সারা ঘর চুপ। প্রত্যেকের হাতেই সাদা কাগজ কলম। একটা অক্ষরও লেখা হয়নি। হাঁ করে বাই শুনছিলেন মালাবৌদির কথা। মালাবৌদি চুপ। নীলুদার মুখে সামান্য হাসির রেখা। ও.সি. সাহেব একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। তারপর বলে ওঠেন— হাও স্ট্রেঞ্জ। নীলুবাবু দেখছি নিপাট একজন ভদ্রলোক। নীলুদার মা চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমরা দৌড়ে গিয়ে তাঁর হাত থেকে কেটলি কাপ আর ডিশের বিস্কুটগুলো বিতরণ করতে শুরু করি। মালাবৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন।
আমাদের খুব খারাপ লাগল। রিপোর্টার ভদ্রলোকেরা নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে বলতে থাকেন–“আজব ধরনের ভদ্রমহিলা। এইরকম বাবা-মা কলকাতায় আছে? খুঁজে বার করতে হবে।”
নীলুদার প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের আরও বেড়ে গেল। বুঝলাম কাগজে যে ধ্ব দাম্পত্য কলহতে বধূর মৃত্যু বেরোয় সেগুলো সবই সত্য নয়। সবই যে স্বামীদের দোষে হয় তা কিন্তু নয়। চা-বিস্কুটের পালা শেষে ও.সি. এবং রিপোর্টাররা একযোগে বলে উঠলেন। “উই আর ভেরি ভেরি সরি, নীলুবাবু আমরা রংলি ইনফর্মড হয়েছি। তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। উই রিয়ালাইড দ্যাট ইউ আর ভেরি গ্রেট, অ্যান্ড অনেষ্ট। আমরা এলাম, বুঝলাম আর আপনার মত একটা সত্যিকারের মানুষ পেলাম।”
মিসেস মেলনির গল্প – সুকুমার ভট্টাচার্য
বেশ সুন্দর সাজানো-গোছানো ঘর। জানলা দরজার সব পর্দাগুলোই নামানো। ঘরের মাঝ বরাবর ছোট দুটো টেবিল চেয়ার। দুটোর ওপরেই একটা করে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। তারই একটাতে বসে মিসেস মেলনি ঘন ঘন ঘড়ি দেখছেন। সময় হয়েছে, এবার তার স্বামী ফিরবেন অফিস থেকে।
একটা স্মিত হাসি ছড়িয়ে আছে তার সারা মুখে। তিনি জানেন, ঘড়ির কাঁটা যত এগোবে, সে মানুষটির ফেরা ততই আসন্ন হবে। মাথা নিচু করে বোনার কাজটা করে যান তিনি। একটা ছোট মোজা বুনছেন। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চকচক করছে কপালটা, লাবণ্য উছলে পড়ছে মুখের ওপর। মা হতে চলেছেন তিনি, আর মাত্র মাস চারেক বাকি। আসন্ন মাতৃত্বের কমনীয়তায় সমস্ত মুখটি কোমল।
ঘড়িতে তখনো পাঁচটা বাজতে দশ মিনিট বাকি, বাইরের বাগানে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। তারপরেই গাড়িটার দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ শুনতে পেলেন মিসেস মেলনি। বুঝলেন, স্বামী তার ফিরেছেন। যত যাই হোক, বাড়ি ফিরতে এক মিনিটেরও হেরফের হয় না ভদ্রলোকের। আর একটু পরে বাইরের দিক থেকে দরজার চাবি ঘোরানো হলো, হাতের বোনাটা টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। সমস্ত দিনের অদর্শনের পর একটু সোহাগ না পেলেই নয়। ভদ্রলোক ঘরের ভেতর পা দিতেই তিনি বললেন, ‘হ্যাল্লো ডার্লিং!’
ভদ্রলোক ছোট করে জবাব দিলেন, ‘হ্যাল্লো!’
