও ভাবনায় পড়ে।
কোন বিপদ আপদ হল কিনা বাবার কে জানে।
হরিপ্রিয়া কদিনেই আধখানা হয়ে গেছে আর কথা বলে না সে। শুধু চোখের জল ফেলে ঠাকুর দেবতার পায়ে মাথা ঠোকে। কিন্তু হরিমাধবের দেখা নাই।
কমল এখবর পেয়ে আসে দিদির কাছে। দিদির সেই তেজ দাপট আর নাই। এখন সব ঠাণ্ডা। ভাইকে দেখে বলে আমার কি সর্বনাশ হলরে। লোকটা বিবাগী হয়ে গেল। কোথায় গেল।
কমল বলে, তোমারই সন্দেহ বাতিকের জন্যই সংসার ছেড়ে চলে গেছে। গুরুদেবের আশ্রমে খবর নিয়েছো?
—হ্যারে। সেখানেও যায়নি।
—তাহলে গেল কোথায়? কমল ভাবছে।
হরিপ্রিয়া বলে আমারই দোষ। যাতা বলেছি ওকে আর কোন দিন ওসব কথা বলব না। তুই লোকটাকে খোঁজ কমল।
কমল বলে–কাশীপুর শ্মশানে অনেক বড় সাধু আসে। তারা ভূত ভবিষ্যৎ সব জানে।
—সেখানেই নিয়ে চল। যদি তাঁরা ওর সন্ধান দিতে পারে। চল ভাই। হরিপ্রিয়া এখন অন্য মানুষ।
কমল বলে সেখানে গিয়ে কি পাবে তাকে। তা এতকরে বলছ, কাল সকালে গাড়ি পাঠাবো, যাবে।
কমল বাড়ি ফিরে দেখে হরিমাধব কাগজ পড়ছে তার বাগান বাড়িতে। হরিমাধব কমলকে দেখে বলে ও বাড়ির কি খবর হে, তোমার দিদি।
একেবারে নেতিয়ে পড়েছে ঠাকরুণ। মনে হয় ওষুধ ধরেছে।
হরিমাধব বলে, এভাবে আর তোমার বাগান বাড়িতে কদিন গাঢাকা দিয়ে থাকবো?
কমল বলে— ওই তোমার দোষ, বিয়ের পয়লারাতে বৌ-এর কাছে হম্বিতম্বি দেখাতে পারেনি আমার মত, তাই ভুগছ। এবার একটা দিন বেশ জমিয়ে অভিনয় করতে হবে ব্যস। তাহলেই কিস্তি মাৎ।
অভিনয় করতে হবে?
কমল বলে–বার লাইব্রেরির নাটকে বাল্মিকী, বিশ্বামিত্রের পার্ট তোমার একচেটিয়াকাল কাশীপুরের শ্মশানে সাধুর রোল করতে হবে। লাস্ট সিন। মেকআপ করার লোকও এনেছি। যা যা বলবো করে যাও। ব্যস তারপর দেখবে আমার দিদি ইয়োর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।
