ও, আপনার নাম নীলা বুঝি?
‘হ্যাঁ’ সেলুনের মালিকের কাছ থেকে নিজের নামটা উচ্চারিত হতে শুনে কেমন। রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে নীলা। এই এইটুকু উচ্চারণে নোকটা অন্য একটা জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছে। ভোলার সঙ্গে তার সম্পর্কের মধুর একটা খোঁজ পাচ্ছে সে। যা সেলুনওয়ালাকে ভোলা তার সম্পর্ক কিছু বলার ভেত্র দিয়ে তৈরী হয়েছে। তেমন সম্পর্কের এক দোলা। খুঁজে পায় সে। অনুভূতিতে সেই আবেগ তৈরি হয়। ভোলার চাওয়া ও পারিপার্শ্বিকতার দাবির মধ্যে নীলা এই প্রথম অনু করল ভোলার সে প্রেমিকা আর তারা প্রেম করে। দুজনে দুজনকে ভালবাসে। আর সে কারণেই ভোলাকে খুঁজে মরে। বেসব্রিজের চা দোকান ফার্নিচারের দোকান খুঁজে ট্রেন ধরে চলে আসে বালিগঞ্জ স্টেশনের সেলুন। তার এই অস্থিরভাবে ভোলাকে খোঁজার ভেতর, সেলুনওয়ালাকে জিজ্ঞেস করার ভেতর তেমন কিছু থাকে হয়তো। মুহূর্তে প্রেমিকার মতো মনটা দোলায়িত হয় নীলার।
সেলুনওয়ালা বলল আপনি খোঁজ করতে পারেন ভোলা বলছিল। আজ তো বাড়িতে খেতে যেতেও পারেনি।
ভোলা বলেছে, আমি খোঁজ করতে পারি? বোকার মতো যেন প্রশ্নটা করে নীলা।
সেলুনওয়ালা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়।
কোথায় ভোলা?
পার্টির বাড়ি গেছে, ফুল দিয়ে গাড়ি সাজাচ্ছে। ফুলের দোকানের মন্টুদাইতো তাকে আটকে দিয়েছে।
ফুলের দোকানটা কোথায়?
ওই তো মাংসের দোকানের পাশেই। লোকটা দাড়ি কামাতে কামাতেই বলে।
ছোট্ট ফুলের দোকানটার ভেতর বসে লোকটা মালা গাঁথছিল। নীলা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা মুখ তুলে তাকায়।
নীলা ছোট্ট করে বলল, ভোলা। আর তাতে যেন অনেকটাই বোঝাল।
ফুল-দোকানদার মন্টু জিভ কেটে ফেলে, আর মুখে আত্মীয়সুলভ সৌজন্য। ভোলাকে আটকে রেখে সে যে ভুল করেছে সেটা বোঝাল। আর ভোলার খোঁজে কে এসেছে তৎক্ষণাৎ বুঝেছে, বুঝতে দিয়েছে। আপনি তো নীলাদি?
হ্যাঁ।
দেখুন তো কি মুশকিল! ভোলাকে চলে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু আমার এক কর্মচারী না আসায় ভোলা নিজেই পার্টির বাড়ি গেল। গাড়ি সাজাচ্ছে।
এখনই আসবে ভোলা?
মন্টু একটা টুল বাড়িয়ে দেয়। হাত থেকে অসমাপ্ত মালা এলিয়ে পড়ে। ফুলগুলোর দলে দলে যেন সাড়া পড়ে। এসে যাবার তো কথা! দেরিও হতে পারে। তখনই বললাম তুই যাস না, দোকান বন্ধ করে আমি নিজেই যাই। শুনল না। আমি বললাম নীলাদি-তোর সঙ্গে যদি কোথাও যেতে চায়! একগুয়ে জানেনই তো!
নীলা টুলে বসে পড়ে। যেন সে ভোলার প্রেমিকার মতই বসে পড়ে। যেন তার উচাটন ভঙ্গি গড়ে তোলে।
আবার জিভ কাটে মন্টু কি বিচ্ছিরি ব্যাপার হল বলুন তো! আমার জন্যই!
না না বলে সৌজন্য দেখায় নীলা।
আপনার আজ ছুটির দিন–
কি আর করা যাবে—
আপনি আরও কয়েক জায়গায় খুঁজেছে নিশ্চয়?
হ্যাঁ কেসব্রিজে গিয়েছিলাম।
যা ভেবেছি তাই। নন্দদার সেলুনের দোকানে খোঁজ করে এলেন?
