উঠানে হা করে ওই সাবিত্রীর দিকে চেয়েছিলে কেন?
হরিমাধব দেখেছে, ছোটছেলের গাড়ি রয়েছে, বড় ছেলেও ফিরেছে কলেজ থেকে। বৌমারাও রয়েছে।
হরিমাধব বলে স্ত্রীকে আস্তে, কি যা তা বলছ। ছেলে-বৌমারা রয়েছে শুনতে পাবে।
হরিপ্রিয়া খাটে গদিয়ান হয়ে গলা আরও চড়িয়ে বলে–শুনুক। ওদের বাপের গুণের কথা শুনুক। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে–এখনও ছোঁক ছোঁক স্বভাব গেল না। স্বভাব যায় না মলে, ইন্নৎ যায় না ধুলে।
হরিমাধব চাপা স্বরে বলে কি হচ্ছে। জুতো খুলছিলাম নীচে ফিতে খুলতে দেরী হচ্ছিল।
থাক। আর সাফাই গাইতে হবে না। শেষ বারের মত বলে দিলাম এদিক ওদিক চাইবে না।
তারপর গলা তুলে হাক পাড়ে কাজের মেয়ের উদ্দেশ্যে—এই সাবিত্রী, বাসন মাজা হলে রান্নাঘরে গিয়ে আনাজ কোট গে।
অর্থাৎ হরিমাধব এবার চা খেয়ে চেম্বারে নামবে তার আগেই সাবিত্রীকে উঠান থেকে সরিয়ে দেবার কথাই বলা হলো।
হরিমাধবের বয়স এখন ষাট পার হয়েছে। ওর নামে শত্রুতেও কোনদিন কলঙ্ক, অপবাদ দিতে পারেনি। চরিত্রবান সৎ মানুষ।
ভোরে উঠে স্নান করে গুরুবন্দনা পূজা গীতাপাঠ করেন, সন্ধাতেও আধঘণ্টা গুরুপূজা ভজন করে চেম্বারে নামেন।
বাকী সময় কাটে মক্কেল, কেস কাবারি আর আদালত নিয়েই।
তবু গিন্নীর চোখে তার মত ভ্রষ্ট পুরুষ আর যেন কেউই নেই। ফিরতে দেরী হলে কৈফিয়ৎ চায় হরিপ্রিয়া কোথায় ছিলে এতক্ষণ।
হরিমাধব বলে এজলাসে দেরী হয়ে গেল।
—এজলাস? না অন্য কোন মহিলা মক্কেলের বাড়িতে? শুধচ্ছি নিবারণকে?
হরিমাধব বলে— দোহাই তোমার, এসব ছাড়োতো? কি যে ভাবো? ছিঃ ছিঃ এসব কথা বলতে বাধে না।
–বাধবে কেন? তোমাকে বিশ্বাস নাই।
.
এই নিয়ে বৌদের মধ্যেও হাসাহাসি হয়।
—কি কাণ্ড।
ছেলেরা বলে কাজের মেয়েটা আছে তো? মা যা শুরু করেছে আবার।
হরিমাধব বাবুর উপর গিন্নীর কড়া নজর। রাতে হরিমাধব বাবু কোনদিন বাথরুমে যাবেন। হরিপ্রিয়ার ঘুমও সজাগ, দেখে কর্তা ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বের হয়ে যাচ্ছে।
হরিপ্রিয়ার মনে হয় নিশ্চয়ই ওর মতলব ভালো নয়। সেও পা টিপে টিপে কর্তার পিছু পিছু বের হয়ে আসে। এবার হাতেনাতে কর্তার কুকীর্তি ধরবে।
সেকেলে আমলের বিরাট বাড়ি। দোতালার বাথরুম বারান্দার ওদিকে। হরিমাধব বাথরুম থেকে বের হয়ে আসে। দেখে থামের আড়ালে গিন্নী সজাগ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
—তুমি!
