আর ন্যাপা খিল তুলে দরজা খুলতেই ধড়াস করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল এক বিশাল বড়ো পুরুষ। ধুতি, পাঞ্জাবি, নিউকাট পাম্পশু, মাঝখান থেকে সিধেকাটা চুল আর হাতের সিগারেট টিন নিয়ে যেন এইমাত্র নেমে এলে থিয়েটারের স্টেজ থেকে। আর পড়বি তো পড় একেবারে আধাউদোম ন্যাপাকে সঙ্গে নিয়ে।
আর ওই পড়তে পড়তে ন্যাপা হাঁকলে, এই রাত-বিরেতে তুমি কে হে! আরে ছোঁঃ মদের ডিস্টিলারি উপড়ে এনেছে কোথেকে।
আগন্তুক ন্যাপাকে শোয়া অবস্থায় জাপটে ধরে বললে, বল শালা আমার মণিবালা কই!
ন্যাপা ওর হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বললে, খবরদার, ওই নাম ফের মুখে এনেছ কি…! আগন্তুক কোনো মতে সোজা হয়ে দেওয়াল ঠেস দিয়ে বসে বললে, ছোকরা বলে কী! আমার মণিমালার নাম আমি করতে পারব না?
ন্যাপা বলল, এখানে যিনি থাকেন তিনি মণিবালা, মণিমালা নয়।
লোকটা বলল, ওই হল। যা মালা তাই বালা। গলায় মালা, হাতে বালা। এই তো।
ন্যাপা চ্যাঁচাল, চোপ! দূর হ, মাতাল কোথাকার।
সে লোক বললে, আমার মণিমালা দে, দূর হয়ে যাই।
আর তখন পাজামা সামলাতে সামলাতে ন্যাপা লোকটার কোমরে ক্যাত করে দুই লাথি ঝাড়লে।
লাথি দুটো হজম করলে খুব হাসি হাসি মুখে মানুষটা, তারপরই যাত্রা ভিলেনের মতো ‘তবে রে শালা!’ বলে হুংকার দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল ন্যাপার উপর। অত বড়ো বপু যে ওইভাবে উড়ে আসতে পারে তা ন্যাপার হিসেবে ছিল না। ও টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে পড়ল শোওয়ার ঘরের সামনে ছোট্ট, চৌকো, লাল মেঝেতে। লোকটা ততক্ষণে তার নিউকাটের এক পার্টি খুলে ফেলেছে, সেই হাত তেড়ে এল ন্যাপার উপর। কিন্তু নীচু হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে জুতোপেটা করতে গিয়ে নিজেও গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। ন্যাপা মনে মনে ভাবল, আচ্ছা হারামির পাল্লায় পড়া গেল তো! তাই পড়া অবস্থাতেই জিজ্যেস করল, তুই কে রে আপদ?
লোকটা ওই পড়ে থাকা অবস্থায় উত্তর করল, তোর মণিমালার গলার মালা! প্রথম মালা। মুরারি দত্ত!
শোওয়ার ঘর থেকে কিছুটা আলো এসে পড়েছিল জায়গাটায়, সেই আলোয় ন্যাপা ভালো করে দেখার চেষ্ট করল মুরারি দত্তর মুখটা। বুকের মধ্যে তখন শুরু হয়েছে টিপটপুনি মুরারি দত্ত! বলে কী! নাটকপাড়ার কিংবদন্তী মুরারি দত্ত এই রাতে, এইভাবে, এখানে।
ন্যাপা তখনও ভিতরে ভিতরে ঝিমুচ্ছে অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তার যখন শুনল মুরারি ওই শোয়া অবস্থায় কৌটো থেকে সিগারেট বার করে বলেছে, এই নে, একটা ধরা। আর ওই মাগিটাকে বার করে দে, আমি নিয়ে যাই।
ন্যাপা সোজা হয়ে বসে ফাইভ ফিফটি ফাইভ ধরাল মুরারির রুপোর লাইটারে, তারপর লাইটার ফেরত দিতে দিতে বলল, খবরদার মাগি বলবি না মণিবালাকে! ও আমার বিয়ে করা বউ।
অন্ধকার মেঝেতে বসে সিগারেটে মোটা টান দিয়ে মুরারি বলে, মেরেছে। আমার মাগি তোর বউ হয় কী করে বল দিকিনি? দেড় মাস ধরে হ্যাপিত্যেশ করে খুঁজে মরিচি কি আর সাধে? ওকে বাজারে আনলে কে? কোতায় ছিল জানিস ষোলো বছর আগে? কোন গলতায়?
