মহিলা ভেবেছিলেন, এবার ভদ্রলোক বুঝি হাসবেন। কিংবা নড়েচড়ে বসবেন। কিন্তু তার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। রীতিমত অবাক হলেন মিসেস মেলনি। বলেন, কিন্তু খালি পেটে অমন কড়া জিনিস খাওয়া ঠিক নয়। যা পাই, তাই-ই এনে দিচ্ছি কিচেন থেকে।
না না, তার দরকার নেই।
এবার স্থিরচোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন মিসেস মেলনি। মনে হলো, একটু যেন অন্যমনস্ক। বললেন, ‘আজ তোমার কি হয়েছে জানিনা। তবে যাইই হোক, খিদে চেপে রাখার কোনো কারণ দেখি না। দু-তিন রকমের মাংস আছে ডিপ-ফ্রিজে।
যেটা বলবে সেটাই বেঁধে দিতে পারি।
বলেছি তো, ওসবের কোনো দরকার নেই।
বাজে কথা বলো না। সমস্ত দিন খেটেখুটে এসে না খেয়ে থাকবে নাকি? যেমনি হোক, আমি ঠিকই রাঁধব, তারপর খাওয়া না খাওয়া তোমার ব্যাপার।
হাতের বোনাটা টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা।
‘অত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। অন্তত আরো মিনিট কয়েক বসো।‘
মিসেস মেলনির মনে হলো, স্বামীর গলাটা কেমন যেন গম্ভীর। বুকটা দুরদুর করে উঠল তাঁর।
‘কি হলো, বসো।‘
ভদ্রলোকের কথায় চেয়ারে বসে পড়লেন মিসেস মেলনি। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল বিস্ময়ে। গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে ভদ্রলোক বললেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে তোমার সঙ্গে।
‘কি এমন কথা, যার জন্যে—’
বলছি।
কিন্তু বুও কোনো কথা না বলে, মাথা নিচু করে বসে রইলেন ভদ্রলোক। বোধহয় বক্তব্যটা মনে মনে গুছিয়ে নেবার জন্যেই। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় মাথার চুলগুলোকচক করছে। চোখ থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত অন্ধকার। বেশ কয়েক সেকেন্ড পর মেলনি দেখলেন, ওনার ঠোঁট দুটো যেন নড়ছে।
আমার কথায় যে দুঃখ পাবে, তা আমি জানি। কিন্তু না বলে আমার উপায় নেই—আমায় বলতেই হবে। আশা করব, কোনোরকম ভুল বুঝবে না।
এই সামান্য ভূমিকার পর তিনি মুখ খুললেন। একটানা অনেকক্ষণ যে কথা বললেন, এমন নয়। মাত্র চার-পাঁচ মিনিট। তাই শুনে মিসেস মেলরি শরীরটা কেঁপে উঠল বারবার। একদৃষ্টে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথাটায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। মানসচক্ষে দেখলেন, রেসের ঘোড়ার মতো স্বামী তার ক্রমশই দুরে সরে যাচ্ছেন।
সবশেষে ভদ্রলোক বললেন, এই হলো ব্যাপার। যদিও আমি স্বীকার করি, এসব কথা এখন না বলে, আরো মাস চারেক পরে বললেই ভাল হতো। কিন্তু অতদিন সবুর করার ধৈর্য নেই আমার। যে চাকরি করি, তাতে ব্যক্তিগত মানসম্মানের একটা মস্ত ভূমিকা আছে। কোনো কারণেই সেটাকে বিসর্জন দেয়া যায় না। তবে হ্যাঁ, টাকাকড়ির ব্যাপারে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমি কথা দিচ্ছি, সেটা যুগিয়ে যাব। শুধু তাই নয়, পরে বাচ্চা নিয়ে যাতে অসুবিধেয় না পড়ে, সেদিকেও লক্ষ্য রাব্ব।
কথাগুলো কানে গেলেও, সত্যি বলে মনেই হয়নি মিসেস মেলনির। ভেবেছিলেন, স্বামী বুঝি তার সঙ্গে রসিকতা করছেন, কিন্তু কথাগুলো শেষ হবার পর সে সন্দেহ আর রইল না। ভেতরে ভেতরে মনটা কঠোর হয়ে উঠল। বু, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখিয়ে বললেন, ‘আমি উঠছি, রান্না করতে হবে।‘
এবার সত্যি সত্যিই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। স্বামী ভদ্রলোকও আর তাকে বসতে বললেন না।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। হলে হবে কি, শরীরটা আর নিজের বশে নেই। চোখ-মুখ দিয়ে আগুন ছুটছে। পা দুটো যেন আর মাটিতে নেই। সামনের দালানটা পেরিয়ে ঝড়ের মতো কিচেনে গিয়ে ঢুকলেন। ঘরটা অন্ধকার। এক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে সুইচটা মেরে দিলেন। আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ডিপ ফ্রিজটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটানে ডালাটা খুলেই ভেতরে হাত বাড়ালেন। মুঠির ভেত্র যেটা পড়ল সেটাকেই টেনে বার করলেন বাইরে। দেখলেন, ব্রাউন পেপার জড়ানো লম্বা মন কি যেন একটা। ফরফর করে মোড়কটা ছিঁড়ে ফেলতেই, আলোয় কচক করে উঠল ভেতরের জিনিসটা। সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দুটি ছোট হয়ে এল মিসেস মেলনির।
জিনিসটা আর কিছুই নয়, একটা আস্ত ভেড়ার ঠ্যাং। কদিন আগে কিনে আনা হয়েছিল মিটশপ থেকে। ডিপ-ফ্রিজে পড়ে থাকার ফলে শুকিয়ে শক্ত লোহার মতো হয়ে গেছে।
এতেই হবে। এটা দিয়েই সারতে হবে কাজটা। মনে মনে বললেন মহিলা। ঠ্যাংটার নিচের দিকটা বেশ সরু। সেই জায়গাটাই দু হাতে ধরে বসার ঘরে দরজায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। দেখলেন, ভদ্রলোক আর চেয়ারে নেই। জানলার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনছেন।
যতই পা টিপে টিপে ঢুকুন না কেন, তিনি যে ঘরে ঢুকেছেন ভদ্রলোক টের পেলেন। কিন্তু পিছু না ফিরে আগের মতোই তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে। বললেন, ‘আর যাই করো, আমার জন্যে যেন রান্না করো না। ও কাজটা আমি বাইরেই সেরে আসব।’
মিসেস মেলনি ততক্ষণে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। দু হাতে চেপে ধরা জানোয়ারের ঠ্যাংটা ওপরে তুলেই সজোরে বসিয়ে দিলেন স্বামীর মাথায়। ঢপ করে একটা আওয়াজ হলো। পরে পরেই দু’পা পিছিয়ে গেলেন তিনি। অবস্থাটা কি হয় দেখার জন্যে। বেশি নয়, চার-পাঁচ সেকেন্ড দাঁড়াবার পর দেখলেন, ভদ্রলোক লুটিয়ে পড়লেন মেঝেতে। পাশে, একটা টেবিল ছিল, ধাক্কা খেয়ে সেটা ছিটকে গেল দূরে।
এবার মেজাজটা একটু শান্ত হলো মিসেস মেলনির। মাটিতে পড়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকিয়ে কাজটার গুরুত্ব টের পেলেন তিনি। ধীরপায়ে বার হয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিড়বিড় করে বললেন, ব্যাপারটা কি দাঁড়াল? দাঁড়াল, আমি আমার স্বামীকে নিজের হাতে খুন করলাম।
