হাঁটতে হাঁটতে আরিফ যখন পুরনো রেসকোর্সের কাছে এলো, হঠাৎ ঝমঝম বৃষ্টি। অনেকক্ষণ ধরে আকাশ কালো হয়ে আসছিলো, ও খেয়াল করে নি। আর্ট কলেজের একপাল ছেলেমেয়ে হৈচৈ করতে করতে ঢুকে গেলো গেটের ভেতরে। বৃষ্টিতে ভেজা সহ্য হয় না আরিফের। এছাড়া চুলের ব্যাপারে ও এতো সচেতন যে, রাস্তায় চলার সময় আকাশে কালো মেঘের ছিটেফোঁটা দেখলে ও রুমালে মাথা ঢেকে নেয়। আজ ও কিছুই করলো না। কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রায়-ডজন দুয়েক মানুষের চোখের সামনে দিয়ে ও নেমে গেলো মাঠের ভেতরে। আষাঢ়ে ঢল। পাঁচ মিনিটে ও ভিজে ন্যাতা হয়ে যায়। সিমেন্টের পেল্লাই সাইজের ছাতার নিচে কয়েকটা পাতাকুড়ুনি ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। আরিফের এমন নিশ্চিন্তে, বৃষ্টির ভেতরে হেঁটে যেতে দেখে খি খি করে হেসে উঠলো একটা পিচকে ধরনের কিশোরী। সঙ্গে সঙ্গে হাসির ছররা। অই সার, কই যান এই ম্যাগের মাইজে। পাগল অইলেন নি?’ বয়সে কিছু বড়ো একটা ছেলে ওকে চিৎকার করে বলল। উত্তরে ওদের দিকে তাকিয়ে আরিফ সামান্য হাসার চেষ্টা করে। ওরা কী বুঝলো কে জানে। আর কোনো ডাকাডাকি হয় না। ভেজা সবুজ ঘাসে ছপ ছপ শব্দ তুলে আরিফ মাঠের ভেতরে ঢুকে গেলো।
ইউনিভার্সিটিতে একট ডিবেট কম্পিটিশনে শায়লার সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিলো। দেখতে আহামরি কিছু নয়, কিন্তু সারা মুখ জুড়ে এমন একটা মায়ামাখানো যে, প্রথম দেখাতেই আরিফ আটকে গেলো। শায়লা দলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো বলে। কথা অল্প, যুক্তি বেশি। তবুও ডিবেটে জিতলো আরিফরা। রেজাল্টের পর শায়লাকে একটা সান্ত্বনাসূচক ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আরিফের ভীষণ খারাপ লাগে কী দরকার ছিলো জেতার! ও আমার চেয়ে ভালো বলেছে। অন্য মেয়ে। নিটেও মন্দ নয়। আপনি চমৎকার বলেছেন, প্রায় ফাঁকা অডিটোরিয়ামের এক পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলার সময় আরিফ দু’চোখ স্থির রেখেছিলো শায়লার চোখের ওপরে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। এক চুল নড়তে পারে না।
একটা উদোম পাগল মাঠময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মাঠের মাঝখানে গভীর ডোবাটা পানিতে টইটুম্বুর। বিশাল কালীমন্দিরটা ডোবার ডানে না বাঁয়ে ছিলো, আরিফ ভাবতে চেষ্টা করে। একাত্তরে সাতাশে মার্চ সকালে মন্দিরের উঠোনের দৃশ্যটার কথা মনে হলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। একসঙ্গে এতোগুলো লাশ এর আগে ও কখনো দেখে নি। বীভৎস। বৃষ্টির ছাট কমে আসে। ঝাকড়া চুল জট পাকিয়ে আরিফের। কপালে এসে পড়ে। গা কুট কুট করছে। হাঁটা যাচ্ছে না। ঘাস এবং পানিতে স্যান্ডেল কেবল আটকে যায়। পাগলটা হঠাৎ দেখে ফেলে আরিফকে। তারপর তেড়ে ছুটে আসে। কী যেন চিৎকার করে বলে, আরিফ বুঝতে পারে না, দৌড় দেয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সামনে এসে ও থামলো। পাগলটা এতোদুর আসে নি। আবার আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে ওকে দু’হাত আড়াআড়িভাবে দু’পাশে তুলে দিয়ে রকির মতো ঘুরতে দেখলো আরিফ। শালার পাগল। মনে মনে বললো ও।
