২.
দু’জনের আয়ে সংসার চলে। বাড়ি ভাড়া পুরোটা দেয় শান্তা। বাদবাকি দায়িত্ব আরিফের। তারপরও বাকি থেকে যায় অনেক কিছু। যেহেতু শান্তা বেতন পায় বেশি, স্বামীর দায়িত্বে ভাগী হয়ে সংসারের নানা খাই মেটাতে হয় তাকেই বেশি বেশি। নিজের বেতনের টাকা স্বাধীনভাবে খরচ করতেও পারে না, বেচারী। তারপরও স্ত্রীর কাছে দাবির অন্ত নেই আরিফের। সরাসরি হাত পাতে না। কিন্তু স্ত্রীর ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল জানে নানারকম।
স্বার্থ হাসিলের প্রয়োজন হলে স্ত্রীর প্রতি দরদ উথলে ওঠে আরিফের। আগের দিন শান্তা অফিস ফেরতা বাজার করে এনেছে। খবরটা জেনেও পরদিন সন্ধ্যায় আরিফ স্ত্রীর হুকুমের দাস সেজে বলে, কই গো, বাজার-টাজার করতে হলে বলো, ঘুরে আসি। বাজারে যেতে হবে না শুনে দায়িত্ব মুক্তির আনন্দ নিয়ে আরিফ আবদার করে, তোমার হাতের এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে। অনেক দিন খাই না।
শান্তার রোজগার যেমন, তেমনি তার হাতের রান্না খেতেও কম ভালবাসে না আরিফ। কিন্তু সারাদিন অফিস করার ক্লান্তি এবং অফিসে যাওয়া-আসার ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরে রান্নাঘরে ঢোকার কথা ভাবলেও বিরক্ত হয় শান্তা। কাজের বুয়া যেমন রাঁধে মুখ বুজে তাই খায়। কিন্তু খেতে বসে আরিফ প্রায়ই গজর গজর করে। শান্তাকে তাই স্বামীর রসনা তৃপ্তির আনন্দ যোগাতে অনিচ্ছাতেও রান্নাঘরে ঢুকতে হয় মাঝে মধ্যে। ঘন দুধে কড়া লিকার মিশিয়ে তার পছন্দসই চা বানিয়ে দেয়। চায়ে চুমুক দিয়ে পরিতৃপ্ত স্বামীর দরদ আজ এতটাই উথলে ওঠে যে, স্ত্রীকে ছাড়িয়ে তা স্ত্রীর জ্ঞাতিগোষ্ঠীকেও স্পর্শ করতে চায়।
তোমাদের বাড়ির খবরটবর কিছু পেয়েছ? রিটেয়ারমেন্টের পর আব্বার সামান্য পেনশন দিয়ে সংসার কীভাবে যে চলছে–আল্লাই জানে।
শ্বশুরবাড়ির জন্য স্বামীর টেনশন দেখে শান্তার সন্দেহ তীক্ষ্ণ হয়। বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে তার দায়িত্ববোধের কথা আরিফের অজানা নয়। গত মাসেও ছোট ভাইকে গোপনে এক হাজার টাকা দিয়েছে সে। আরিফের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে জবাব দেয় শান্তা–হ্যাঁ, আব্বার আশা ছিল অন্তত একটা ভাই-বোনের দায়িত্ব নিয়ে আমি তাকে কিছুটা রিলিজ দেব।
এরকম আশা করাটা খুব স্বাভাবিক। আর আমাদের মতো মিডল ক্লাস ফ্যামিলির বড় সন্তানের জন্য এরকম কিছু কর্তব্য পালন তার নৈতিক দায়িত্ব। এক কাজ করো শান্তা, তুমি কান্তাকে ঢাকায় এনে কলেজে ভর্তি করিয়ে দাও। ওর লেখাপড়া, বিয়ে, সব দায়িত্ব আমরা পালন করবো।
নিজের মেয়েদের লেখাপড়ার খোঁজ নেয় না কখনো সেই মানুষ আজ শ্যালিকার প্রতি দায়িত্ব পালনে এত আগ্রহী কেন? স্বামীর মতলব ঠিক ধরতে না পেরে ঠাট্টার ভঙ্গিতে শান্তা সরাসরি জানতে চায়—কী ব্যাপার। হঠাৎ শালির প্রতি এত দরদ যে! কান্তা চিঠি-টিঠি দিয়েছে নাকি?