ঠিক তখন আলনা আর তোরঙ্গের ছোট্ট কুঠুরি থেকে লাইট জ্বেলে বেরিয়ে এল মণিবালা। ঘরের আলো পড়ল ন্যাপা আর মুরারির উপর। ন্যাপা দেখল মণির চোখ দুটো জ্বলছে, কিছু কিছু রাগি দুর্গাপ্রতিমার মতো। আঁচলের চাবির গোছা দিয়ে এক বাড়ি মারল মুরারির পিঠে। আর গর্জে উঠল, কোন জন্ম থেকে হাড়মাস চুষে খাচ্ছ, তাতে রস মেটেনি? ফের আমার সুখের সংসারে আগুন ঢালতে এলে?
চাবির পিটুনিতে বেশ সুখ হয়েছে মনে হল মুরারির। চোখ বুজে সিগারেটে দম দিতে গিয়ে বলল, তোর সুখ তো আমার কোঁচায় বাঁধা, মণি। যেখানে আমি, সেখানে তুই। এরা কোখেকে আসে? বলে সামনে বসা ন্যাপাকে নিউকাটমুক্ত খালি পাটা দিয়ে এক লাথি মারল মুরারি।
এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল, মদের উপর মারামারিতে ন্যাপাও অভ্যস্ত আছে বহুদিন। তা বলে নতুন বউ নিয়ে নোংরা কথা। তার সামনে লাথি। ন্যাপা ‘ধুত্তোর!’ বলে সদ্য ধরানো সিগারেট ছুড়ে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুরারির উপর। দু-টানে ওর মিহি আদ্দির পাঞ্জাবি ফেঁড়ে ফেলে কোমরে ধুতির গিট ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মুরারি ওঠার চেষ্টা করতেই পিঠে দুটো কিল। প্রৌঢ় মুরারি ‘অফ’! ‘অফ!’ করে সে কিল হজম করলে, কিন্তু ঠেলে উঠলে ঠিক।
ধুতি খুলে খুলে মাটিতে গড়াচ্ছে, গায়ের জামা রথের গায়ে কাগজের পতাকার মতো পতপত করে উড়ছে, মুরারি এক পায়ে নিউকাট নিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, এই তোর সাধের সংসার, মণি? আমার বারটেণ্ডার গোমেসও তো এর চেয়ে ভালো পালঙ্কে শোয়! তোর ও ছোকরা করেটা কী?
মুরারি ধপাস করে বসে পড়ল খাটে। তারপর পাশের টিপয়ে ব্র্যাণ্ডির পাঁইট দেখে উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, ওরে এ তো তৈরি ছেলে বাপ, মালঝালও খায়। তা হলে বোস এখানে, খা আমার সঙ্গে দু-পাত্তর, বুঝবি মণিমালার বাবু হতে কী লাগে।
ন্যাপার ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছিল খাটের নীচের চপ্পলটা বার করে ফের প্রহার শুরু করে, কিন্তু মণিবালার প্রথম বাবুর কেরামতির কিছু জানার প্রবল বাসনারই জয় হল। ও চোখের ইশারায় বউকে অন্য ঘরে যেতে বলে দুটো ব্র্যাণ্ডির পেগ সাজিয়ে মুরারি দত্তর পাশে এসে বসল।
মুরারি প্রথম চুমুকটা দিয়েই বলল, শুনে রাখ, আমি প্রথম, তুই দুইও নস, তিনও নস, চারও নস, একেবারে পঞ্চম। পঞ্চম বাবু।
