রাস্তায় সেদিন আলো ছিল না। কেবল দু’পাশের বাড়ীর জানালায় পরদা দেখা যায়।
বাগানের দরজা খোলা ছিল, নিঃশব্দে ঢুকে গেলাম। দেখলাম রবির ঘরে আলো। সে তাহলে আমার আগেই পৌঁছে গেছে।
বাগানের ঠাণ্ডা হাওয়া অকস্মাৎ কয়েকটা ঝাঁপটা দিয়ে গেলো। সমস্ত শরীর ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে আসতে চায়। অথচ বিকেলে বেরুনোর সময় শীত লাগছিলো না বলে গরম কাপড় বেশী নিইনি।
ওরা আসলে আমার অনুপস্থিতিই চাইছিলো। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেবার প্রয়োজন তো আমিও অস্বীকার করিনি, তাহলে আমার অনুপস্থিতি এতো কাম্য কেননা?
খোলা দরজা দিয়ে রীণার পেছন দিক দেখা যাচ্ছিলো কেবল। একবার ভাবলাম, ফিরে যাই। না, ফিরবো কেননা—যা ঘটে, যা ঘটবে, তাকে তুমি রোধ করতে পারো না, ঘুরে যাওয়া চাকাকে থামাবে কে? দরজার গোড়ায় শব্দ করে ঘরে ঢুকে গেলাম। রীণা চমকে ফিরে দাঁড়ালো। তার হাতের জিনিসপত্র দেখে বুঝলাম সে বিছানা গোছাতে এসেছে। ঘরে রবি নেই। সে তখনো ফেরেনি।
কপালে অল্প ঘাম ছিলো বোধ হয়। রীণা দ্রুত কাছে এসে, বুকের কাছে এসে, কপালে হাত রাখলো, এ রকম দেখাচ্ছে, শরীর খারাপ করলো না তো?
খাটের ওপরে বসলাম। বসে অনেকক্ষণ বসে, থেকে বললাম, না, রীণা, দুর্বলতা সহজে যায় না তো।
নিশ্চিন্ত হয়ে রীণা কি একটু ভাবলো, বললো, দেখো, ভাবছি, রবি যে ক’দিন আছে তোমরা দুজন এ ঘরেই শোবে।
আমি কৃতজ্ঞতায় তার হাত চেপে ধরে বললাম, আমিও তাই ভেবেছি।
রাতে খাওয়ার সময় রীণা আমাদের সঙ্গে ছিলো। শিষ্টাচার, কিছু হাল্কা কথা দিয়ে দ্রুতধাবী চাকাকে থামাতে চাইলাম আমরা। সু কিছুই সহজ হলো না সে-ও বোঝা গেলো।
শোয়ার সময় লেপ হাতে নিয়ে পাশের খাটে এলে রবি আদৌ বিস্মিত হয় না।
তার মুখে হাসির আভাস ছিলো।
বাতি নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। বললাম, রবি, আজ আর বেশী কথা নয়, ঘুমিয়ে পড়ো। রাতে তোমার ভালো ঘুম হওয়া দরকার। আমারও কাল ভোরে আপিসে ছুটতে হবে।
দেয়াল থেকে ঘড়ির আওয়াজ ভেসে আসছিলো।
অনেক পরে হঠাৎ রবি শব্দ করে হেসে উঠলো।
বিস্মিত আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আরে, কি ব্যাপার!
অন্ধকারে রবির গলা ভেসে এলো, আচ্ছা, আমরা আর কতোদিন বাঁচবো, মনি?