ঐদিন রাতের ঘটনার পর সকাল পর্যন্ত আরিফ ঠায় জেগে থাকলো। ভোরের সামান্য আগে ও চোখ বোজে। সাতটার দিকে শায়লা যখন রোজকার মতো খাটের পাশে টিপয়ে শব্দ করে চায়ের কাপ রাখে ও চোখ খুলে তাকায়। গোসল সেরে এসেছে শায়লা। সাবানের গন্ধে ভুরভুর করে সমস্ত ঘর। ফিকে গোলাপি শাড়ির মধ্যে ওর সদ্য ঘুম ভাঙা মুখখানা বড় কচি এবং পবিত্র মনে হয়। ঐ মুহূর্ক্সে জন্য রাত্রে ব্যাপারটা ভুলে যেতে চেষ্টা করে আরিফ। নাস্তা খেয়ে অফিসে যাওয়ার সময় অনেকদিন পর ও শায়লাকে চুমু খেলো।
কেউ রাস্তার ওপাশে অন্য এক রিকশা থেকে আরিফের নাম ধরে ডাকলো। বোঝা গেলো না। এবার সামান্য বিব্রত বোধ করে ও। অফিসের কেউ এ অবস্থায় দেখে ফেললে একটা বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে যাবে। শাহবাগের কাছে এসে রিকশাকে রায়ের বাজার যেতে বলে যতটা সম্ভব রাস্তার বাঁদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসলো আরিফ।
ইউনিভার্সিটিতে ও ছাড়াও দুটো ছেলের সঙ্গে শায়লার আলাপ ছিলো। এদের কোনটা হাবিব? একজনকে জানতো ক্রিকেট খেলে। অপরজন একটু উদাসীন ধরনের। ইচ্ছে করলে ও নাম জেনে নিতে পারতো। পরিচয়ও হয়তো হতো? কিন্তু একটা অস্তলীন ঈর্ষা ওকে শায়লার সামনে ছেলে দুটোর ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাতে দেয় নি। পরে অবশ্য শায়লা সবার থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে আনে। ও তখন পুরোপুরি আরিফের।
হুবহু শায়লার মতো দেখতে একটা মেয়ের মুখ দেখা গেলো দ্রুত ছুটে যাওয়া একটা গাড়ির ভেতর। পাশে বসা লোকটা ঐ দুই স্কাউড্রেলের একজনের মতো দেখতে। ঘাড় ঘুরিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আরিফ। মনে মনে ও এক ঝলক শায়লার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে নেয়। গত ক’দিন ওর অদ্ভুত ব্যবহারে ভয় খেয়ে যাওয়া একটা মুখ। চোখদুটো পানিতে টলটল করছে। বাহ্ বাহ্ চমৎকার। লে লাপাকে, জোরে বলে উঠলো আরিফ। রিকশাঅলা চমকে পিছনে ফিরে তাকালো, ‘কী কইলেন সাব, লেকের পার?’ ‘ওনা কিছু না। তুমি যাও’, বোকার মতো হাসলো আরিফ।
ক্ষিদেয় মরে যাচ্ছিলো শায়লা। টেবিলে রাখা খাবার আর কিছুক্ষণ পর মুখে দেয়া যাবে না। এমন বৃষ্টি। ভাতে ছাতা পড়ে যাচ্ছে হয়তো।
দেড়টার দিকে হঠাৎ কাপড় চোপড় পরে ঘরে পায়চারি করছিলো আরিফ। সে কী, এখন বেরুবে না-কি? লাগোয়া রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে শায়লা জিজ্ঞেস করে। একটু আমজাদের ওখানে যাচ্ছি। এক্ষুণি চলে আসবো।
