হরিমাধব বাবু নিজে এখানের বারের নামকরা উকিল। নিজের চেম্বার এদিকে। মক্কেলের ভিড় লেগেই আছে।
ফৌজদারী কেসের বিশেষজ্ঞ। ফাঁসির আসামীকে তার সাওয়াল জবাব আর নিপুণভাবে সাক্ষীকে পড়ানোর জন্য তিনি খালাশ করে আনতে পারেন এটা বেশ কয়েকবারই দেখেছে অনেকে।
এজলাসে দাঁড়ালে তরুণ হাকিমরা হরিমাধবকে সমীহ করেন। ভরাটি কণ্ঠস্বর, ইয়া গোল মুখে একজোড়া পুষ্ট বিড়ালের ল্যাজের মত গোঁফ, তার কণ্ঠস্বর গম গম করে এজলাস।
আদালতে তিনি যেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার। চেম্বারেও সেই মূর্তি।
মক্কেল এসেছে চারাভাঙ্গানীর মামলা করতে অন্য পক্ষের নামে। তার ভাইপো নাকি জোর করে কাকার জমি দখল করতে চায়। তার রোয়া ধানগাছগুলি তছনছ করে গেছে। তাই ভাইপোর নামে মামলা করতে এসেছে শশী মোড়ল, বলে, ভাইপোকে ফাটকে পুরতে হবে উকিল বাবু। এই দুশো টাকা আগাম রাখেন, ভাইপোকে ফাটকে পুরতে পারলে আরও পাঁচশো–
তারপরই হরিমাধব বলে–ভাইপোকে ফাটকে পুরতে হবে? তাহলে এদিকে আয়–আয়।
শশী মোড়ল উকিলবাবুর ডাকে এগিয়ে আসতেই এবার উকিলবাবু টেবিল থেকে জম্পেশ রুল কাঠটা তুলে নিয়ে শশীর কপালেই এক মোক্ষম ঘা মারতে শশী আর্তনাদ করে বসে পড়ে কপলে হাত দিয়ে, আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে টোপ টোপ করে।
নিজের হাতের এহেন কাজ বেশ মনদিয়ে দেখছে হরিমাধব।
শশী বলে, মারলেন, কপাল ফাটিয়ে রক্তপাত ঘটালেন কেন? কি করেছি?
—চোপ! হরিমাধব গোঁফ নেড়ে ধমকালেন—চোপ।
তোর মামলা পাকা করার জন্যই এটা করেছি। ওহে মুহুরী।
নিবারণ মুন্ত্রী জানে এরপর তার ডাক পড়বে। সে জানে তারও কিঞ্চিৎ আমদানী হবে। সে জানে কি করতে হবে এরপর। কারণ ফৌজদারী মামলা সাজাবার জন্য উকিলবাবু এসব কাজ করেন। নিবারণ বলে একে থানায় নে গিয়ে ডাইরী করিয়ে আনবো?
—উকিলবাবু বলেন শশী, একটা মিথ্যা সাক্ষীও আমি যোগাড় করে দোব— খরচা দিয়ে যাও থানায় ডাইরী করিয়ে এসো।
রক্তপাত-হত্যার চেষ্টা একবার উল্লেখ থাকলে তোমার ভাইপোকে হাজতে পোরা যাবে না। এবার সব ঠিক করে দিয়েছি। ফাটকে পুরছি তোমার ভাইপোকে।
আর হরিমাধব উকিল তাই করেছে। তিনচারজন জুনিয়ার উকিল আদালত বাড়ির চেম্বারে নথিপত্র নিয়ে হরিমাধবের নোট নেয়। মামলা সাজায়। সাক্ষীদের তালিম দেয় কি কি বলে যেতে হবে দিনকে রাত করার জন্য।
বিপক্ষের উকিলদের আনা সাক্ষীদের জেরার মুখে ধমক দিয়ে হরিমাধব ওদের সবকথাকে তাল গোল পাকিয়ে দেয়।
মামলা উলটে দেয়, হুঙ্কার আর ধমকে হরিমাধব উকিল।
কিন্তু এহেন পুরুষ সিংহ বাড়িতে গিন্নী হরিপ্রিয়ার কাছে একেবারে কেঁচো। হরিপ্রিয়ার বাবা মুর্শিদাবাদের কোন গ্রামের জমিদার। বিশাল চকমেলানো বাড়ি দেউড়ি, ঠাকুর দালান, কাছারিমহল, বাড়িতে জুড়ি গাড়ি সবই ছিল।
