অনেক পরে নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়ালেন। টেলিফোনটার কাছে গিয়ে রিসিভারটা তুলে নিলেন। প্যাট্রিকের দৌলতে পুলিশ স্টেশনের নম্বরটা তার জানা। ডায়াল করতেই সেদিককার সাড়া পাওয়া গেল, হ্যালো
‘এখখুনি আমার বাড়িতে আসুন, এখখুনি! আমার স্বামী,— মানে প্যাট্রিককে, কে বা কারা খুন করে গেছে।‘
‘কিন্তু তার আগে বলুন, আপনি কে? কোথা থেকে কথা বলছেন?’
‘আ-আমি, মানে মিসেস মেলনি।’
‘মিসেস প্যাট্রিক মেলনি?’
‘হ্যাঁ।‘
‘কি বলছেন আপনি! প্যাট্রিক খুন হয়েছে?’
‘আমার সেই রকম মনে হচ্ছে!’
‘সে কি! আচ্ছা ঠিক আছে—আমরা এখুনি যাচ্ছি।‘
কিছু পরেই পুলিশের জিপ এসে দাঁড়াল বাগানে। পায়ের আওয়াজ শোনা গেল সিঁড়িতে। মিসেস মেলনি দরজার মুখে গিয়ে দাঁড়াতেই দু’জন পুলিশ অফিসারের সামনে পড়লেন। স্বামীর সহকর্মী হিসেবে দু’জনেই পরিচিত। হলে হবে কি, কোনোরকম সম্ভাষণ জানানোর আগেই মাথাট বোঁও করে ঘুরে গেল। কিন্তু মেঝেতে আছড়ে পড়ার আগেই জ্যাক নূন্নান তাকে ধরে পেললেন। সন্তর্পণে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলেন একটা চেয়ারে। দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন মিঃ ও ম্যালে। তিনি ততক্ষণে প্যাট্রিককে পরীক্ষা করতে শুরু করেছে। একটু সুস্থির হবার পর মিসেস মেলনি জিজ্ঞেস করেন, ‘ও কি সত্যিই আর নেই?’
‘সেই রকমই মনে হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাটা কি?’
উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় মিসেস মেলনির অবস্থা খুব কাহিল। গলা দিয়ে স্বর বার হয় না। তবু সংক্ষেপে সব কথাই বললেন তিনি। চোখের জল ঝরে পড়ল দু’গাল বেয়ে।
সেই সময় আরো দু’চারজন ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁদের কেউ ডাক্তার, কেউ ফটোগ্রাফার, কেউ বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। প্যাট্রিককে কেন্দ্র করে যে যার কাজ শুরু করে দিলেন। গোয়েন্দাদের একজন আবার মিসেস মেলনির খুবই পরিচিত। নাম মিঃ ল্যাটের। ভদ্রলোক খুব নরম গলায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। বাধ্য হয়ে আবার মুখ খুলতে হলো মিসেস মেলনিকে। কাহিনী শেষ করতেই মিঃ ল্যাটের জিজ্ঞেস করলেন, কোন দোকানে গেছিলেন?
