মেয়ে শাসনের রাসটা ইদানিং যুথিকা শক্ত করেই ধরেছে। ফলে, সাইকেলের পেছনে চেপে স্কুল যাওয়াই শুধু নয়, আরো অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে নিত্যই স্বামীকে ভর্ৎসনা করছে যুথিকা। মেয়েকেও। তবু যেমন বাপ, তেমনি মেয়ে। গায়ে মেখেও মাখে না। শতেক রকম ফন্দি করে এড়িয়ে যায় সমস্ত শাসন। কাজেই যুধিকার রফ থেকে প্রায়ই কথা ওঠে।
মেয়েদের সাঁতারে ফার্স্ট হয়েছিল পুতুল। কাপ পেল, মেডেল পেল; সুইমিং কষ্টিউম পরা ছবি উঠল তার। কাপ-মেডেল দেখে যুথিকা অখুশি হয়নি। কিন্তু যেদিন পুতুলের সেই বিজয়িনী ছবিটা নিয়ে এল হিমাংশু, যূথিকার সারা মুখ কুঁচকে উঠল। মেয়ের অসাক্ষাতে ছবিটা বাক্সের অন্ধকারে চালান করে দিয়ে বলল যুথিকা স্বামীকে, “আচ্ছা, মেয়ের তোমার বয়স বাড়ছে না কমছে?”
“কেন?” হিমাংশু অবাক হয়ে চোখ তোলে।
“কেন কি, ওই নেংটিটা পরিয়ে কেউ ছবি তোলে ডাগর মেয়ের? ছি-ছি।”
“নেংটি? নেংটি আবার কোথায় পেলে তুমি? ওটা ত সাঁতারের জামা। বাঃ, আমারও ত অমন জামা আছে, ছবিও আছে, দেখ নি নাকি তুমি?”
“তোমার থাকে থাক, মেয়ের থাকবে না।” যূথিকার গলায় এবার স্পষ্ট আদেশ, “হেদোর জলে সাঁতার কেটে মেয়ের তোমার জীবন কাটবে না; তাকে ঘর-সংসার করতে হবে।–-ছি ছি, কি জঘন্য ছবি! পাঁচজনে ত চোখ দিয়ে তাই গিলে খাবে।”
“কি যে বল?” হিমাংশু স্ত্রীর কথায় হেসে ফেলে, “রসগোল্লা না পান্তুয়া যে গিলে ফেলবে! তবে হ্যাঁ, দেখবে। দেখানর জন্যেই ত ওই ছবি; ওতে তোমার মেয়ের গর্ব। আর যদি অন্য কথা বল, তবে বাপু, সত্যি কথাই ত, ভালো চেহারা দেখবার জন্যই।” একটু থেমে আবার, “এই ধরনা তোমার-আমার কথা। বিয়ের আগে দাদু, মা—দুজনই তোমায় দেখেছিলেন; লুকিয়ে চুরিয়ে আমিও। আর দিব্যি করে বল তুমি, আমাকেও তুমি দেখেছিলে কিনা?–হুঁ, বাব্বা-এত দেখাদেখি, ভালোলাগা তবেই না বিয়ে?”
স্বামীর বাকবিন্যাসের তরলতায় যুথিকার গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ হতে চলেছিল। তাড়াতাড়ি অন্তিম উম্মাটুকু প্রকাশ করে ও বলল, “সব কথা নিয়ে হ্যালহেলে ভাব আমার ভালো লাগে না। ওসবের বয়স পেরিয়ে গেছে, এখনো তোমার এই ছেলেমানুষি কি ভালো লাগে, না মানায়?” কথা শেষ করে যূথিকা আর দাঁড়ায় না; চলে যায়।
স্ত্রীর কথায় মুচকি হাসে হিমাংশু। ও লক্ষ করেছে–যূথিকা দিনে অন্তত দু’পাঁচবার চেষ্টা করে, হিমাংশু যে ছেলেমানুষির বয়স কাটিয়ে প্রায় প্রবীণত্বের সীমানায় এসে পৌঁছেছে, সেটা স্মরণ করিয়ে দেবার। অথচ হিমাংশু জানে, এটা বাড়াবাড়ি যুথিকার। জোর করে বয়স পাকাবার চেষ্টা। বাস্তবিক, কি এমন বয়স ওর বা যুথিকার! নেহাত এক সেকেলে দাদুর পাল্লায় পড়ে গোঁফ ঘন হওয়ার বয়সে, সেই কুড়িতে কলেজে পড়ার সময়ই তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল পনরো বছরের ঘূথিকাকে। নয়ত আজ তার বা যূথিকার এমন একটা বয়স হয়নি, যাতে বুড়োটে মেরে যেতে হবে। বরং আজকাল ছেলেরা কে-ই বা ত্রিশ-বত্রিশের আগে, আর মেয়েরা তেইশ-চব্বিশের আগে বিয়ে করে? একটু বয়সে বিয়ে হওয়াই ভালো—হিমাংশুর আজকাল এই ধারণা। