রান্না হয়ে গেছে। খেয়ে যাও। স্বামীর এই আচরণের কোনো কারণ খুঁজে পায় শায়লা। না, এসে খাবো। আর আমার দেরি হলে তুমি খেয়ে নিও। বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না আরিফ। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
সাধারণত দুটোর মধ্যে খাওয়া সেরে নেয় শায়লা। স্কুল থেকে কোনোদিন ফিরতে দেরি হলে বড় জোর তিনটা। আরিফ তখন অফিসে থাকে। খায় পাশের কোনো রেস্তোরাঁয়। ওর লাঞ্চ আওয়ার এক ঘন্টা। রায়ের বাজার থেকে মতিঝিলে আপ-ডাউন এবং খাওয়া ব মিলিয়ে সময় লাগে দেড় ঘন্টার বেশি। সুরাং দুপুরে বাসায় যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। শুধু রোবার দিন একসঙ্গে খাবার জন্য সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি নেয় শায়লা। এখন বিকেল পাঁচটা। মাথা ধুরছিলো শায়লার। রিঙ্কু ঘুমুচ্ছে প্রায় দু’ঘন্টা ধরে। ছটফট করতে করতে ও বারান্দায় চলে এলো। কোথায় গেল মানুষটা? এমন সময় দূর থেকে একটা রিকশায় আরিফকে দেখা যায়। আজ একটা এসপার ওসপার হয়ে যাবে। প্রেম করে বিয়ে করেছে বলে মাথা কিনে নেয় নি। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে শায়লা। আরিফের রিকশা বাসা থেকে বেশ কয়েক গজ দূরে এসে থামলো। আর এগুবে না। বৃষ্টির পানি জমে ঢাল রাস্তা, পাশের মাঠ, ডোবা একাকার।
রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে আরিফ শায়লার দিকে মুখ ঘুরিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। স্বামীর ভেজা উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে চমকে যায় শায়লা। বৃষ্টিতে ভেজার লোক নয় আরিফ, পানি লাগার ফলে ওর চুল চুপসে গিয়ে মাথার সঙ্গে লেপ্টে আছে। রোকেয়া হলের সামনে এক শ্রাবণের বিকেলে একটা কাক-ভেজা পাগল গাড়ি চাপা পড়েছিলো। মেয়েরা বলছিলো আত্মহত্যা।
প্যান্ট না গুটিয়েই আরিফ আধ হাঁটু পানি ভেঙে বাসার দিকে আসতে থাকে, শায়লার চোখে চোখ পড়তে ও হাসলো। হাসিটা শায়লার কাছে অচেনা লাগে। সঙ্গে সঙ্গে ও টের পায়, ওর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা সরু হিমেল স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
মালাবৌদি – ডাঃ মহাদেব বন্দ্যোপাধ্যায়
পাড়ার নীলুদা মানে নীলেন্দ্রনাথ মুখার্জীর আজ বিয়ের বৌ-ভাত। সীমিত মানুষের আয়োজন। আমরা ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি নীলুদাকে। যেমনি সৎ চরিত্র’র, তেমনি সাহসী, প্রগতিশীল চরিত্র আর ধার্মিকতা আর মনে-প্রাণে। ছোটখাটো একটা চাকুরি করেন।
কোন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। মুক্তমনের মানুষ বিয়ে করলেন বড় শহরের একটা সাধারণ মেয়ের সঙ্গে।
আমরা মানে চিনু-পানা রনি-পিন্টু-ভোলা-পদ্মা আর আমি পরিবেশনার দায়িত্ব পেলাম।
নীলুদার বড়মামা কলকাতার যাদবপুরে থাকেন। তিনিই মেয়েটাকে পছন্দ করে দিয়েছেন। খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ। আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিরে গপু, তোদের মালা বৌদি কেমন হোল?”—আমরা সবাই একবাক্যে বললাম,—”আলাপ হয়নি এখনও মামা, এইতো সবে এখানে এসেছেন, পরে আলাপ হবে। তবে নীলুদা যখন বিয়ে করে এনেছে তখন খারাপ নিশ্চয় হবে না।”
পরের দিন নীলুদার এই মামা আমাদের বাড়িতে বাবার সঙ্গে বসে গল্প করছেন। কানে এল–“আমিই দেখে শুনে, নীলুর সঙ্গে বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলাম। রূপে সরস্বতী, গুণে লক্ষ্মী, নীলুর একটু সেবা যত্ন করবে, তাই চাকুরীজীবি বা শিক্ষিত মেয়ে নিলাম না, তবে মাধ্যমিক পাশ। একেবারে আটপৌরে, ঘরোয়া,” বাবা শুনছিলেন সব। আমি বাড়ি থেকে আড্ডায় বেরোলাম।
রকে বসে পাড়ায় আড্ডা দিচ্ছি আমরা। হঠাৎ পান্না বলে ফেলে, যাই বলিস ভাই নীলুদার বৌখানাকে মনে হল না যে বড় শহরের মেয়ে, কিরকম যেন আনস্মার্ট, “–আরে পান্না শোন, নীলুদা যখন চয়েস্ করেছেন তখন নিশ্চয়ই গুণী। আমি বলে ফেললাম।”
“–তবে পড়াশুনা যা শুনলাম তাতে ভাই ভবিষ্যতে কষ্ট দেবে নীলুদাকে, অত ভালো ছেলে নীলুদা,”— দীনু বেশ গম্ভীর ভাবে কথাটা বলে।
মাস ছয়েক এইভাবে চলল, একদিন আমরা পাড়ার সেই রকে বসে গুলতানি করছি, দেখি শৈল পিসি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে মুখখানা পাচার মত করে বলে, “শুনেছিস কিছু তোরা?”
—”কি শুনব?”
“—দিনরাত বসে বসে রকে গ্যাঁজাবি, তা শুনবি কি করে? ওই যে তোদের ছেলেদের দেবতা, ওই যে নীলু মহারাজ, বৌটাকে যে দিনরাত অত্যাচার করে মারছে, পাড়ায় ছি ছি পড়ে গেছে, বুঝলি?”
আমরা এ-ও সবার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছি, তারপর আমিই শৈল পিসিকে বলি, “ভালোকরে বলতে কি ব্যাপারটা? কিরকম অত্যাচার করছে?”
শৈল পিসি বাল্যবিধবা, পাড়ার সবাই ওকে পিছনে ‘খাস-খবর’ বলে। শৈল পিসি বলে, জানিনা বাবা শুনছি সব পাড়ার বৌদের মুখে। ওই তো ধনঞ্জয়ের বোঁটা সেদিনও আমাকে বলল, “জানো পিসি, নীলু ঠাকুরপো অত্যাচার করে বৌটাকে মেরে না ফেলে বাপু,”—”তোরা বাবা দেখ গোপাল আমার মানিক, আহারে! বৌটার কি কষ্ট, মুখটা শুকিয়ে আমচুর হয়ে গিয়েছে, ভগবান কতদিন যে এইসব সইতে হবে ঠাকুর তুমিই জানো।” বলে পিসি হাতদুটো কপালে ঠেকিয়ে স্বর্গের দিকে তাকায়। আমরা একটু ভাবলাম, কিন্তু সেরকম গুরুত্ব দিলাম না।
.
দিন পনের পর আমার মা আমাকে বললেন, “হ্যারে গপু নীলুটাকে একটু ঠেকা, মেয়েটা মরে যাবেরে? মালাকে শুনছি প্রায় গঞ্জনা শুনতে হচ্ছে। প্রায়ই ওর কান্নার স্বর শোনা যাচ্ছে নীলুর বাড়ি থেকে।”