উনি তো আপনার দোকানে পাঠিয়ে দিলেন।
মন্টু ফুলের মালা আবার গাঁথতে গাঁথতে মুখ গুঁজে বলে দেখুন বাউণ্ডুলে ছেলেটাকে পথে আনতে পারেন কিনা। প্রায়দিনই স্নান-খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করে না।
এ ব্যাপারটা ঠিক জানত না নীলা। সে যেন জানে, মন্টুর কাছে এমন ভাব করল এবং জানলও।
ওপারের চা-দোকানে হাত নেড়ে ইশারা করে চায়ের অর্ডার দিল মন্টু। এবং মালা গাঁথতে গাঁথতে নিজের মনে কী ভাবছে। নীলা বুঝতে পারে তার আর ভোলার সম্পর্ক নিয়ে। যে সম্পর্ক সেই জায়গায় পৌঁছয়নি, সেই বাস্তবতার নৈকট্য নিয়ে ভাবছে। ভোলা ও সে প্রেমিক-প্রেমিকা। ভোলার খোঁজে এসেছে, ভোলাকে পেল না। এই ঘটনার সংলগ্ন কিছু নিয়ে ভাবছে। ভোলা একটা ঘরের সন্ধান করছে।
এই কথায় নীলার সমস্ত অাত্মা কেঁপে ওঠে। মধুরতার এক অনুভূতিতে ভরে যায়। সে যদি এখানে কোনও কিছুর একটু আড়াল পেত, তাহলে পার্স খুলে ছোট আয়নাটা বের করে ঠোঁটে লিপস্টিক বুলিয়ে নিত। নিজের চোখের সঙ্গে চোখ রাখত। আর অনেক কথাই ভাবত, যে-সব কথা আগে ভাবেনি।
চা দিয়ে যায় চা-দোকানের ছেলেটা।
নীলা চা খেতে খেতে ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে। একসঙ্গে এত ফুলের সামনে কোনদিন সে থাকেনি। মনোরম লাগে তার এই সৌগন্ধ্য এতসব ফুলের সামনে শুধু আসেনি সে, ভোলার প্রেম নিবেদনের সামনে এসেছে। বিনম্র, লজ্জাবনত হয়ে পড়ে সে। তার ছুটির দিনের শেষ অবশিষ্ট সন্ধ্যাটা খরচ হয়ে গেছে। এখন রাত শুরু হয়েছে। আর সামান্যই সময় তার হাতে আছে।
কমবয়সী একজন দোকানে এল। মন্টু উদ্বেগের সঙ্গে তাকে শুধোয় কী হল ভোলা এল না?
নীলা বুঝল ছেলেটা মন্টুরই কর্মচারী। ছেলেটা বলল, আমাকে পাঠিয়ে দিল। ভোলাদার দেরি হবে আসতে।
মন্টু তাকে হাত তুলে থামায়। তারপর কমবয়সী কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে, তুই তো হেঁটে এলি?
ছেলেটা মাথা কাত করে হা জানায়।
ভোলা হাঁটবে না, বাসেই আসবে। তাহলে এসে পড়বে এখুনি। আপনি আর একটু বসবেন?
না উঠি। এলেই পাঠিয়ে দেবেন।
ঠিক আছে। তারপর মন্টু দুটো বেলফুলের ছোট মালা তুলে নিয়ে নীলার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
নীলা মালা দুটো নেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতে জড়িয়ে নেয়। এই ফুল নেবার ভঙ্গির ভেতর লোভী দেখায় তাকে। মানুষ খাবারের চেয়ে ফুল নেবার ব্যাপারে বেশি লোভ দেখাতে পারে। আর এই মালা দুটো যেন ভোলাই তাকে দিল, এমনটা মনে হয় নীলার এবং রোমাঞ্চ হয়। মনের ভেতর কেমন মগ্নতা তৈরি হয়, আনন্দ তৈরি হয়। মন্টুর দোকান থেকে ফুল নিয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফরমে চলে আসে নীলা। এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একা ভোলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
রাগ অনুরাগ – শক্তিপদ রাজগুরু
হরিমাধব বাবুর এমনিতে বেশ সাজানো সংসার। দুই ছেলেও কৃতি। একজন কোন কলেজের অধ্যাপক, ছোট ছেলে এলাকার নামী ডাক্তার, ভালো পোর।
