পরের দিন ভোর হতে না-হতেই মেয়েকে নিয়ে আদরের আতিশয্য শুরু হয়ে যায়। যেন প্রায়শ্চিত্ত করছে হিমাংশু। সকাল-দুপুরটুকু কোনোরকমে কাটল, বিকেল থেকে বাপ-মেয়ে পাশাপাশি, ছায়ার ছায়ায় জোড়া। দোতলার খোলা বারান্দায় ফুলের টবে জল দিচ্ছে হিমাংশু, একদমে দুশো-আড়াইশো ক্রস স্কিপ করে পুতুল ঘন ঘন খাস টানছে, মুখ লালচে। তারপর মুখ-হাত ধুয়ে সেজেগুঁজে বেড়াতে বেরোয়। মেয়েকে নিয়ে হিমাংশু। ট্যাক্সি চড়, টফি কেন, গল্পের বই চাও ত তাই : রিবন, পেনসিল গ্রামোফোনের রেকর্ড— যা চাও।
এমনি এক প্রায়শ্চিত্তের দিনে সকাল থেকে যা শুরু হয়, যুথিকা তা মোটেই সহ্য করতে পারে না। মুখ ফুটে স্পষ্ট করে বলাও যাচ্ছে না কিছু। এক পিসতুতো বোন এসেছে ওর দিল্লী থেকে আজ সকালেই। বিকেল পর্যন্ত থাকবে; তারপর যাবে তার ভাইয়ের বাসায়। সেই বোন, শিপ্রা যার নাম দিল্লীর কোন এক মেয়ে কলেজের পড়ায়, এখনো কুমারী। যূথিকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রয়েছে শিপ্রা। ওর সংসারের খুঁটিনাটি দেখছে আর গল্প করছে দিল্লীর, আত্মীয়স্বজনের। আর বলতে কি, এরই ফাঁকে তার রোল্ডগোল্ডের চশমার ফাঁক দিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে বাপ আর মেয়েকে। যুথিকাও সেটা লক্ষ করছে। কিন্তু অবস্থাটা এমন, কিছুই বলা যায় না। সবচেয়ে বেশি রাগ হয় যুথিকার ক্যালেন্ডারের লাল তারিখের ওপর। এত ছুটি যে কেন থাকে অফিস আর স্কুলের, যুথিকা বুঝতে পারে না। না থাকত ছুটি আজ, মেয়ে নিয়ে অত ঘটাপটা করে আদিখ্যেতা করার অবসর জুটত না হিমাংশুর। ছি, ছি, শিপ্রাদি দেখছে ত! কি ভাবছে, কে জানে। নিশ্চয় ভালো কিছু নয়। আভাসে, যেন শিপ্রাদি বুঝতে না পারে, তেমন ইঙ্গিতে, হু কয়েকবার চেষ্টা করল যুথিকা হিমাংশুকে সরিয়ে নেবার—কিন্তু কেউ গায়ে মাখল না সে কথা। প্রকাশ্যে কিছু বলতেও সঙ্কোচ-হয়। কে জানে শিপ্রাদি যদি তেমন একটা খারাপ চোখে না নিয়েও থাকে, যুথিকার কথায় হয়ত অন্যরকম একটা ধারণা হবে। অগত্যা রুষ্ট হলেও ভয়ঙ্কর একটা অস্বস্তি চেপে রেখে যুথিকাকে সহজভাবেই সব দেখতে হয়, সহ্য করতে হয়! ওদিকে, ফঁকা উঠোনে শীতের রোদ্দুরে, বালতিতে ঠাণ্ডা গরম জল মিশিয়ে হিমাংশু তরল সাবানের ফেনা দিয়ে পুতুলের চুল ঘষে দেয়, পা-হাত রবারের স্পঞ্জ দিয়ে রগড়ে তেল উঠিয়ে ধবধবে করে, অলিভ অয়েল মাখায়।
বেলা গেল, দুপুরও। বিকেলের দিকে শিপ্রাদির ভাইপো গাড়ি নিয়ে হাজির। জোর তাগিদ তার। তাড়াতাড়ি চলে গেল শিদিও।
খানিক পরে দেখা যায়, বাপ-মেয়ের সাজগোজও শেষ হয়েছে। এবার তারা বেরুবেন। যুথিকা থমথমে মুখে সব দেখে যাচ্ছে, একটাও কথা বলেনি। বলবে না, এই তার প্রতিজ্ঞা বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত দেখবে এবং তারপর। আজ যেন সেও মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, ধূমায়িত হচ্ছে ভেতরে ভেতরে।
