আর তার বয়সী মেয়েরা বাবুর বাড়িতেই কাজ করে, সে করে জেরক্সের দোকানে চাকরি, তার এই গৌরব নিয়েও বস্তির থেকে আলাদা কিছু নয়। বস্তি থেকে বেরিয়ে পড়লে যদিও অন্যরকম হয়ে যায় মন তার। তা গা থেকে বস্তি মুছে যায়। সেও মুছে ফেলতে চায়। সে স্বপ্নযাপন বা মিথ্যাপন, সেই আনন্দ নিয়ে এখন আজকের এই ছুটির দিনে আনন্দিত হতে পারে না। এমনই গুরুত্বপূর্ণ এই ছুটির দিনটি। এমনই যাপনের সংকট। নীলা সকাল থেকে খুঁজে ফেরে ভোলাকে। ভোলার মাসির ঘরে গিয়ে গিয়ে। খোঁজ নিয়ে আসে। দশটার পর থেকে খোঁজ নিয়ে এসেছে। যখন তার স্নান হয়ে যায়। এবং চুলে গামছা গোঁজা থাকে। সকাল দশটা পর্যন্ত প্রায় দিন ভোলা ঘুমিয়ে থাকে। কেন হাইড রোডের একটা কারখানায় ভোলা নাইটগার্ড দেয়। ভোরের বেলা ফিরে একটু ঘুমোয়। দশটার পর জেগে ওঠে। এদিক ওদিকেই থাকে। কিন্তু কাছাকাছি কোথাও ভোলার খোঁজ পাওয়া গেল না। সকাল নটার সময়ই বেরিয়ে যায়। কখন ফিরবে, কিছু বলে যায়নি মাসিকে।
সাজতে শুরু করবার আগে একবার ভোলার মাসির ঘরের কাছে যায় নীলা। ও মাসি, ভোলাদা ফিরেছে?
না রে নীলা। খুব দরকার নাকি?
একটু দরকার ছিল।
কতবার খোঁজ নিতে এলি বল, তার মধ্যে ছোঁড়াটা এল কই! ফিরব না বলে যায়নি অথচ।
দুপুরে খায়নি?
না, সেই চা খেয়ে বেরিয়েছে নটার সময়। ভাত ঢেকে রেখেছি।
পেছু ফেরে নীলা, ভোলাদা ফিরলে আমাকে ডাক দেবে মাসি।
ডাকব রে ডাকব।
ঘরে ফিরে নীলার মনে হয় তিনটে বেজে গেল, এখনও ফিরল না তখন খাবার জন্য আর ফিরবে না। বাইরে কিছু খেয়ে নেবে। বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়েছে নিশ্চিত। তারা কোথাও যাবার প্ল্যান করল হয়তো। ভোলা নেই, তাহলে কী করে নীলা! এখন যদি রবিবার ছাড়া অন্যবারের দুপুর হত, তাহলে নীলা জেরক্স মেশিনের সামনে ভাববারও। সময় খুঁজে পেত না। একটার পর একটা কাজ। ভিড়। মেশিনের শব্দ, কথোপকথন, নানা কিছু নিয়ে নিজেকে একটা জায়গায় রেখে দিতে পারত। এখন পারছে না। শুধু ঘর, আর একা সে। চাকরির এই সমস্যা, ছুটি পায় একদিন। বাবুর বাড়ির কাজে ছুটি নেই, এই সমস্যাও ছিল না।
ভোলার জন্য অপেক্ষা করে থাকার কোনও মানে হয় না। এখন তো নিটে বাজে, আরও এত সময় কাটাবে কী করে? এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে তাকে। ভোলার বন্ধুদের দোকানে দোকানে বা আড্ডার জায়গায় ভোলাকে খুঁজতে বেরোতে হবে তাকে। শুধু ভোলাকেই তার চাই। কেন না ভোলার সঙ্গে কথা বলেই খুশি হয় সে। মিশতে ভাল লাগে তার। বাবুদের বাড়িতে কাজ করার অভ্যস্ততায় মাঝে মাঝে ফোনের কথা মনে আসে। যেন কোথাও কোথাও ফোন করে ভোলার খোঁজ এখুনি পেয়ে যাবে সে। যেমন করে বাবু-দিদিরা সহজ সমাধান করে। ভোলার ক্ষেত্রে অবাস্তব হলেও মনে পড়ে যায় নীলার। বাবুর বাড়ির কাজ করার অভ্যস্ত মন কখনও কখনও এভাবে উঁকি দেয়। ভোলা যদি এমন কোথাও থাকত, যেখানে ফোন আছে, তাহলে নীলার ক্ষেত্রে অসম্ভব ছিল না ফোন করার। সামনে হাউজিংয়ের গেটের সামনেই কয়েন ফেলে ফোন করতে পারত সে।
