মাথা নাড়লেন মিসেস মেলনি, ‘উঁহু, ঘরের ভেতর তেমন কিছু ছিল না। তবে—’
‘তবে?’
‘গ্যারেজে অমন অনেক কিছুই রাখা আছে। আপনারা সে জায়গাটা দেখেছেন?’
সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়লেন মিঃ ল্যাটের। দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
গ্যারেজঘর তন্নতন্ন করে দেখা হলো, বাগানটাও বাদ গেল না। মিসেস মেলনি চেয়ারটায় অনড় হয়ে বসে থাকলেও সবকিছু আন্দাজ করতে পারেন। অস্ত্রটা খুঁজে বার করতে ত্রুটি করছে না কেউ। বাগানটা চষে ফেলছে বলতে গেলে। জানলার পর্দার ওপাশে চমকে চমকে উঠছে টর্চের আলো।
একসময় ঢং ঢং করে ন’টার ঘণ্টা বাজল ওয়াল-ক্লকটায়।
আরো কিছু পরে মিঃ নুন্নান ঘরে ঢুকলেন, সঙ্গে জনা দুই অফিসার। সকলের মুখ চিন্তিত। সকলেই খুব গম্ভীর। মিসেস মেলনি বুঝলেন, সকলেই হতাশ হয়েছে। করুণা হলো মিসেস মেলনির। নরম গলায় বললেন, জ্যাক, একটা অনুরোধ করব, রাখবেন?
ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মিঃ নুন্নান। সপ্রতিভভাবে বলেলন, ‘নিশ্চয়! কি অনুরোধ বলুন?’
আইনগত কোনো বাধা না থাকলে আমায় একটু পানীয় দিতে পারেন? গলাটা বড় শুকিয়ে গেছে।‘
‘এ আর এমন কি ব্যাপার, আমি এখনি দিচ্ছি।‘
এ বাড়ির কোথায় কি থাকে, তা অজানা নয় মিঃ নূন্নানের। প্যাট্রিকের সঙ্গে এসে দিনের পর দিন ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে গেছেন এ বাড়িতে। বলেন, ‘কি দেব, হুইস্কি?’
‘তাই-ই দিন, তবে খুব সামান্য।‘
মিঃ নুন্নান কাবার্ড খুলে গ্লাসে পানীয় ঢাললেন। পরে ফিরে এসে গ্লাসটা মিসেস মেলনির হাতে দিতেই, তিনি বললেন, আপনি নিলেন না? সেই সন্ধ্যে থেকে একটানা ধকল যাচ্ছে,–আপনিও তোত ক্লান্ত।
‘বেশ, বলছে যখন নিচ্ছি,–তবে সামান্য নেব। শুধুমাত্র নিজেকে খাড়া রাখার জন্যে যতটা দরকার, ততটুকুই।‘
‘তাই-ই নিন।‘
এই সময় আরো অনেকেই এসে হাজির হলেন ঘরে। মিসেস মেলনির অনুরোধে তারাও একটা করে গ্লাস নিলেন। দৃশ্যের বদল হলো। দেখা গেল সকলের হাতেই গ্লাস। সকলেই ঘিরে আছে মিসেস মেলনিকে। নানাভাবে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছেন সকলে।
মিঃ নুন্নান কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিলেন, খেয়াল করেননি মহিলা। তিনি আবার ঘরে ঢুকলেন। বললেন, মিসেস মেলনি, কিচেনে ঢুকে দেখি, উনুনটা এখনো জ্বলছে বোধহয় মাংস বসিয়েছিলেন, তাই না? বেশ ভুরভুরে গন্ধ বেরিয়েছে।
‘হ্যাঁ, তাই তো। ইস্, ওটার কথা একেবারে খেয়াল নেই।‘
‘যদি বলেন তো, উনুনটা নিভিয়ে দিই?’
‘তাহলে তো ভালই হয়! সত্যি, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব—’
বেরিয়ে গেলেন মিঃ নুন্নান। কিছু পরে কিচেন থেকে ফিরে আসতেই মিসেস মেলনি বললেন, ‘জ্যাক, এতেই যখন করলেন, তখন আর একটা অনুরোধ করব? রাখবেন?’