ভালো করে লেপ গায়ে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করলাম। বললাম, আরো অনেক দিন রবি। এমনি সব দিন রাত্রি পা করে আরও অনেক দিন আমাদের বাঁচতে হবে।
আত্মজা – বিমল কর
হিমাংশু স্বামী; যুথিকা স্ত্রী। ওরা বছর পাঁচেকের ছোটবড়ো। দেখলে মনে হবে, ব্যবধান পাঁচের নয়, আট কিংবা দশের। মেয়ে পাশে থাকলে এহিসেবটাও গোলমাল হওয়া বিচিত্র নয়। পুতুল যদি পনরোয় পা দিয়ে থাকে, আর যুথিকা সত্যিসত্যিই গর্ভধারিণী হয় ও-মেয়ের, তাহলে বলতে হবে, রোগা খাটো চেহারায় মেয়েরা বেশ বয়স লুকতে পারে। যেমন যুথিকা। অবশ্য যুথিকা কখনও বয়স লুকোবার চেষ্টা করত না। বরং পুতুল যে তার মেয়ে—একথা হাবে-ভাবে সাজে-পাশাকে পরিস্ফুট করার ঝোকটা তার স্বভাব দাঁড়িয়েছিল। এই চেষ্টা সত্ত্বেও পুতুলের মা যুথিকাকে মোটেই পঞ্চদশী কন্যার জননী বলে মনে হত না। বরং এই ধরনের সাজ-পোশাকে ওর রোগা, খাটো চেহারার ওপর শালীনতা ও আভিজাত্যের একটা সুষমা ফুটিয়ে তুলত। যা দেখলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক, পনরো বছরের মেয়ের মা সাজার চেষ্টাটা ওর কৃত্রিম। আসলে, পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত সজ্জার আশ্রয়ে একটি খাটো লঘু নারীদেহের মেদ-শুষ্ক দুর্বল অস্থিগুলো আশ্চর্যভাবে আত্মগোপন করত; এমন কি, পানপাতা ঢঙের ছোট একটি মুখে ব্যাধির যে-বিবর্ণ রেখাঙ্কন স্বভাবতই দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা—তাও ঢাকা পড়ে যেত। বলা মুশকিল, যুথিকার মনের সুগোপন কোণে; ওরই অজ্ঞাতে এই দ্বিতীয় বাসনা ছিল কিনা—যদিও আচরণে উলটোটাই প্রকাশ পেত।
স্ত্রীর তুলনায় স্বামী বিপরীত মেরু। যুথিকা একত্রিশ হলে হিমাংশুর ছত্রিশ হওয়ার কথা। স্বতন্ত্রভাবে ওকে দেখলে পরিণত যৌবনের দীপ্তিতে চোখ ঝলসে যায়। সুগঠিত অঙ্গ, স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ। সর্বাঙ্গে তার সেই প্রাণবন্ত যৌবনের খুশি, হাসি আর হিমাংশু ত ব সময়েই হাসছে। সকাল-দুপুর-সন্ধে-সব সময়; সর্বত্রই। একটা মানুষ যে এত হাসতে পারে, ওকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এমনিতেই গলার স্বরটা রাট। জোরে হাসলে বাতাসের ঢেউ এমনভাবে গলা দিয়ে বাইরের হাওয়ায় এসে শব্দ তুলত যা শুনলে মনে হবে—এক জোড়া পায়রা আগল-দেওয়া ঘরে ডানার শব্দ তুলে উড়ছে। এমন হাসি দিনে অসংখ্যবার শোনা যায় হিমাংশুর পাশে থাকলে; যদিও সব সময়ের হাসিটা তার ঠোঁটে গালে লেগে থাকে, চোখেও কিছুটা। অনেকের এ হাসি পছন্দ; অনেকের নয়। যেমন, পুতুলের খুবই ভালো লাগে; যুথিকার লাগে না। বরং দেখা গেছে—মাঝে মাঝে রীতিমত বিরক্ত হয় যুথিকা, কড়া সুরে ধমক দেয়; বলে, “ইস্ অমন বিকট শব্দ করে কি হাস?