এখনও দুপুর ফুরিয়ে যায়নি। কেমন অস্থিরভাবে ট্রেন থেকে নামে নীলা। প্ল্যাটফরম পেরিয়ে রেল লাইন ডিঙোয়। সামনেই ফার্নিচারের দোকান। ভোলার বন্ধু মিস্তিরি একা একা কাজ করছে। ওখানে ভোলা নেই। না নেই। মিস্তিরির বাঁ দিকে একটা শূন্য টুল পড়ে আছে। ভোলার জন্যই হয়তো রেখেছে। ফার্নিচারের দোকান পেরিয়ে চা দোকানের সামনে চলে যায় নীলা গোটা দুই খদ্দের। মালিক গেলাসের চায়ে চামচ নাড়ছে। একটু দাঁড়াল নীলা। দোকানদারকে জিগ্যেস করবে কিনা ইতস্তত করল।
দোকানদার নীলার দিকে মুখ তুলে তাকাল। কাউকে খুঁজছেন!
ভোলা এসেছিল?
কে ভোলা! নাইট গার্ড?
হ্যাঁ।
আজ তো আসেনি ভোলা। মাঝে মাঝে আসে।
কোথায় থাকতে পারে এখন?
দোকানদার একটু ভাবল। তা তো বলতে পারব না।গেলাসে চামচ নাড়া শেষ করে চাটা নিয়ে এগিয়ে আসে, নীলার টেবিলের সামনে গেলাসটা বসিয়ে দিয়ে নিন চা খান।
নীলা সংকোচের মধ্যে সহসা পড়ে। না না।
আরে খান না। ভোলার মাসির ঘরের লাগোয়া আপনাদের ঘর না?
নীলা চায়ে চুমুক দেয়। মাথা কাত করে হ্যাঁ জানায়।
গত বুধ্বারে এসেছিল ভোলা। দোকানদারটা সহসা পাশ ফিরে ডানদিকে এগিয়ে যায়। রতন বলে হাঁকে। ফার্নিচার দোকানের মিস্তিরির কাছ থেকে ভোলার খোঁজখবর নেয়।
অস্থিরভাবে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল নীলা। ভোলাকে না পেলে তার চলছেই না। সময়টা কেমন বদ্ধ হয়ে আছে। এক সঙ্গে হাঁটবে, কথা বলবে, পাশাপাশি বসবে, কখনও মুখোমুখি বসবে। রবিবার ছুটির দিনের সারা বিকেল-সন্ধ্যাটা আনন্দের ভেতর কাটাবে। ভেতরে ভেতরে ছটফট করে নীলা। উন্মুখতায় মরে যাচ্ছে।
চা-দোকানদার ফিরে এসে বলল রতন তো বলছে বালিগঞ্জ স্টেশনের সামনে সেলুনে না হলে আর একটু এগিয়ে ফুলের দোকানে খোঁজ করতে। সেলুনের মালিক নন্দ, তার দোকানে মাঝে মাঝে আড্ডা দেয়। আর মন্টুর ফুলের দোকানে যায়। বিয়ের গাড়ি সাজানোর থাকলে ভোলাও হাত লাগায়। একবার বালিগঞ্জ স্টেশনে গিয়ে দেখতে পারেন। খুব দরকার বুঝি?
নীলা বলল, হ্যাঁ। ভোলাকে পাওয়া যেতে পারে ওখানে?
দেখুন না গিয়ে। আর যাবে কোথায়?