যাবার আগে হিমাংশু স্বভাবমতন কিছু টাকা চাইল। চাবিটাই দিয়ে দিল যুথিকা। তারপর কাপড় কাচতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। ফিরে এসে দেখে, হিমাংশুরা চলে গেছে। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে এরই মধ্যে। বেশ অন্ধকার।
একটু রাত করেই ফেরে হিমাংশুরা। পায়ের শব্দ শোনে ঘরে বসে যুথিকা। হাসিখুশি মুখ আর একটা অয়েলপেপারে মোড়া প্যাকেট হাতে ঘরে ঢোকে হিমাংশু একাই। চেয়ারে বসতে বসতে প্যাকেটটা যুথিকার দিকে এগিয়ে দেয়, “নাও, দেখ ত কেমন হল তোমারটা।”
হাত বাড়াবার আগ্রহ দেখা যায় না যুথিকার। নিস্পৃহভাবে ও বসে থাকে, নির্বিকার মুখে। ধৈর্য ধরতে পারে না হিমাংশু। অয়েলপেপারের আচ্ছাদন খুলে ফেলে পশমের জামাটা এবার এগিয়ে দেয়। যুথিকা দেখে অল্প একটু সময়, তারপর কেমন একটা অভ্যাসবশে হাত বাড়িয়ে জামাটা টেনে নেয়।
জামা দেখছে না মনে মনে কিছু ভাবছে যুথিকা, ঠাওর করা মুশকিল। হয়ত ভাবছে এবং ভাবনাটাই ওর আড়ষ্ট হাতকে অল্প একটু চঞ্চল করেছে, যার ফলে পাট খুলে গেছে পশমের জামার। নরুন-সরু হাসির ছোঁয়া যুথিকার ঠোঁটে ফুটি-ফুটি করছে। যেন। …এমন সময়টিতে দেখা গেল পুতুলকে, দরজার গোড়ায়, একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুথিকার। চোখাচোখি হল মা আর মেয়েতে। মার চোখ মেয়ের সর্বাঙ্গ লেহন করল। আর পরমুহূর্তেই যুথিকার সারা মুখ থমথমে হয়ে আসে, একটু রোদের আভাস ফুটতে-না-ফুটতেই আকাশ যেন আবার কালো মেঘে ছেয়ে যায়। থমথমে মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয় যুথিকা। ভুরুর ওপর আঁচড় কেটে অদ্ভুত একটা বিরক্তি চোখের পাতায় এসে জমছে। দৃষ্টিটা এখন তার দেওয়ালে; তীরের ফলার মত ছুঁচলো হিংস্র একটা টিকটিকির মুখের ওপর। হাতের আঙ্গুলগুলোও যে জ্বালা করছে, এতক্ষণে স্পষ্ট যেন অনুভব করতে পারে যুথিকা। তবে তাই হবে, মোলায়েম পশমে নয়, তুষের আগুনেই অজান্তে হাত রেখেছিল ও।
ছুঁড়েই দিয়েছে, নাকি হাতে থেকে খসে পড়েছে ঠিক বোঝা যায় না, দেখা গেল পশমের জামাটা যুথিকার পায়ের তলায় মেঝেতে পড়ে! এক পলক মার দিকে তাকিয়ে, এগিয়ে এল পুতুল, টুপ করে জামাটা কুড়িয়ে নিল। চোখেমুখে তার অনেক বিস্ময়, কিছু কারতা। কী হল মার? পছন্দ হয়নি? এমন আকাশ নীল রঙ জামাটার, গলার কাছে দু-সুতোয় ভোলা সাদা ফুল আর লতার কাজ, দামও প্রায় বাইশ, বাস্তবিক যা সুন্দর, খুবই পছন্দ হয়েছে ওদের—ওর আর ওর বাবার; তাই কিনা অপছন্দ মার? মনটা মুষড়ে পড়ে পুতুলের। লু চুপচাপ সে দাঁড়িয়ে থাকে, মোলায়েম পশম মুঠোয় ভরে, বোকার মতন, বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।
