শোনো, আমি কাল বাড়িওলাকে নোটিস দিতে চাই। এত টাকা ভাড়া দিয়ে এ বাসায় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তার মানে?
অফিরে কাছাকাছি এলাকায় দেড়-দু’রুমের ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া করে আমি মেয়েদের নিয়ে উঠব। তুমি অবশ্য ইচ্ছে করলে এ বাসা রাখতে পারো। কিংবা আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে তোমার মা-ভাইকে নিয়ে থাকতে পারো।
মা ও ছোট ভাইকে বাসায় ঠাঁই দেয়ার আগে শ্বশুরকুলের সকল উৎপাত সইবার মতো উদারতা দেখিয়েছে আরিফ। আপন ভাইয়ের সঙ্গে শালা-শালিকে রাখতে চেয়ে স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু শান্তা শাশুড়ি-দেরকে কখনো আপন ভাবতে পারে না। তাই বলে এমন চরম প্রতিক্রিয়া আশা করেনি আরিফ। অনেকক্ষণ নীরব থেকেও চোট সামলাতে পারে না। তার অভিমান হয়। রাগও বাড়ে।
কী! কথা বলছ না যে।
সেপারেশনের নোটিস দিচ্ছ মনে হয়। কিন্তু আমি যদি আমার মেয়েদের তোমার সঙ্গে যেতে না দেই?
তাহলে আরো ভালো। তোমার মেয়ের দায়িত্ব তোমার। একা হলে আমিও নিজের বাবা-মায়ের প্রতি বেশি বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারব।
শুধু বাবা-মা কেন, আলাদা বাসা নিয়ে লাংদের নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে পারবে। খানকী মাগী কোথাকার। গালটা মুখে এলেও, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংযত রাখে আরিফ। গম্ভীর কণ্ঠে বলে শুধু, তুমি আসলে খুব সেলফিশ মেয়ে শান্ত।
স্বার্থপর আমি না তুমি?
আমি সেলফিস হলে মা-ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব অস্বীকার করতাম। তোমার বাড়ির কারো প্রতি সিমপ্যাথি থাকত না।
তুমি আসলে একটা ভণ্ড। হিপোক্রাট। আই হেইট যু। আমার চেয়ে বল বেতন পাও। হেইট তো করবেই।
দেখো তো শুধু আমার রোজগারটাই। চাকরিটা না থাকলে তোমার সংসারে কাজের মেয়ের চেয়ে বেশি মর্যাদা থাকত না আমার।
কাজের মেয়ের চেয়েও তোমার মন-মানসিকতা জঘন্য।
তা তো হবেই। রাস্তার মেয়ে কাজের মেয়ের সঙ্গে শুতে যার রুচিতে বাঁধেনি, তার কাছে স্ত্রীর মন-মানসিকতা জঘন্য তো হবেই।
রাতদুপুরে চিৎকার করবে না।
পুরনো প্রেমিকার কথা বলায় আঁতে ঘা লাগল!
তোমার সাথে ঝগড়া করার রুচি আমার নেই। আলাদা হও, আর কারো সঙ্গে লটকে পড়–কালকেই এ বাসা ছেড়ে চলে যাবে তুমি।
আমি যাব কেন? এ বাসার ভাড়া দেয় কে? গেলে তুমি যাবে।
আবারও টাকার গরম দেখাও মাগী! ছোট লোক।
খবরদার, গায়ে হাত দেবে না।
ঠিক এ সময়ে পাশের ঘর থেকে দশ ব বয়সের বড় মেয়ে রিয়া ছুটে আসে। অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে বাবা-মাকে শাসন করে, তোমরা এত রাতে ঝগড়া করছ। কেন? পিয়ার ঘুম ভেঙে যাবে।
শান্তা ততক্ষণে খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। চোখে টলমল অশ্রু নিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায় সে, না, আর ঝগড়া নয় সব শেষ। এখন থেকে তোরা তোর বাবার সঙ্গে থাকবি।
মেয়েকে বাবার কাছে রেখে, হাতে একটা বালিশ নিয়ে ঝটিতে পাশের ঘরে চলে যায় শান্তা।
বাবা, কী হয়েছে। মাকে বকেছ কেন?
