হিমাংশু মেয়েকেই দেখছে, সেই মেয়েকে যার নাম পুতুল, দেখতেও পুতুলের মতনই—অমনই নধর গঠন, সুডৌল, সুশ্রী। টিয়াপাখি রঙের নিউ স্টাইল সোয়েটারে পুতুলকে যেন আরো সুন্দর দেখাচ্ছে, এতই অপরূপ যে, হিমাংশু মেয়ের দিকে তাকিয়ে তন্ময়, তৰ্গত। ওই যে পুরু জমাট রক্তগোলাপ—পুতুলের সোয়েটারের বুকের ওপর নকশা ভোলা—ওই গোলাপের লাল আভা যেন পুতুলকে আলো করে তুলেছে তার গায়ের সবুজ, মুখ-চোখ হাত-পা’র লালচে সাদায় সেই আলোর ঢেউ ফেনার মতন ছড়ান-ছিটনো।
খুশিতে উপচে উঠে হিংশু ডাক দেয়, “গ্র্যান্ড! কাছে আয়, কাছে আয় ত পুতুল দেখি—”
হিমাংশুর উচ্ছ্বাস আর ঘরের আলো দুই যেন বেশ তীব্র। কাজেই যূথিকা চোখ ফিরিয়ে পারে না। আর আশ্চর্য, হিমাংশু কাছ ঘেষে দাঁড়াবার আগেই যুথিকা
মেয়ের চোখে চোখ রেখে তাকিয়েছে বিষাক্ত দৃষ্টিতে।
পুতুল মার কুঞ্চিত চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায়। সামনে বাড়ানো পা আস্তে আস্তে টেনে নেয় পিছনে। হঠাৎ সব যেন আড়ষ্ট হয়ে এসেছে ওর।
মেয়ের মুখ থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে নিয়ে স্ত্রীর ওপরই রাখতে হয় হিমাংশুকে। আর সেদিকে তাকিয়ে চট করে ফিরিয়ে নেওয়াও সম্ভব হয় না। সহাস্য, উজ্জ্বল, মুগ্ধ একটি মুখ ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসে।
যুথিকা একপাও সরে আসে নি, একটুও নড়ে নি—শুধু ঘাড় ফিরিয়েছিল যতটুকু ততটুকুই ফিরিয়ে রেখেছে এবং মেয়েকেই দেখছে এখনো, ঠিক তেমনি ভাবেই, অসহ্য একটা বিরক্তিতে। বোঝা যায়নি যুথিকা এবার কথা বলবে, ঠোঁট নড়তেই বোঝা গেল। একটা চিকন স্বর থেমে থেমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল, ঘরের সুপ্তি নিষ্করুণ একটি আদেশের কাঠিন্যে থমথমে হয়ে ভেঙে পড়ল।
“ও ঘরে গিয়ে জামা ছেড়ে চুপচাপ বসগে যাও। শালটা গায়ে জড়িয়ে নিও।”
চোখ নামিয়ে নিয়েছে পুতুল অনেক আগেই। মার আকাশ নীল রঙের পশমের নামার বোতামটাই অনর্থক খুঁটে চলেছে ও। বড্ড শক্ত, নখ বসে না। দাঁত দিয়ে কামড়াতে পারলেই যেন বেশ হত!
পুতুল ফিরেই যাচ্ছে, হিমাংশুর কথায় দাঁড়াল।
“তোমার শাসনের ঠেলায় বাপু অস্থির! তোর মার জামাটা দে ত, পুতুল।” হিমাংশু হাত বাড়ায়। পুতুলকে বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে আসতে হয় আবার। আসতে আসতেই বাবার কথা আবার কানে যায়, “পুতুলের গায়ে কেমন মানিয়েছে সোয়েটারটা বললে না? এবারে এই ডিজাইনটাই নতুন এসেছে।”
মার দিকে না তাকিয়েও পুতুল বুঝতে পারে, ভালো লাগেনি মার; কিছুতেই ভালো লাগতে পারে না।
“টাকাগুলোকে ভোলামকুচির মতন ভাব তুমি!”—যূথিকা বলছে, পুতুলও শুনে যাচ্ছে, “ছাইভস্ম কিনে আনছ, যা-তা ভাবে খরচ করছ। বলার কিছু নেই, ভালো লাগে না বলতে আমার।”
জানা কথাই,মা এই ধরনের কিছু বলবে। পুতুল তাড়াতাড়ি বাবার হাতে মার জামাটা কোনোরকমে ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে চলে যায়।
পুতুল চলে যেতে হিমাংশু যূথিকার দিকে তাকাল! যূথিকাও স্বামীর দিকে। দুতিন পা সরে এসে বিছানায় বসে পড়ে ও।
“কি হল তোমার আবার?” হিমাংশু জানতে চায়, “অযথা মেয়েটাকে ধমকালে কেন?”