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তার বা যুথিকার কিছু ক্ষতি হয়েছে বই কি? একটা আশ্চর্য সিরসিরে তারুণ্যের আনন্দ যদিও বিয়ের সময় ওদের ঘিরে ছিলে, বিয়ের পরেও, তবু যোত বছরে মা হয়ে যুথিকা মরতে বসেছিল। কি কষ্ট তার, কি ভয় হিমাংশুর! ভেবে ভেবে ভয়ে দুশ্চিন্তায় হিমাংশুর চেহারা শুকিয়ে গিয়েছিল, এমন সাঁতারু বুকের ফুসফুসটাও দুর্বল হয়ে পড়েছিল, কালি ধরেছিল চোখের নীচে। যাক, ঈশ্বরের কৃপায় প্রচুর অর্থ-সামর্থ ব্যয় করার পর যূথিকা বেঁচে উঠল। আবার সে ফিরে এল এই আলোয়, হিমাংশুর স্পর্শানুভূতির গণ্ডির মধ্যেই। কিন্তু সে-যূথিকা আর নয়। মিষ্টি, মোলায়েম চেহারা আর নেই; বিবর্ণ, শুষ্ক, অস্থিসার, দীপ্তিহীন। তার শরীরে একটা গোলমেলে অঙ্গই চিরকালের জন্যে বিকল করে দিলে ডাক্তাররা। দ্বিতীয় কোনো পুতুলের সম্ভাবনা থাকল না আর ওর জীবনে। না থাকুক; এক পুতুলই যথেষ্ট। যাকে হারাবার আশঙ্কায় প্রতি মুহূর্ত দুঃসহ হয়ে উঠেছিল, সেই যখন ফিরে এল তখন হৃতস্বাস্থ্য, বাঁ-পা টেনে টেনে হাঁটা নির্জীব স্ত্রীই এক মুক্তপক্ষ বিহঙ্গের আনন্দস্বাদ বয়ে এনেছে হিমাংশুর জীবনে। খুঁত নিয়ে কে তখন মাথা ঘামায়? হিমাংশু ঘামায়নি; আজও ঘামায় না বোধ হয়। খালি এইটুকুই মনে হয়, দুর্বল স্বাস্থ্যের আর সম্ভবত শারীরিক গোলমালের জন্য যুথিকার স্বভাবেও কেমন একটা নির্জীবত্ব এসে পড়েছে দিনে দিনে।
সে-তুলনায় হিমাংশু অবশ্য ছেলেমানুষই, অন্তত ছেলেমানুষের মতন চঞ্চল, চপল, দুরন্ত স্বভাবের। এর জন্যে যদি দোষারোপ করতে হয়, তবে তার স্বতঃস্ফূর্ত জীবনীশক্তিকেই করা উচিত। প্রখর যৌবনের অমিত তাপে তার প্রাণশক্তি উথলে উঠছে, উপড়ে পড়ছে। তা নিয়ে কি করবে হিমাংশু তাই যেন ভেবে পায় না। অফিস শেষে সাইকেলটাকে হাওয়ার গতিতে রাস্তার পাশ ছুঁয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়; র্যাকেট হাতে খেলতে নামলে হার্ড সার্ভিসে অপর পক্ষকে নাস্তানাবুদ করে তোলে, প্রতিটি অঙ্গ মত্ত হয়ে ওঠে টেনিস বলের চকিত বিচরণে। এতেই সে শেষ নয়, বা এতটুকুতেই। সুইমিং ক্লাবে আজও সে ট্রেনার; ব্যাকস্ট্রোকে সাঁতারু যুবকদের ভীতিস্থল। ছোটদের দল হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় চাঁদা উঠোতে, পুজোর প্যান্ডেল সাজাতে। বন্ধুরা ধরে নিয়ে যায় তাসের আড্ডায়, চৌরঙ্গী পাড়ায় পানীয় কক্ষে কখন হয়ত। শেষের জিনিসটা সম্পর্কে তার আকর্ষণ বা অনুৎসাহ কোনোটাই নেই। কেমন একটা ঝোঁকের মাথায় চলে যায়। আর দেখা যায়, এমন দিনে বেশ রাত্রিতেও কার্জন পার্কে চক্কর মারছে হিমাংশু। মনে মনে হিসাব কষে যতক্ষণ না স্থির ধারণা জন্মাচ্ছে। পুতুল ঘুমিয়ে পড়েছে, ততক্ষণ ট্রামে উঠবে না ও। রাগ করলেও যুথিকার কাছে ক্কচিৎ-কদাচিৎ এ-অপরাধের মার্জনা আছে। ভয় পুতুলকে। পাছে পুতুল বুঝতে পারে, বাবা তার মদ খেয়েছে—সেই ভয়ে অনেক রাত করে অসাড় পায়ে হিমাংশু বাড়ি ঢোকে; উঁকি দিয়ে দেখে, মেয়েটা ঘুমিয়েছে কিনা। বিছানায় শুয়ে সেদিন নিজের ওপর যত রাগ, তত ঘৃণা হিমাংশুর। ছি ছি এমন নেশার দরকার কি, যাতে মেয়ের কাছে যেতে লজ্জা, মেয়েকে পাশে ডাকতে ভয়। সারা সন্ধ্যে মেয়েটা নিশ্চয় কান পেতে বসে থেকেছে, পড়ার টেবিলে বসে বই খুলে রেখেছে অযথাই, একটা অক্ষরও চোখে দেখেনি। খেতে বসে খুঁতখুঁত করেছে। শেষ পর্যন্ত অভিমানভরেই হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। মনটা ভয়ঙ্কর রকম মুষড়ে পড়ে হিমাংশুর। শুয়ে শুয়ে প্রতিজ্ঞা করে, আর নয়–বন্ধুদের এই বাজে ফুর্তির পাল্লায় পড়ে নেশা-টেশা আর করছে না সে।