হরিপ্রিয়া বলে–বাথরুম যাবে, বলে যাবে তো। রাতদুপুরে কোথায় যাচ্ছো দেখব না? সেই ফাঁকে দেখে হরিপ্রিয়া একতলায় নামার গেটটা সঠিক তালাবন্ধই রয়েছে। ঝি চাকররা অবশ্য একতলাতে থাকে রাতে।
হরিমাধব বলে— এত ঠাকুর নাম করো মনের এই ময়লা বু মুছতে পারলেনা।
এই নিয়েই অশান্তি বাড়িতে। হরিমাধব যেন বাড়ির ছেলে বৌদের সামনে একটা ক্লাউনে পরিণত হয়েছে।
হরিমাধবের ব্যাপারটা ক্রমশঃ অসহ্য হয়ে ওঠে। হরিমাধবের নীচের তলায় নামার সময় হরিপ্রিয়াও নেমে আসে বাতের শরীর নিয়ে।
চেম্বারে ঢুকিয়ে তবে উপরে উঠে যায় হরিপ্রিয়া। খবরটা দুচারজন মক্কেলও জেনে ফেলে।
.
সেদিন হরিমাধবের শ্যালক জমিদার তনয় এসেছে হরিমাধবের বাড়িতে। হরিপ্রিয়াও ভাইকে পেয়ে খুশী।
হরিমাধবের অনেক দিনের বন্ধু ও শ্যালক। কমলবাবু রসিক ব্যক্তি। সন্ধার পর তার একটু পানদোষএর অভ্যাস আছে। জমিদারী চলে গেলেও সেই অভ্যাসটা বজায় রেখেছে কমলবাবু।
হরিমাধব নিজে ওসব খায় না। নিষ্ঠাবান ব্যক্তি সে, তবু শ্যালকের জন্য বিলাতী মদ কাজু বাদাম, কাটলেট এসব আনিয়েছে।
হরিমাধব কমলকেই পেয়ে আজ বলে হরিপ্রিয়ার ওই সন্দেহ বাতিকের কথাটা। বলে তোমার দিদি তো আমার মানসম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দেবে ঘরে বাইরে। যা সন্দেহ বাতিক ওর।
কমল তখন সবে গ্লাসে চুমুক দিয়েছে। সে কথাটা শুনে বলে–সেকি! তুমি তো একদম নিরিমিস্যি লোক, মদ মেয়েছেলে কোন বাতিকই নেই, তোমাকে সন্দেহ করে দিদি!
–সন্দেহ বলে সন্দেহ, ছেলে বৌদের সামনে যা তা বলে? লজ্জায় মাথা কাটা যায়। বাড়ির কাজের মেয়ে—
ওই বুড়িকে নিয়ে সন্দেহ। হেসে ওঠে কমল।
হরিমাধব বলে তুমি হাসছ! এদিকে আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এক এক সময় মনে হয় সংসার ছেড়েই কোথায় চলে যাই। যেদিকে দুচোখ যায়।
কমল বলে–জল অনেক দূর গড়িয়েছে দেখছি। এক কাজ করতে পারো? ফল হবে।
—কি! হরিমাধব আশান্বিত হয়ে শুধোয় সেই পরিত্রাণের পথের কথাটা। কমল গলায় এক ঢোক মদ ঢেলে বলে— একদিন আচ্ছাসে প্রহার করো। বেদম প্রহার দেখবে মারের চোটে ওই সন্দেহের ভূত কোনদিকে পালাবে।
আমি শুধু এদিক ওদিক করি হরিমদা, এই নিয়ে কথা বলতে দিলাম মুষ্টিযোগ প্রয়োগ করে একদিন। ব্যস তারপর থেকে ঠাণ্ডা। তাই বলছি— হরিদা, তুমিও একদিন মুষ্টিযোগ দিয়ে দাও দিদিকে বেশ কড়া ডোজেই দেবে।
হরিমাধব শ্যালকের এহেন পরামর্শে চমকে ওঠেন, বলছ কি হে নীলকমল। এ্যা নিজের স্ত্রীকে প্রহার মারধোর করতে হবে। ছেলেরা বড় হয়েছে বৌমা, নাতি-পুতি রয়েছে। কি ভাববে তারা? নানা এ হতে পারে না। পাঁচজন শুনলে কি বলবে? ছিঃ ছিঃ করবে যে।
কমল মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিজ্ঞের মত রায় দেয় তাহলে তোমার বাঁচার পথ আর নাই। ওই সব পাঁচালী শুনে যাও। তোমাকে বাঁচার আর কোন পথই দেখি না।