“ধমকালেই বা কি–!”যুথিকা হাত বাড়িয়ে হিমাংশুর হাত থেকে জামাটা টেনে নেয়। বিছানার এক পাশে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, “তোমার মেয়ের এসব ধিঙ্গিপনা আমার ভালো লাগে না! তুমি ওকে দিন দিন কী করে তুলছ? আমি ভেবেই পাই না—এরপর কী হবে?”
“ও, এই! সেই পুরনো কাসুন্দী;” খানিকটা স্বস্তি পায় হিমাংশু। মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে! কোলের ওপর থেকে গরম শালটা তুলে বিছানার ওপর রেখে দেয়।
আরাম করে সিগারেট ধরায় একটা।
যুথিকা তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখে। স্বামীর ভাবভঙ্গী থেকে মনের কথাটাও বোঝা যায়। অর্থাৎ হিমাংশু যে তার কথাগুলো পরম অবহেলায় সরিয়ে রাখল, যূথিকা তা বুঝতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে রাগটা দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে ওঠে ওর।
“এসব তোমায় ছাড়তে হবে।” যূথিকা আদেশের সুরে বলে।
“কি?”
“মেয়ে নিয়ে এই ন্যাকামো!”
হিমাংশু স্ত্রীর দিকে চেয়ে এবার হেসে ফেলে; বলে, “মুশকিলে ফেললে। মেয়ের মাকে নিয়ে ন্যাকামি করতে চাইলেই কি তুমি রাজী হবে?”
যূথিকা ধমক দিয়ে ওঠে, “সব সময় তোমার এই তাচ্ছিল্যভাব আমার ভালো লাগে না।”
“কি-ই বা আমার ভালো লাগে তোমার?” হিমাংশু উঠতে উঠতে বলল “ওই তো জামাটা আনলাম তোমার-ওটাই কি ভালো লেগেছে?”
“উঠো না; বসো।” যুথিকা হাত বাড়িয়ে স্বামীর পাঞ্জাবির হাতা ধরল, “আমার জন্য তোমায় জামা কিনে আনতে বলিনি।”
“না বললেই কি আনতে নেই?” হিমাংশু আবার বসে পড়েছে, ‘ইচ্ছে করে, আদর করেও ত মানুষ কিনে আনে।”
“আমার বেলায় ইচ্ছেও নয়, আদরও নয়”যুথিকা কুটিল সুরে বলছে, নিষ্ঠুরের মতন, ধারাল গলায়, “নেহাতই না আনলে নয়, বাধ্য হয়ে, মন রাখতে এনেছ!”
হিমাংশু চুপ। যূথিকার মুখ থেকে দৃষ্টিটা তুলে নিয়েছে। এখন দেওয়ালের টিকটিকিটা তার লক্ষ্যে।
যূথিকার গলায় একটা শিরা নীল হয়ে ফুটেছে, কাঁপছে দপদপ। একটু থেমে কথাগুলো যেন গুছিয়ে নিল ও।
“এভাবৈ আমায় তুমি ভোলাতে চাও কেন? আমি কি ছেলেমানুষ?”
“বোধ হয় তাই।” হিমাংশু আবার একবার চেষ্টা করল সহজ হবার। ফিকে একটু হাসি টেনে বলল, “তুমি আজকাল অল্পতেই বড় চটে ওঠ! তোমাদের মা মেয়ের দুটো জামা কিনে এনে কি এমন অপরাধ করেছি, বুঝছি না;”।
