শ্বশুর-শাশুড়িকে শুধু স্বাগতম ও সান্ত্বনা জানিয়ে ক্ষান্ত হয় না আরিফ। ডাক্তারের সঙ্গে এপোয়েন্টমেন্ট করার দায়িত্ব নেয় নিজে। অফিসে যাওয়ার আগে বাজারেও ছুটে যায়। স্ত্রীকে ভালবাসতে পারার অক্ষমতা পুষিয়ে নিতে আরিফ যেন শ্বশুর-শাশুড়িকে বেশি বেশি সেবাযত্ন করতে তৎপর। শাশুড়িকে ডাক্তার দেখানোর ঝামেলা বহন নয় শুধু, খরচের টাকা যোগাতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সে। এ কারণে টাকা ধার করতে দ্বিধা করেনি। শান্তার সঙ্গে বিচ্ছেদ যদি ঘটেই যায়, শ্বশুর শাশুড়ি নিশ্চয় বলবে, তাদের প্রাক্তন জামাই কত ভাল মানুষ ছিল। এতসব ঝামেলার মধ্যেও সুযোগ পেলে শ্যালিকার সঙ্গে সহাস্য বাক্য বিনিময় এবং বাকাচোরা চাউনিতে যথেষ্ট স্নেহ শুভেচ্ছা প্রকাশেও কার্পণ্য করে না আরিফ। দাম্পত্য শূন্যতা ভরিয়ে তোলার জন্য বাসায় অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ।
কিন্তু রাতে বেশ একাবোধ করে আরিফ। সকলের সুবিধাজনক শোয়ার ব্যবস্থা করে দিতে গিয়ে নিজে অসুবিধাজনক অবস্থায় পড়েছে। ড্রয়িং রুমে সোফার ওপর একা ঘুমায়। মশারি খাটাবার উপায় নেই। নিচে কয়েল জ্বলে। ঘুম আসে না সহজে। ঝগড়ার পর শান্তা তার সঙ্গে কথা বলেনি এখনো। তার মতিগতি বেশ রহস্যময়। কথা বলুক, রাতে স্বামীর সুবিধা-অসুবিধা স্বচক্ষে দেখতে ড্রয়িং রুমে সে আসতে পারে। কিন্তু আসে না। নিধুম ভগ্নিপতির সঙ্গে গল্প করতে কান্তা স্বাচ্ছন্দ্যে এ ঘরে আসতে পারে। কিন্তু বোনের ভয়ে আসার সাহস পায় না হয়তো। এসব ভাবনা নিয়ে রাতে আরিফ কয়েলটার মতো নিঃশব্দে জ্বলতে থাকে একা।
.
পরদিন অফিস ছুটির পর দুপুরে মায়ের দূত হয়ে রিয়া বাবার কাছে আসে।
মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে সপরিবারে দাওয়াত খেতে যাওয়ার কর্তব্যটি ভুলে গিয়েছিল আরিফ। শান্তার মনে আছে দেখে আশ্চর্য হয়। বিরক্ত হয়ে মেয়েকে বলে, তোর মাকে নিয়ে যা। আমি যাব না।
মা-ই-তো রেডি হতে বলল। শুধু আমরা চার জন যাব। তাড়াতাড়ি জামা-প্যান্ট পরে নাও।
মেয়ের অতিউৎসাহে, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আগ্রহে, নাকি নিছক লোকদেখানো সামাজিকতা রক্ষার দায়ে স্বামী-স্ত্রী সেজেগুঁজে বাইরে বেরয়? নিজেরাও ঠিক জানে না তারা। সঙ্গে বাচ্চারা। অন্যের অতিথি হওয়ার জন্য গোটা পরিবারকে সাজতে দেখে বাড়ির অতিথিরাও বেশ খুশি। বাচ্চা দুটির খুশি আরো বেশি।
রিকশায় পাশাপাশি বসে তারা। বাবা-মায়ের কোলে মেয়ে দুটি। গলি পেরিয়ে রিকশা যখন বড় রাস্তায় জ্যামে পড়ে অচল, আরিফ স্ত্রীর দিকে তাকায়। কথা বলে প্রথম, এর মধ্যে হাজার দেড়েক টাকা ধার হয়েছে আমার।
শান্ত স্বামীর মুখ থেকে চোখ সরিয়ে জবাব দেয়, বাইরে আমারও ধার-দেনা বাড়ছে। তারপর অবরুদ্ধ পথে দু’জন দুদিকে তাকিয়ে থাকে।
রবিবার ছুটির দিন – আফসার আমেদ (আফসার আহমেদ)
গত রাতে ঘুমোতে যাবার সময়ও নীলা ভাবেনি, আজ সারাদিন সে কি করবে। বাড়ি ফিরতে রাত নটা বেজে যায়। তখন তার পরের দিনের পরিকল্পনার কথা মাথায় আসেনি। পরিবারের আর সকলের দিকে চোখাচোখি, প্রশ্নোত্তরে, বিশ্রামের পরিতৃপ্তিতে তখন সে তখনকার মতো ছিল। এখন এই ছুটির দিনে রবিবারে, আর এক রকমভাবে আছে। বস্তির দুপুর যেমন থাকে, তেমনটাই ছিল তার চারপাশে। ধোঁয়া ধুলো-গরম-চিৎকার-চেঁচামেচি।