মাঝে মাঝেই উঁকি দেয় সেই অভ্যাসের নানা কিছু। প্রতিদিন বাজার করার সমস্যায় ফ্রিজ অথবা লোডশেডিঙে ইনভার্টার। অধ্ব গ্যাস ফুরোলে হিটার। নগদ টাকা না থাকলে খবরের কাগজওয়ালাকেও চেক লিখে দেয়। তেমন কিছু নিজস্ব সমস্যার ভেতর উঁকি দিয়ে চলে নীলার।
একটা জিনরে স্কার্ট পরেছে নীলা। আর গায়ে চড়িয়েছে সাদা গেঞ্জি। ব্যাগি হাতা, গোল গলা। মাথার চুলে ক্লিপ এঁটে পেছনের চুল কিছুটা সামনে এনেছে। বাঁ হাতে ছোট একটা ফোমের ব্যাগ। তার ভেতর কিছু খুচরো টাকা পয়সা। তাছাড়া আছে টিপের পাতা, একটা লিপস্টিক, একটা কাজল পেনসিল আর ছোট একটা সস্তায় কেনা আয়না। এও সে শিখেছে।
টালিগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফরমে উঠে এসে পান সিগারেট গুমটিতে যায়। দোকানের সামনে বাদল আর বিন্দু আড্ডা দিচ্ছিল। ভোলার বন্ধু।
নীলা তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই হতচকিত হয় ওরা দুজন। ভেবেছিল অন্য কেউ। বুঝতে পারল নীলা। এমন পোশাকে তাকে মনে হয়নি ওদের। ওদের চোখ ধাধিয়ে দিয়েছে বলা যেতে পারে। আর নীলাও শান্ত ও ভদ্র স্বরে বলল, ভোলা নেই!
না। বলল বাদল। বাদল যেন এই ছোট্ট না-টুকু ছাড়া বেশি কিছু বলার সম্পর্কের স্বচ্ছতা খুঁজে পাচ্ছে না।
অথচ নীলা পেছন ফিরেই একটু ইতস্তত করে, যাতে ওরা আরও কিছু কথা সহজ স্বরে বলতে পারে। সহসা দূরত্ব তৈরি হওয়া বজায় রেখেই যেন ওদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেনীলা। সেজন্যই ওরা আন্তরিক স্বরে কথা বলতে পারল না। নীলার ছিল তাগিদ। এখনই ভোলাকে খুঁজে ফেলার তাগিদ। ফলে ওদের কাছ থেকে সরে আসতেই হয়। স্টেশরে আরও সম্ভাব্য জায়গায় খুঁজতে হয়। চোখ চালিয়ে নিতে হয়। এগিয়ে পেছিয়ে দেখতে হয়। তার নিজেরই এই মুহূর্তে মনে হয় একটা রোদের চশমা চোখে পরলে ভাল দেখাত তাকে।
এমনি করে ভোলাকে খুঁজে ফেরার অস্থিরতায় চলতে ফিরতে পেছন থেকে একটা ট্রেন এসে পড়ে। কিছু লোকজন নামে। সেই লোকজনের মধ্যে ভোলাকে খোঁজে নীলা। তারপর গাড়িটা ছাড়ার মুহূর্তে মনে পড়ে যায় বেসব্রিজে একটা আড্ডার ঠেক আছে ভোলার। সেখানে থাকলেও থাকতে পারে। মাঝে মাঝে বেসব্রিজে একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় ভোলা। সেখানে একটা ফার্নিচারের দোকান আছে। সেই দোকানের এক কমবয়সী মিস্ত্রির সঙ্গে ভোলার বন্ধুত্ব। তার কাছ থেকেই টুকরো টুকরো কাঠ থেকে নানা কিছু বানানোর কাজ শিখেছে। তার কাজ দেখে শেখা। চা-দোকানের মালিকের সঙ্গেও ভাল বন্ধুত্ব ভোলার। কখনও চায়ের দোকানে বসে সময় কাটায়, কখনও ফার্নিচারের দোকানে কাজ করতে থাকা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে থাকে।