…” অফিস যাবার মুখে হিমাংশু তখন হয়ত রুমালটা ট্রাউজারের পকেটে পুরছে, খুবই ব্যস্তভাব; তবু এক লহমা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখে বিস্ময় তুলে বলে, “বল কি–যে হাসি এককালে বাঁশির চেয়ে মধুর মনে হত তোমার, আজ তা বিকট হয়ে গেল!” একটু হয়ত অপ্রতিভ হয় যুথিকা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সামলে জবাব দেয়, “এককালে রঙ্গ করার বয়স ছিল-করতুম। তা বলে আজও কি তোমার মতন ছেলেমানুষি করতে হবে?” স্ত্রীর কথায় আর একদফা হেসে দমকা হওয়ার মতন বাইরে এসে দাঁড়ায় হিমাংশু, পাশের ঘরের দিকে মুখ বাড়িয়ে ডাকে, পুতুল, রেডি? আমি নীচে নামলাম। তাড়াতাড়ি আয়।” কথা শেষ হতে না-হতে দেখা যায় ব্রতর করে সিঁড়ি বেয়ে হিমাংশু নীচে গেছে। পুতুল সবে বারান্দায়। মা-মেয়েতে চোখাচোখি হয়। যুথিকা পাশ কাটিয়ে নীচে নামতে থাকে হঠাৎ তারপর সিঁড়ির মাঝবাঁকে দাঁড়িয়ে পড়ে। হিমাংশু পায়ে ক্লিপ লাগিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে অপেক্ষা করছে চোখ সিঁড়িতে। যুথিকা বিরস চোখে তাকিয়ে শুরু করে, “তুমি যাও, পুতুল যাবে না।”… “যাবে না! কেন?” হিমাংশু বুঝেও না-বোঝার ভান করে। অসহ্য বিরক্তি মেশানো গলায় যুথিকা এবার জবাব দেয়, “এক কথা একশো বার বলতে আমার ভালো লাগে না! কার না বলেছি, ওকে তুমি সাইকেলের পেছনে চাপিয়ে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাবে না!” হিমাংশু চকিতে একবার স্ত্রীর মাথা টপকে দেখে নেয় : পুতুল এক সিঁড়ি এক সিঁড়ি করে নিঃশব্দে মার প্রায় পিঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে-মুখে চট করে একটু অপরাধের ভাব ফুটোয় হিমাংশু, “আজ কিভাবে যে একটু দেরি হয়ে গেল গো বুঝতেই পারলাম না! পুতুলের স্কুলের বাসটাও ফিরে গেল। কিন্তু অযথা স্কুল কামাই করা কি ভালো হবে? ওর আবার আজ অঙ্কের ক্লাস। কি রে, আজ না হয় নাই গেলি, পুতুল!” বাপের কথায় মা ঘাড় ফিরিয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। কান্না কান্না মুখ করতে তিলমাত্র দেরী হয় না মেয়ের। আস্তে অথচ শব্দটা যাতে বাবার কানে যায় ততটুকু চড়িয়ে পুতুল বলে, “অঙ্কের ক্লাস কামাই গেলে বড্ড যা-তা করে বলে মিস্ প্রকার।” যুথিকা চূড়ান্ত শাসরে সুরে জবাব দেয়, “সেকথা আগে মনে থাকে না; হেলাফেলা করে কেন তুমি স্কুলের বাস ফেল কর? শুনবে কুনি, শোনাই উচিত।” একটু থেকে যুথিকা এবার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ট্রামবাসে পৌঁছে দিতে বললে এক্ষুনি ত বলবে তোমার অফিসের লেট হয়ে গেছে। বুড়োধাড়ী মেয়েকে সঙ সাজিয়ে সাইকেলের পেছনে করে রাস্তা দিয়ে না নিয়ে গেলে তোমার বাহার হয় না। যাও, যা খুশি করগে।” কথা শেষ করেই ঘূথিকা ওপরে উঠতে থাকে—মেয়ে, স্বামী কারুর দিকে ফিরে তাকায় না। না তাকাক যুথিকা। পুতুল হরিণগতিতে নীচে নেমে এসে বাবার পাশটিতে দাঁড়ায়। হিমাংশু মুচকি হেসে মেয়েকে সদরের দিকে পা বাড়াতে ইঙ্গিত করে।
