না, তেমন কিছুই হয় নি। বারোটার দিকে মাথাটা কেমন জানি হঠাৎ ঘুরে উঠলো। রিঙ্কু কই? আরিফ দু’হাতে কপালের দু’পাশ চেপে ধরে বললো।
রিঙ্কু খেলছে। তুমি শুয়ে পড়ো। বলতে বলতে শায়লা গেলো রান্নাঘরের দিকে। সেদিন আরিফ আর বেরুলো না।
দ্বিতীয় দিনও একই ব্যাপার। আরিফ ফিরলো চারটের দিকে। বললো, মাথা ঘুরছে। কিন্তু দুদিন তারিফের চেহারায় শরীর খারাপ বা অসুখের কোনো লক্ষণ চোখে পড়লো না শায়লার। সাতটা পর্যন্ত সটান, নিশ্ৰুপ শুয়ে থেকে ও ড্রইংরুমে গিয়ে বসে টিভির সামনে। রোববারে সকালের দিকে ছাড়া টিভি দেখে না ও। এ দুদিন আরিফকে খুব মনোযোগ দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুদের প্রোগ্রাম দেখে শুরু করে বাংলা-ইংরেজি খবর, বিদেশি ছবি, রাজ্যের বিজ্ঞাপন, সাক্ষাৎকার ইতাদি প্রায় সবকিছু দেখতে দেখে দারুণ অবাক হয় শায়লা। ভালোও লাগে। এতো দীর্ঘ সময় ধরে স্বামীকে কাছে পায় নি ও অনেকদিন।
১৪ জুন রাতে বিছানায় আরিফকে জড়িয়ে ধরে শুতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলো শায়লা। সেই পুরনো মিঠেকড়া গন্ধটা নেই। নিটে বছর প্রায় প্রতিদিন এই বিশেষ গন্ধটা অতিক্রম করে ও আরিফের আগুন স্পর্শ করেছে। এই গন্ধ তাকে ঘুম পাড়িয়েছে রোজ। মুখ ফিরিয়ে শুয়ে ছিলো আরিফ। ওর মুখের ওপর কুঁকতে গিয়ে সিগারেটের গন্ধ পায় শায়লা। আরিফ চোখ বুজে পড়ে ছিলো। মুখের ওপর শায়লার খোলা চুলের এক গোছা ঝপ করে পড়তেই ও চোখ খুললো।
কী খাও না আজকাল? শায়লা ডিম লাইটে মদু হেসে জিগ্যেস করে।
ভাল্লাগে না। আরিফও হাসলো বলে শায়লার মনে হয়।
চারদিন পর একটা বোতল নিয়ে আমজাদ এসে হাজির। তখন সবে সন্ধে হয়েছে। বাইরে বৃষ্টি। অফিসের কলিগকে দেখে কোনোরকম উচ্ছ্বাস দেখালো না আরিফ। বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিলো আমজাদ। উদাস এক জোড়া চোখ মেলে আরিফ শুধু ওকে একবার মাথা মুছে নিতে বললো। পাশে বসা শায়লার সঙ্গে চোখাচোখি হয় আমজাদের। আরিফ মন দিয়ে টিভি দেখছে। পায়ের কাছে হামাগুঁড়ি দিচ্ছে রিঙ্কু। সেদিনই: আমজাদের মুখে শায়লা শুনলো, অফিসে ওর স্বামীর ওপর কারণ দর্শাও নোটিস জারি হয়েছে। অফিসের মতে, আরিফুল হকের যুক্তিহীন অনিয়মের জন্য কোম্পানিকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দু’দিনের মধ্যে নোটিশের জবাব না দিলে কর্তৃপক্ষ ওকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হবে। শায়লার মুখ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে। চোখে পানি এসে যাচ্ছিলো। মরিয়া হয়ে শেষে ও কাঁদো কাঁদো গলায় আমজাদকে জিজ্ঞেস করে, কী হলো বলুন তো? একটা কিছু বলার জন্য আমজাদ অনেক পীড়াপীড়ি করার পর আরিফ একবার ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো। শুকনো ও দুঃখী-দুঃখী হাসি। এক পলকের জন্য আরিফকে আমজাদের ভীষণ একা ও অসহায় মনে হলো। কিন্তু ও একবার টিভি, একবার শায়লার মুখ—এরকম বার কয়েক তাকিয়ে কোনো কারণ বের করতে পারে না। কাল একবার ফিসে যাস আরিফ। আর এটা রেখে গেলাম। সাদা জিনের বোতলটা টিপয়ে ঠক করে রেখে আমজাদ দরোজার দিকে এগুলো। শায়লা কিছু বলার আগেই লম্বা লম্বা পা ফেলে ও রাস্তায়। তখনো বৃষ্টি হচ্ছে।