‘যদি সম্ভব হয়, নিশ্চয় রাখব।‘
‘বেশ।’ বলে একটু থামলেন মিসেস মেলনি। সমবেত সকলের মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আপনারা সকলেই আমার স্বামীর বিশেষ বন্ধু। প্যাট্রিকের হত্যাকারীকে খুঁজে বার করতে সেই সন্ধে থেকে যা করছেন, তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কথা হচ্ছে, সবকিছুই একটা সীমা আছে। আপনারা ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। এই সময় আমার যা কর্তব্য তা যদি না করি, তো প্যাট্রিকের আত্মা শান্তি পাবে না। তাই বলি, উনুনে রোস্ট তো একরকম তৈরিই,—এখন সকলে মিলে যদি সেটার সদ্ব্যবহার করেন—’
‘কি বলছেন আপনি?’ বিস্মিত নুন্নান।
‘প্লিজ, একটু ভেবে দেখুন,—ও জিনিসটার কি হবে? ফেলা যাবে? আমার পক্ষে ও জিনিস মুখে ভোলা অসম্ভব। কিন্তু আপনারা তাঁর বন্ধু–তার জন্যে যে জিনিস তৈরি হয়েছে, সে জিনিস খেতে আপনাদের আপত্তি কিসের? দয়া করে খান, বিশ্রাম করুন, তারপর আবার কাজ শুরু করুন।‘
সকলেরই খিদে পেয়েছিল। একটা দোটানার ভাব দেখা গেল সবার মধ্যে। মিসেস মেলনি বললেন, ‘এত সংকোচের কি আছে? এ বাড়িতে আপনারা কেউ নতুন নন। নিন শুরু করুন তো।‘
এর ওপর আর কথা চলে না। জ্যাক মুন্নান সকলকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলেন। মিঃ ল্যাটের কিচেন থেকে রোস্টের খণ্ডটা নিয়ে এসে রাখলেন সবার সামনে। মিসেস মেলনি আর উঠলেন না। আগের মতোই চেয়ারে বসে স্বামীর সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারা তখন গোগ্রাসে খেতে শুরু করেছেন ভেটর ঠ্যাংটা।
চার্লি, তোমায় আর একটু মাংস দিই?’ জ্যাকের অনুরোধ।
‘উঁহু, সবাই মিলে সবটা উড়িয়ে দেয়া ঠিক নয়।‘
‘এটা একটা কথা হলো? শুনলে তো,ভদ্রমহিলা সেটাই চান।‘
‘তাহলে দাও আর একটু।’
তাদের দিকে অপলকে তাকিয়ে কান পেতে বসে থাকেন মিসেস মেলনি। একজন বললেন, ‘যাই বলো, আমার মনে হয়, অস্ত্রটা বেশ ভারি ছিল। ডাক্তার বলছিলেন, মাথার খুলিটা একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।‘
অতএব অস্ত্রটা যে বেশ ভারি ছিল, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। আর অমন ভারি জিনিস কি লুকিয়ে রাখা সম্ভব?
‘মোটেই নয়।‘
আর একজন ঢেঁকুর তুলে বললেন, আমার ধারণা, জিনিসটা এ বাড়িরই কোথাও না কোথাও আছে।
বিচিত্র কিছু নয়। হয়ত দেখবে, নাকের ডগাতেই পড়ে আছে। আর সেই কারণেই চোখে পড়ছে না। তুমি কি বলো? জ্যাক?
তাঁদের কোনো কথাই অস্পষ্ট নয় মিসেস মেলনির কাছে। পাশের ঘরে বসে বসে শোনেন আর ফিকফিক করে হাসেন মহিলা।
——–
রোয়াল্ড ডাল-এর ‘ল্যাম্ব টু দি স্লটার’ অবলম্বনে।
মেঘাবৃত চাঁদ – আবু রুশদ
মালেকা যতই খুশি হবার ভান করুক, এটা সে অনেকদিন থেকেই বুঝেছে যে সে অসুখি। অথচ অসুখি হওয়ার কোন কারণ নেই। রউফ খুব সুশ্রী না হতে পারে, কিন্তু তা নিয়ে মালেকার মনে কদাপি আফসোস্ জাগেনি। হতে পারে, রউফের বুদ্ধি খুব প্রখর নয়—সেটা কিছু না। আর তাদের আর্থিক অবস্থাও এখন এত খারাপ হয়ে পড়েনি যাতে সে সম্বন্ধে তাদের মন খুব শঙ্কিত হয়ে উঠতে পারে। না, সে-সব কিছু নয়। রউফ যথার্থই অত্যন্ত ভদ্র ছেলে ও তাদের আর্থিক অবস্থা রীতিমত সচ্ছল। তবুও……।