শুধু বকা নয়, দু’গালে দুটি ওজনদার চড় কষাতে পারত যদি আরিফ, বিদায়ী উপহার দিতে পারার আনন্দ হতো। কিন্তু তা করতে না পারায় স্ত্রীকে খতম করার আক্রোশ, সংসার তুচ্ছ করার বিধ্বংসী ক্রোধ বুকের ভেতর ফুলে ফেঁপে ওঠে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সংযত হয় আরিফ। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে ভেতরের যন্ত্রণা লাঘব হতো কিছুটা। কিন্তু রিয়ার সহানুভূতিশূন্য রুক্ষ দৃষ্টি দেখে আবেগটা তেমন জোরালো হতে পারে না।
আত্মজার হাত চেপে ধরে যন্ত্রণাবিকৃত কণ্ঠে বলে, তোর মা এখন থেকে আলাদা থাকবে। তোরা আমার সঙ্গে থাকবি মা।
রিয়া হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জানায়, না। আমিও মায়ের সঙ্গে থাকব। তারপর পাশের ঘরে চলে যায়।
৪.
সাজানো ঘরসংসার দেখে মনে হবে না, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হবার পর্যায়ে। অবশ্য সংসার গোছানো ও সচল রাখার ব্যাপারে যার ভূমিকা প্রধান, সেই কাজের বুয়াটি কাজ করে যায় যথারীতি। গ্রাম থেকে শান্তার শাশুড়ি-দেবর এসে সংসারে অশান্তির আগুন কোথাও দেখতে পায় না। সারাদিন অফিসে গত করে বাসায় ফিরে শান্তা দৈনন্দিন ভূমিকায় আগের মতো স্বাভাবিক হাসিমুখে শাশুড়ি-দেবরের সঙ্গে কথা বলে, খোঁজ-খবর নেয়, রিয়া-পিয়াকে পড়তে বলে এবং কাজের বুয়াকে আদেশ দেয়। নানারকম।
একদিন অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যা উতরে গেলে শাশুড়ি মৃদু অভিযোগ করে, আরিফ তো বিকেলেই ফেরে। তোমার অফিস থেকে ফিরতে এত রাত হয় যে!
শান্ত হাসিমুখে জবাব দেয়, আপনার ছেলের প্রকারি চাকরি। আমারটা বেসরকারি। বেন দেয় জ্বল, খাটিয়েও নেয় বেশি বেশি। পারলে সারারাতই খাটিয়ে নেয়।
এ ধরনের কথায় শাশুড়িবধূর প্রচ্ছন্ন বিরোধ যতটা প্রকাশ পায়, তারচেয়ে বেশি প্রকাশ্য করার আগ্রহ বা সাহস উভয় পক্ষের কেউ দেখায় না আর।
স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সঙ্কট চাপা দিতে এবং তাদের আসন্ন বিচ্ছেদ বিলম্বিত করতেই যেন বা এক সকালে বাসায় অপ্রত্যাশিত মেহমান আসে। শান্তার বাবা, মা ও বোন। বিনা নোটিসে এসেছে তারা। স্বামী-স্ত্রী দুজনই খুব অবাক, পরস্পরের প্রতি। সন্দেহ জাগে। শান্তা ভাবে, তাকে জব্দ করার জন্যে আরিফ হয়তো গোপন খবর দিয়ে তার বাবা-মাকে এনেছে। বিশেষ করে কান্তাকে দেখে সন্দেহটা তীক্ষ্ণ হয়। অন্যদিকে আরিফ ভাবে, প্রতিশোধ নিতে কিংবা ছাড়াছাড়ির বিষয়টা পাকাঁপোক্ত করতে শান্তাই নিশ্চয় বাবা-মাকে জরুরি তলব করেছে। কিন্তু উভয়ের সন্দেহ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আসল খবর শ্বশুরের মুখে প্রথম জানা গেল। শান্তার মা অসুস্থ, পেটের কোণায় হঠাৎ হঠাৎ তীব্র ব্যথা। স্থানীয় ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঢাকায় পিজির এক প্রফেসরকে তাড়াতাড়ি দেখানোর পরামর্শ দিয়েছে। সে কারণে খবর না দিয়ে রওয়ানা হয়েছে তারা। কান্তাও জোর করে সঙ্গে এসেছে।