বাবার আব্দারে মেয়ে ছোট ভাইএর চেয়ে তার আব্দারই বেশী। জমিদার বাবু দেখে শুনে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।
হরিমাধবের বাবাও ছিলেন জমিদার। তবে হরিমাধব কলেজে পড়ে এখন নামকরা উকিল।
জমিদারী চলে গেছে, হরিপ্রিয়ার ছোট ভাই এখন ধানকল করে ভালো ব্যবসা করছে তবে জমিদারী না থাকায়ও জমিদারী মেজাজটা রয়ে গেছে হরিমাধবের শালা বাবুর। রয়েছে দাপটও।
তার তুলনায় হরিমাধব বাড়িতে নিরীহ নিপাট একটি মানুষ, আর সেটা হয়েছে ওই স্ত্রী হরিপ্রিয়ার দাপটেই। জমিদারী মেজাজ তার।
দশাসই চেহারা, এককালে সুন্দরীই ছিল, ফর্সা গায়ের রং। সেই সুন্দরী মেয়েটি এখন যেন দারোগা। হাকিম সামলাতে জানে হরিমাধব কিন্তু দারোগা সামলাতে অক্ষম, বিশেষ করে বাড়ির এই দারোগাকে।
হরিমাধব বিকালে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি ঢুকছে। উঠোনে কলতলায় কাজের মেয়ে সাবিত্রী একরাশ বাসন নিয়ে মাজতে বসেছে। বাড়ি ঢুকে হরিমাধব নিচে দাঁড়িয়েছে উপর থেকে হরিপ্রিয়ার চড়া গলা শোনা যায়।
ওখানে দাঁড়িয়ে কি হচ্ছে? উঠে এসো! এসো!
হরিমাধব বাবুর মেজাজ চড়ে ওঠে। আদালতে আজকে হাকিমের এজলাসে বেশ তর্ক হয়েছে একটা ল’পয়েন্ট নিয়ে মন মেজাজ ভালো নেই।
গিন্নীর এই হাকডাকে বলে হরিমাধব— যাচ্ছি।
—উঠে এসো, এক্ষুনিই।
হরিমাধব বাবু জুতো খুলে উঠে গেলেন দোতালার ওদিকের ঘরে। গিন্নীর হাকডাকে ওদিকে বড় বৌ শেফালী আর বড় ছেলে চাইল। শেফালী স্বামীকে বলে—এত খোঁজ করে এই কাজের মেয়েটিকে আনলাম বাবার বাড়ি থেকে মা এবার একেও তাড়াবে। কি সন্দেহ বাতিক যে মায়ের।
হরিমাধবের বড় ছেলে অধ্যাপক মধুসূদন পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে বলে— তাই দেখছি। মায়ের কি যে রোগ।
ওদিকে ছোট বৌও দেখেছে ব্যাপারটা। তার ডাক্তার স্বামী চেম্বারে যাবার জন্য পোষাক বদলাচ্ছিল সে বলে–মায়ের এটা একটা মানসিক রোগ। ছোট বৌ আইভি স্বামীকে বলে মায়ের রোগ আবার তোমার মধ্যে সংক্রামিত হয়নি তো? দেখো বাপু?
ডাক্তার হরগোবিন্দ স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে বলে–সে ভয় তোমার নেই।
আইভি বলে একটা কিছু না করলে বাড়িতে কাজের মেয়েতো থাকবে না। মায়ের একি বিশ্রী রোগ। তুমি তো ডাক্তার, দ্যাখনা ওষুধপত্র দিয়ে।
হরগোবিন্দ বলে— এরোগ সারানোর ক্ষমতা বাবা মহাদেবেরও নাই। আমি তো তুচ্ছ।
ওদিকে হরিমাধব তখন গিন্নীর জেরায় জেরবার। হরিপ্রিয়া মুখে পানের উপর একছিটে খুসবুদার জরদা ছিটিয়ে জেরা করে।