নোংরা-দুর্গন্ধ যেমন থাকার তেমনই ছিল। কিন্তু নীলা কীভাবে এই ছুটির দিনটা কাটাবে, তার হারে কাছে কিছুই ছিল না। ছুটির দিন বলেই বড়জোর সকাল সাতটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছিল। তারপর থেকে এই দুপুর আড়াইটে পর্যন্ত যাপনের সংকটের মধ্যে পড়েছে। নীলা। কীভাবে এই এখানে একা একা সারাটা দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা পার করবে? তারপরই পরিবারে আর সকলে ফিরে আসবে। ফিরলই যদি, তাহলেও নীলার সংকট কাটছে না। তারপর তো রান্নার আয়োজন, ঘষা-মাজা, জল তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। মাবাবা দাদা-বৌদি বড়দিরা। উনুন ধোঁয়া উগরোবে। নানা কিছু। যে সমস্ত নানাকিছুতে থাকতে ভাল লাগবে না নীলার। অন্য দিনগুলোতে তো থাকে! ছুটির দিরে সন্ধ্যায় তার এ ভাবে কাটানো খুবই অসহ্য মনে হবে।
এই দুপুরই কি সহনীয় তার কাছে? এইভাবে একা একা থাকা? এইভাবে ছুটির দিনটাকে শেষ করতে দেওয়া উচিত হবে না তার। শেষ করতে না দেওয়া, সেটা একটা অন্য জিনিস। এই মহার্ঘ দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যাকে সে না হয় আঁকড়ে ধরে যথার্থ খরচ করতে চাইবে। সেটা হবে তার যথার্থ যাপন। কিন্তু সেই যান খুঁজে না পেলে বিপদ হয় তার। নিমেষে দুপুর বিকেল-সন্ধ্যা উৎরে গেলে বাঁচত সে। তা তো হবার নয়! আর এমন দুটির দিনটা! সারা সপ্তাহের পর একদিন পায় সে। ভোলার সঙ্গ আশা করেছিল সে কাল থেকে। ভোলাকে পায়নি বস্তিতে তার মাসির ঘরে। হয়তো এসে যাবে, এই অপেক্ষায় আড়াইটে বাজিয়েছে নীলা।
সকাল নয়টায় সাবান ঘষে ঘষে স্নান করেছে। চুলে শ্যাম্পু লাগিয়েছে। মাথার ক্লিপ থেকে গার্ডার শৌখিনতার মৃদু আয়োজনে প্রস্তুত রেখেছিল। ভোলা এসে ঘরে দরজার সামনে টুকুতে ছোট ছোট টুল পেতে গল্প করবে, নয়তো প্ল্যাটফরমের বেঞ্চে গিয়ে বসবে, গল্প করবে। কিংবা ভোলা যদি কিছু একটা কাজে ব্যস্ত থাকল তার মাসির ঘরে, তা হলে সে মাসির ঘরের উঠোনে বসে ভোলার সঙ্গে কথার ফুলঝুরি ফোঁটাত। টুকরো টুকরো কাঠ জুড়ে নানা কিছু বানিয়ে দেয় ভোলা তার মাসির। টুল বানায়, সিঁড়ি বানায়, ঠাকুরের আসন বানায়। প্রায় দিনই দেখা যায় ভোলা মাসির ঘরে কিছু না কিছু কাজ করছে। একদিন ওখানে গিয়েই ভোলার সঙ্গে ভাব জমে নীলার। কয়েক পা পরেই ভোলার। মাসির ঘর। ভোলার মাসির রেডিওতে গান বাজছে তাদের ঘর থেকে শুনে গায়ক গায়িকার নাম বলা সম্ভব হয়—এমনই স্পষ্ট শোনা যায়। কত ছেলেই না এ বস্তিতে আছে। কিন্তু কেনই ভোলার সঙ্গে নীলার দেখা হয়, কথা হয়, সেটা একটা রহস্যই। হঠাৎ ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনার ভেত্র দিয়েই এই ঘনিষ্ঠতা। একবার ভো কাটা ঘুড়ি উড়ছিল মহল্লায়। ভোলার সঙ্গে একটা বাচ্চার দল হই-হই করে মহল্লার এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। হাতে কঞ্চি আর শুকনো ডালপালা। শেষে ঘুড়িটা সেদিনের শেষ বিকেলে নীলাদের বাড়ির চালে নেমে পড়ে। নীলা ও নীলার মা বাবা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। আর তাদের চোখের সামনেই চালের উপরে উঠে যায় ভোলা। নীলার বাবা রাগারাগি করতে এগিয়ে গিয়েছিল, নীলার মা তাকে থামিয়ে দেয়। চালাতে একটা ভাঙা টালি ছিল, তাতে টিনের ফালি খুঁজে দিল ভোলা। ভোলাকে বলতেই করে দিল। আর ভোলা নেমে আসতেই ঝর ঝর করে ভোলার সঙ্গে কথা বলতে লেগে গেল নীলা। কেমন নেকি নেকি, লোক দেখানো গালভরা আনন্দিত কথার আবেগ ঝরিয়ে কথা বলা। এবং ভালও লাগছিল কথা বলতে নীলার। সেই থেকে কথা বলা, ভাল লাগা নীলার, ভোলা নিয়ে। ভাল লাগা নিয়েই থেকেছে। প্রেম প্রেম খেলা খেলেনি সে। লোকে এখানে সেখানে। দেখছেও না তাদের। যেমন করে প্রেম করে ধ্বই। না তেমন প্রেম নয়, ভাল লাগা নিয়ে কথা বলে তারা, মেশে।