আহ্, হাবিব ছাড়োয় পরিষ্কার শায়লার কণ্ঠ। নিজের কানে শুনেছে আরিফ। রাত তিনটেয় শায়লা, আমি তোমার গলায় পরিষ্কার শুনেছি—পরিষ্কার শুনেছি, বিড় বিড় করতে করতে সায়েন্স ল্যাবরেটরির পাশ ঘেঁষা ফুটপাত ধরে আরিফ হেঁটে যাচ্ছিলো। ধু ধু করছে বেলা দুটোর দুপুর। একটা খালি রিকশাও চোখে পড়ে না। রায়ের বাজার। থেকে এতোটা পথ ও হেঁটে এসেছে। ঘামে জবজব করছে গা। হাবিব, হাবিব। আরিফ আবার বিড়বিড় করে অজান্তেই ওর হাঁটার গতি বেড়ে যায়।
তিনদিন ধরে খাওয়া একটু বেশি হয়ে যাচ্ছিলো। জার্মানি থেকে সুহাস এসেছে পাঁচ বছর পর। উঠি উঠি করেও আরিফ আমজাদ ওখান থেকে ছুটতে পারছিলো না। সুহাস পুরনো বন্ধু। একসঙ্গে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে। ওর সঙ্গে খেতে খেতে মন খুলে পুরনো দিনের গল্প করার লোভ ছাড়াও সহজ নয়। এমনিতে আরিফ চাপা স্বভাবের। কিন্তু দুতিনটে পেটে পড়ার পর ওকে আর চেনাই যায় না আমজাদও সঙ্গী হিসেবে চমৎকার। চুটিয়ে আড্ডার পর তিনটে রাত আরিফের বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় একটা হয়ে যাচ্ছিলো।
আজকাল ওদের একবারের বেশি হয় না। কিন্তু সেদিন প্রথমবারের পর আরিফ বিছানা ছেড়ে উঠে এলো ড্রইংরমে। খুব হালকা এবং ফুরফুরে লাগছিলো। টু-ইন ওয়ানে ডোনা সামার চড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বইপত্র ঘাঁটঘাঁটি করে। ঘন্টা দুয়েক কিছু পাঁচমিশেলি গান শোনার পর আরিফ আবার শুতে যায়। ঘুম আসছিলো না। রিঙ্কু দলামলা পাকিয়ে খাটের একেবারে কিনারে শুয়ে আছে। ওকে কিছুটা ভেতরের দিকে টেনে আনলো আরিফ। শায়লা ওর পুরনো ভঙ্গিতে ডানদিকে ফিরে শোয়া। মাথার কাছে ধবধবে সাদা ব্রা ডিমলাইটেও স্পষ্ট দেখা যায়। হাঁটুর অনেকদূর পর্যন্ত শাড়ি উঠে আসায় ওর ফরসা পা দুটো ঠাণ্ডা সাদা বাতির মতো আভা দেয়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর পারলো না আরিফ। প্রথমে শায়লার পায়ের পাতা থেকে আলতো হাত বুলিয়ে উরু পর্যন্ত টেনে আনলো। আহ্, কী গরম। তারপর ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো আচমকা। আর ঠিক তক্ষুণি, রাত তখন তিনটে (দুরে ঘন্টা বাজছিলো)—আহ্ হাবিব ছাড়ো। প্লিজ ছাড়ো! শায়লার কণ্ঠ। ছিটকে উঠে আসে আরিফ। কিছুক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত স্ত্রী দিকে। ধ্রুপদী ভঙ্গিতে একটা অদ্ভুত তরঙ্গ শায়লার শরীরে দোল খায়, ঠোঁট ফুরিত হয়, দেখা যায় ওর ঝকঝকে দারে মুক্তো। দৃশ্যটা আরিফ উপভোগ করছে না, ওর শরীরে কোষে কোষে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষ—আরিফ সে মুহূর্তে বুঝতে পারলো না।
