অসম্ভব হলেও, ঘটনাটা সত্যি। কিন্তু এ কাজের পরিণাম কি? রীতিমত চিন্তিত হয়ে পড়লেন মিসেস মেলনি। পুলিসের এক জাঁদরেল গোয়েন্দা অফিসারের স্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ ভালই জানেন, এ অপরাধের শাস্তি কি। কিন্তু এ মুহূর্তে সে ভয়টাকে খুব বড় বলে মনে হয় না। প্যাট্রিককে ছেড়ে বেঁচে থাকার চাইতে, সে শাস্তি অনেক ভাল। ভানা হলো আর একজনকে নিয়ে। যে সন্তান আলোর অপেক্ষায় দিন। গুনছে, চিন্তাটা তাকে নিয়ে। আচ্ছা, আইন কি বলে? দুজনের প্রাণদণ্ড কি একসঙ্গেই দেবে? নাকি সামনের বাকি দিন ক’টা তাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে?
আইনকানুনের কিছুই জানেন না তিনি। অতএব কাল জোব্বার মালিকদের হাতে নিজের স্বকিছু ছেড়ে দিতে তিনি রাজি নন। যে ভাবেই হোক, অভিযোগ এড়িয়ে যেতে হবে, না হলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন তিনি।
ভেড়ার ঠ্যাংটা নিয়ে কিচেনে ফিরলেন মিসেস মেলনি। গ্যাস ওভেনের পাল্লাটা খুলে গোটা ঠ্যাংটাই সেটার ভেতর রেখে আগুনটা জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর ভাল করে হাত-মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে গেলেন। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখলেন মিসেস মেলনি। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘামে মুখের প্রসাধন প্রায় ধুয়ে গেছে। দ্রুত হাতে পাউডার পাফ বুলিয়ে সেটুকু সামলে নিলেন। তিনি। লিপস্টিকটা ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিয়ে হাসবার চেষ্টা করলেন তিনি। হাসি হলো, কিন্তু সে হাসি পছন্দ হলো না তার। বারবার একটানা চেষ্টা করার পর কিছুটা স্বাভাবিক হাসি হাসতে পারলেন। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বললেন ‘হ্যাল্লো!
পরমুহূর্তে মনে হলো গলার স্বরটা বড় বেসুরো। বারকয়েক গলা ঝেড়ে নিয়ে তাকালেন আয়নার দিকে। বললেন, ‘হ্যাল্লো স্যাম, আমায় কিছু ভাল আলু দিতে পারো? আর হ্যাঁ, কিছু মটর কড়াই?’
তারপরই কেমন যেন মনে হলো তাঁর। বলার ধরনটা খুব একটা স্বাভাবিক হয়নি। অতএব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মহড়া দিতে লাগলেন। অনেক পরে নিজেকে স্বাভাবিক মনে হতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন মিসেস মেলনি। সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে পিছনের দরজা দিয়ে একেবারে গ্যারেজে। নিজের গাড়িতে বসে স্টার্ট নিলেন সজোরে।
দুটো বাজতে তখন কিছু বাকি। যে দোকান থেকে বারবার বাড়ির জিনিসপত্তর কেনা হয়, সেটার সামনে গিয়ে ব্রেক করলেন, ‘হ্যাল্লো স্যাম—’
কাউন্টারের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানদারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘মিসেস মেলনি, আপনি! গুড ইভনিং, কেমন আছেন?’
‘ভাল ভাল, বেশ ভাল। তোমার খবর কি?’
‘ওই একরকম।‘
‘দেখো স্যাম, আমায় কিছু ভাল আলু দিতে পার?—আর হ্যাঁ, ভাল মটরদানা আছে? থাকে তো তা-ও এক প্যাকেট দাও।
দোকানদার তাক থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে কাউন্টারের ওপর রাখলেন।
‘বৃহস্পতিবার হলে আমরা সাধারণত হোটেলে খাই। ঘরে আর বাঁধি না। কিন্তু প্যাট্রিক আজ এত ক্লান্ত যে, বাইরে যেতে চাইল না। বলল, বাড়িতেই যা তোক কিছু রাঁধো। এদিকে সবজি কিছুই নেই বাড়িতে।‘
‘আলু মটরের সমস্যা না হয় মিটল, কিন্তু মাংসের কি করবেন?’
‘ওটা আছে। একটা আস্ত ভেঁড়ার ঠ্যাং ডিপ ফ্রিজ থেকে বার করেছি।‘
‘তাহলে আর কি?’
‘যদিও ফ্রিজের মাংস আমার তেমন ভাল লাগে না। কেমন যেন শুকনো মতন। তুমি কি মনে করো, খুব বাজে একটা কিছু হবে?’
‘তফাত তেমন কিছু হয় না। কিন্তু তারপর?’
‘তারপর বলতে?’
‘শেষ পাতে কি দেবেন তাঁকে?’
‘সেটা তো ভাবিনি। তুমি কি দিতে বলো?’
‘আমি বলি পুডিং। আমি জানি, ও জিনিসটা মিঃ প্যাট্রিকের খুব পছন্দ।‘
‘বলছ? তাহলে তাই-ই দাও।’
গাড়িতে বসে আবার স্টার্ট নিলেন মিসেস মেলনি। ভাবলেন, এবার আরো সাবধান হতে হবে। চোখে-মুখে এমন ভাব বজায় রাখতে হবে যাতে কেউ কোনো সন্দেহ করতে না পারে। এমনভাবে বাড়ি ফিরতে হবে, যেন সেখানকার অবস্থা তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন সেই বাজে দৃশ্যটা দেখবেন, একমাত্র তখনি তিনি ভেঙে পড়তে পারেন। তাহলে উপস্থিত তার ভূমিকা কি? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন মিসেস মেলনি। জবাবটাও নিজেই দিলেন। তিনি হলেন মিসেস প্যাট্রিক মেলনি। পুলিশের এক জাঁদরেল গোয়েন্দা অফিসারের স্ত্রী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দোকান থেকে ফিরছেন তিনি। উদ্দেশ্য, ক্লান্ত স্বামীকে যত শীগগির সম্ভব কিছু বেঁধে খেতে দেয়া। হ্যাঁ, মনের এই ভাবটাই নিখুতভাবে বজায় রাখতে হবে সব দিক থেকে। না হলেই বিপদ।
তাই-ই করলেন মিসেস মেলনি। পিছনের দরজা দিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ঢুকলেন তিনি। প্রথমেই গেলেনে কিচেনে। সেখান থেকে গলা চড়িয়ে বললেন, ‘প্যাট্রিক, আমি এই ফিরলাম। তোমার খবর কি? একা একা খুব খারাপ লাগছে তো?’
স্বাভাবিকভাবেই কোনো জবাব এল না প্যাট্রিকের তরফ থেকে। আনা জিনিসগুলো টেবিলের ওপর রেখে বসার ঘরে ঢুকলেন মিসেস মেলনি। সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেলেন প্যাট্রিককে। দু’পা মুড়ে একটা হাতের ওপর দেহের সব ভার দিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। মিসেস মেলনির মনটা আপনা হতেই হুহু করে উঠল।
অভিনয়ের আর প্রয়োজন হলো না। ব্রিাহিত জীবনের নানা স্মৃতি মনে ভিড় করে। আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল চোখ দিয়ে। ছুটে গিয়ে বসে পড়লেন স্বামীর পাশে।