মিসেস মেলনি এগিয়ে গিয়ে স্বামীর গা থেকে কোটটা নামিয়ে নিলেন। সেটাকে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে দিয়ে, গিয়ে দাঁড়ালেন কাবার্ডটার সামনে। সেটা খুলে কিছুটা পানীয় ঢাললেন দুটো গ্লাসে। তারপর ফিরে এসে গ্লাস দুটো টেবিলের ওপর রেখে বসলেন মুখোমুখি।
মিসেস মেলনি জানেন, স্বামী তার এ সময় মোটেই কথা বলেন না। পুরোপুরি একটা গ্লাস পেটে যাবার পর শুরু হবে যত কথা। অতএব তিনিও কথা না বলে শরীরটাকে এলিয়ে দেন চেয়ারে। আধবোনা মোজাটা তুলে নিয়ে বুনতে শুরু করেন।
কিন্তু ভদ্রলোকের মেজাজ যে আজ অন্য রকম, সেটা আর খেয়াল করেননি তিনি। গ্লাসটা হাতে ধরে চুপ করে বসে থাকেন ভদ্রলোক। হঠাৎ তার ওপর চোখ পড়তেই মিসেস মেলনি জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার, এমন চুপচাপ বসে যে? খুবই কি ঝক্কি গেছে অফিসে, ক্লান্ত?
বিরক্তির সঙ্গে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক, হ্যাঁ, খুবই ক্লান্ত!
তারপর কখনো যা করেন না, হঠাৎ তা-ই করে বসলেন ভদ্রলোক। পায়ের। কাছে একটা নোংরা ফেলার বাক্স ছিল, পানীয়টা ধীরে ধীরে ফেলে দিলেন সেটার ভেতর। শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালেন মিসেস মেলনি, কি হলো, কিছু নোংরা পড়েছিল নাকি? ঠিক আছে, আমি আর এক গ্লাস এনে দিচ্ছি।
তার দরকার নেই, তুমি বসো।
ভদ্রলোক নিজেই গিয়ে হাজির হলেন কাবার্ডটার সামনে। যখন ফিরলেন, মিসেস মেলনি দেখলেন, গ্লাসটা আর শুন্য নয়। আগের থেকেও কড়া পানীয় সেটার ভেতর টলটল করছে। হঠাৎ চোখ পড়ল ভদ্রলোকের খালি পা দুটোর ওপর। বললেন, দাঁড়াও, তোমার চটিজোড়াটা এনে দিই!
ন্-না, তার দরকার নেই। তুমি বসো।
এরপর আর কিছু করার নেই মিসেস মেলনির। বসে পড়লেন চেয়ারে। কোনো কথাই বার হলো না মুখ দিয়ে। ভদ্রলোকও কোনো কথা না বলে একটার পর একটা চুমুক দিতে লাগলেন গ্লাসে। বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল সারা মুখে। মিসেস মেলনি জানেন ওটা কড়া পানীয়র জের ছাড়া আর কিছুই নয়।
যাই বলল, এতটা ক্লান্ত হওয়া উচিত নয় তোমার। পুলিশের সিনিয়র গোয়েন্দা হিসেবে ঝামেলা ঝঞ্জাট তো থাকবেই। দরকার পড়লে সারাদিন ছুটতে হতে পারে।
এ কথারও কোনো জবাব দিলেন না ভদ্রলোক। বাধ্য হয়ে মিসেস মেলনি টেনে নিলেন হাতের বোনাটা। হঠাৎ এক সময় মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু খাবে,
এনে দেব? যেহেতু আজ বৃহস্পতিবার তাই কিছু রাঁধিনি।
‘উঁহু, খিদে নেই।
না কেন! সমস্ত দিনের পর ক্লান্তি তো স্বাভাবিক। বরং এক কাজ করা যাক, আজ আর হোটেলে গিয়ে কাজ নেই। বাড়িতে সবকিছুই আছে, রাতও এমন কিছু হয়নি—যদি বলো তো রান্নার ব্যবস্থা করি।