মিসেস মেলনি নাম বললেন দোকানটার।
হাত কয়েক দূরে গোয়েন্দাদের ক’জন সহকারী দাঁড়িয়েছিলেন। দোকানের নামটা কানে যেতেই তারা নিচু গলায় কি বলাবলি করলেন নিজেদের মধ্যে।
পরক্ষণেই একজনকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলেন মিসেস মেলনি।
মিনিট পনের পরে সে মানুষটিকে ফিরে আসতে দেখলেন মিসেস মেলনি। ঘরের সবকটি মানুষ তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালেন। নিচু গলায় তিনি তাঁর রিপোর্ট পেশ করলেন। কান পাতলেন মহিলা।
‘ন্-না, দোকানদার ওনাকে বেশ হাসিখুশিই দেখেছেন…. রীতিমত স্বাভাবিক। …আলু আর মটর কড়াই নিয়েছেন।…. না, আন্তরিকতার কোনো অভাব চোখে পড়েনি। আমার মনে হয়, এ কাজ ওনার পক্ষে অসম্ভব।‘
কিছু পরে ডাক্তার আর বিশেষজ্ঞর দল বার হয়ে গেলেন ঘর থেকে। স্ট্রেচার হাতে এসে হাজির হলো দু’জন,—প্যাট্রিকের দেহটা নিয়ে চলে গেল তারা। দু’জন সিপাহি আর দু’জন গোয়েন্দা শুধু রয়ে গেলেন ঘরের ভেতর। গোয়েন্দা দু’জন খুবই ভাল। মিসেস মেলনির মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে, তারা মহিলাকে তাঁর বড় বোনের বাড়ি পৌঁছে দেবার প্রস্তাব করলেন। সেখানে যাবার ইচ্ছা না হলে, তারা মহিলাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রাখতে পারেন। সেখানে তাদের স্ত্রী আছেন, দেখাশোনার কোনো ত্রুটি হবে না।
সব ব্যাপারেই নিজের অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন মিসেস মেলনি। না, এই মুহূর্তে এ বাড়ি ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে রাজি নন।
তাহলে এক কাজ করুন, এভাবে বসে না থেকে একটু বরং শুয়ে পড়ুন।
জ্যাক নুন্নানের প্রস্তাবে মাথা নাড়লেন মিসেস মেলনি, না, এই বেশ আছি। শরীরটা সামলে গেলে উঠে পড়ব।
বাধ্য হয়ে গোয়েন্দারা তাকে একলা রেখেই নিজেদের কাজে লেগে পড়লেন। তাদের চলাফেরা বা কথাবার্তার ধরন দেখে মিসেস মেলনির মনে হলো, তারা কিছু একটা খুঁজছেন!
কিছু না পেয়ে এক সময় দাঁড়িয়ে পড়লেন মিঃ ল্যাটের। জ্যাক মুন্নানের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ধারণা, আততায়ী পিছন দিকে থেকে প্যাট্রিককে আঘাত করেছে। লোহার রড বা ওই রকমই কোনো ভেঁতা কিছু দিয়ে কাজটা সারা হয়েছে। কিন্তু ঘরের ভেত্র সেরকম কিছু যখন দেখছি না, তখন বুঝতে হবে খুনী সেটা সঙ্গে করেই নিয়ে গেছে। যদিও অমন একটা জিনিস হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া অসম্ভব। অতএব, খুনী যে সেটা বাড়িরই কোথাও না কোথাও ফেলে গেছে, তাতে আমি নিঃসন্দেহ।
‘আমিও তাই মনে করি।’ মিঃ নুন্নান বললেন, শুধু তাই নয়, খুব ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে যে কাজটা করা হয়েছে তা নয়। হঠাৎ ঝোকের বশে এ কাজটা হয়ে গেছে। যাই হোক, অস্ত্রটার সন্ধান পেলেই খুনীকে হাতেনাতে ধরে ফেলা সম্ভব হবে।
মিসেস মেলনি আগের মতোই চেয়ারে বসে। একেবারে চুপচাপ। সহকারী গোয়েন্দারা যে বাড়ির বাকি ঘরগুলোয় তল্লাশি করছে, সেটা তিনি বুঝতেই পারছেন। অবিরাম খুটখাট চেয়ার টেবিল নাড়াচাড়া করার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। অনেক পরে মিঃ ল্যাটের ঘরে এসে মিসেস মেলনির চেয়ারের পাশে ধপ করে বসে পড়লেন।
‘নাঃ, কিছুই চোখে পড়ল না।’
এ কথার কি জবাব দেবেন মিসেস মেলনি! চুপ। মিঃ ল্যাটের জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোহার রড বা ওই ধরনের কিছু ছিল বাড়িতে? একটু ভেবে দেখুন তো!’