আমাকে চিঠি দেবে কেন! কান্তার দায়িত্ব নিলে আব্বা-আম্মা কিছুটা হাল্কাবোধ করবেন। তাছাড়া ঢাকায় থাকতে পারলে কান্তাও খুশি হবে।
কিন্তু কান্তা তোতা ওখানে কলেজে পড়ছে। ওর চেয়ে জামালকে আনলে আব্বা মা বেশি খুশি হতো। জামালের কথা বলছ না কেন?
আমরা সারাদিন বাইরে থাকি। কান্তা থাকলে বাচ্চাদের সুবিধা হতো। তাছাড়া ও দেখতে শুনতে ভাল। ঢাকায় রাখলে ওর জন্য ভাল ছেলে খুঁজে পাওয়াটা সহজ হতো।
বাসায় যুবতী কাজের মেয়ে রাখলে স্বামীর যেমন সুবিধা হয়েছিল, কান্তা এলে তার চেয়েও বেশি সুবিধা হবে—এ সত্য শাস্তা বোঝে। সন্দেহ প্রকাশ করে লু স্বামীর মহত্ত্ব খাটো করতে চায় না সে। অন্যদিকে প্রস্তাবের মূলে আরিফের যে কোনো গোপন স্বার্থচিন্তা নেই, সেটা বোঝাতেই যেন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত পাল্টায় সে।
বেশ তো, কান্তার বদলে জামালকেই তবে নিয়ে এস।
শান্তা এবার দৃঢ়কণ্ঠে সিদ্ধান্ত জানায়, না। কাউকে আনার দরকার নেই। এমনিতে দু’জনের আয়ে সংসার ঠিকমতো চলে না। তার ওপর কলেজ-ইউনিভার্সিটি গোয়িং এক জনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার সাহস নেই আমার। তারচেয়ে পারলে মাঝে মধ্যে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।
কিন্তু এদিকে আর একজন তো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসার জন্য আসছে। রক্ত সম্পর্ক, ঠেকাবার কোনো উপায় নেই। পারি না পারি বোঝা টানার চেষ্টা করতেই হবে।
দীর্ঘ ভূমিকা শেষে, পরিবেশ অনুকূলে আনার চেষ্টা ব্যর্থ হলে আরিফ সরাসরি আসল খবরটি জানায়। তার সর্বকনিষ্ঠ ভাইটি গ্রামে ম্যাট্রিক পাস করেছে। এখন তার সব দায়-দায়িত্ব আরিফকেই নিতে হবে। বাবা নেই। মায়ের এটাই সিদ্ধান্ত। আগামী সপ্তাহে ছোট ভাইকে নিয়ে মা ঢাকায় আসছেন। শ্বশুরবাড়ির প্রতি দরদ যে নিজের মা ও ভাইকে স্ত্রীর কাছে সহনীয় করে তোলার জন্য, বুঝতে সময় লাগে না শান্তার। তার মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। সহজে মেনে নিতে পারে না সে।
আরিফ সান্ত্বনা দেয়, সে জন্য বলছিলাম শান্তা, এক জনের দায়িত্ব নেয়া আর দু’জনের দায়িত্ব নেয়া একই কথা। আমাদের একটু কষ্ট হবে। কিন্তু কী আর করা। তুমি বাড়িতে লিখে দাও জামাল চলে আসুক।
শান্তা জবাব দেয় না। নীরবে স্বামীর পাশ থেকে সরে যায়।
৩.
স্বামীর পাশ থেকে নীরবে সরে আসা যে আসন্ন বিচ্ছেদ ঘোষণা, প্রথমে তা নিজেও বুঝতে পারেনি শান্তা। একা হলে মন ক্রমে বুঝিয়ে দেয়। স্বামী সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুক্তিগুলো সংসার থেকে স্বতঃস্ফুর্ত উঠে আসে। রাতে বিছানায় শোয়ার পর নিরাবেগ শান্ত কণ্ঠে ঘোষণা দেয় শান্তা।