দুপুরে খেতে যায়নি।
তাহলে তো ওদের কারুর সঙ্গে ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা গিয়েছে। হোটেলে খেয়ে নিয়েছে।
অমনি স্টেশনের দিকে পা চালাল নীলা। বেসব্রিজ থেকে উলটো ট্রেন ধরে বালিগঞ্জ স্টেশনে যেতে হবে। ফার্নিচারের দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছিল রতন। তার দিকে সৌজন্য চোখাচোখি না করেই পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় সে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সেই ব্যাপারে টা খচখচ্ করে। কিন্তু ভোলাকে না পেয়ে তার যে মনের অবস্থা, তার পক্ষে কালক্ষেপ করা আর সম্ভব হল না। যদি এখনই ট্রেন এসে যায়। লাইন টপকাতে গিয়ে পেছন দিকে তাকায়। দেখে ট্রেন আসছে কিনা। দুরে ট্রেরে দেখা পেল না অথচ। প্ল্যাটফরমে ওঠার পরে বুঝতে পারে জোরে হেঁটে আসার ফলে ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে তার। এই শাসের মধ্যে কেমন ভোলাকে পাবার আবেগ খুঁজে পায় সে। এবং সেই আবেগ গুঁজে দেয় যেন। খুঁজে পায় যেন। যার সঙ্গে তার প্রেম হয়নি। তার ছুটির দিন, ভোলার সঙ্গে কাটানোর আবেগটুকু নিয়েই আন্দোলিত হয় প্রচুর। যে সময়টুকু তার অন্য কোনভাবে কাটতে চায় না, বা কাটাতে চায় না, তার এই ভোলার সঙ্গে সময় কাটানোর, মেলামেশার পছন্দ নিয়ে অভিযান করছে যেন সে। যে সময়টুকু ভোলার সঙ্গে কাটানোর আকাঙক্ষা সে করছে, ভোলাকে খোঁজার ভেল্প দিয়ে সেই সময় থেকে খানিকটা করে খরচ হয়ে যাচ্ছে। তাকে রোধ করতে পারছে না নীলা। সারা সপ্তাহের ভেতর একটা দুপুর-বিকেলসন্ধ্যার নিজস্বতার অবকাশ বা যাপনকে কাজে লাগাতে পারছে না। সামনের সন্ধ্যাটুকুও খরচ হয়ে গেলে আরও এক সপ্তাহ তাকে অপেক্ষা করতে হবে আর একটা দুটির দিনের দুপুর বিকেল সন্ধ্যার জন্য।
নীলা যেন চেষ্টা করে সময়টাকে বাঁচিয়ে রাখার। যেন শেষ বিকেলের মরা আলো একেবারে মরে যেতে না দিয়ে তার ট্রেন বালিগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে যাবে, এমন এমন বাসনা মনের ভেতর তৈরী করে সে। কেসব্রিজে ট্রেন পেতে অনেকটা সময় বয়ে গেছে। এখন লেক-গার্ডেন্সে ট্রেন পৌঁছতেই বিকেলের মরা আলো কেমন গাঢ় অন্ধকার নেয়। কেমন ছায়া ছায়া সন্ধ্যা নেমে আসে। কেমন যেন না পাওয়ার বেদনা মনের মধ্যে ছুটে আসে। আজকের দিনে এবং এই মুহূর্তে ভোলার সঙ্গ না পাওয়া তার কাছে কতখানি বেদনার, বিকেলের আলো মরে গিয়ে সন্ধ্যা হবার ভেতর দিয়েই খানিকটা বোঝে নীলা। এই বেদনা বোঝারও তো তার অবকাশ থাকে না! চলন্ত ট্রেনের ভেতর সেই বেদনার। অবকাশ নিয়ে ভরা হয়ে ওঠে নীলা। ভোলাকে সে খুঁজছে। এই খোঁজার প্রক্রিয়ার এক নিজস্বতা আছে। খোঁজার ভেতর দিয়ে ভোলাকে নিয়ে আরও বাসনা তৈরি হয়। এক ধরনের প্রেমার্ত হয়ে পড়ে যেন। সেটা কী ধরনের প্রেম সে নিজেই জানে না। সে শুধু খুজছে, আর ভোলাকে পাওয়ার বাসনা তাকে আছাড়ি-পিছাড়ি মারছে। সে যা চাইছে, পাবে না কেন, এক ধরনের ক্রোধও তৈরি হয় তার।
বালিগঞ্জে নির্দিষ্ট এক সেলুনে ভোলার ঠেক খুঁজে বের করে নীলা।
সেলুনওয়ালা মাঝবয়সী। একজনের দাড়িতে সাবান লাগিয়ে নীলার দিকে সরে এসে বলল ‘ভোলার কি আপনি আত্মীয়?
না, আমার পাড়ার ছেলে।
