ন্যাপা মুরারির কৌটো থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরিয়ে বলল, তোরা বাবু, আমি বাবু নই। স্বামী।
এবার মুরারি টান দিল সিগারেটে, ওই হল। বাবু আর স্বামীর ফারাক ডিকশনারি বলবে, আমি পারিনে, একটু সিঁদুর মাখালেই যদি…
হঠাৎ হাউ হাউ কেঁদে উঠল মুরারি দত্ত। ন্যাপ ভাবলে এ আবার কী শুরু করল মাতালটা। কাঁদতে কাঁদতে মুরারি বলল, ওই সিঁদুর সিঁদুর করেই তো মলো এই মেয়েছেলেগুলো। আর যাকে সত্যি সত্যি সিঁদুর মাখিয়ে বউ করে ঘরে তুলেছিলাম সেই হেমন্তবালা তো গলায় দড়ি দিয়ে কবেই মরে গেল।
ফের হাউ হাউ কান্না জুড়ল মুরারি ; ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল ন্যাপার। সে ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, এত গন্ডা মাগ রাখলে বাপ বউ তো গলায় দড়ি দেবেই।
তখন মুহূর্তের জন্য কান্না থামিয়ে মুরারি বলল, তুই বলছিস? ন্যাপ মাথা দুলিয়ে বোঝাল ‘হ্যাঁ।
সঙ্গে সঙ্গে ন্যাপার হাত দুটো চেপে ধরে কান্নার সুরেই মুরারি বলল, তা হলে বাপ তুই মণিমালাটাকে ছেড়ে দে, ওকে আজ সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করেই নিয়ে যাব।
এরকম একটা আবদার যে কোনো মানুষ কারও বউকে নিয়ে করতে পারে এটাই ন্যাপার কল্পনার বাইরে। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইল তারপর সেই বিস্ময়ে বিহ্বলকণ্ঠে বলল, তুই আমার বউকে বিয়ে করে নিয়ে যাবি? এটা হয়?
কান্নাটাকে একটু সামলে নিয়ে মুরারি বলল, কেন হবে না? তুই ওকে ছেড়ে দিলেই হবে। ন্যাপা কিছু বলার আগে ঘরে ঢুকে এসেছে মণিবালা। কোমরে হাত রেখে মুরারিকে বলল, শয়তান মিনসে, তুমি জানো সিঁদুরের কী মূল্য। ভেবেছ আমায় সিঁদুর মাখিয়ে তোমার বাগানবাড়িতে নিয়ে ফিরবে? বেরোও। না হলে আমি পুলিশ ডাকব। বেরোও।
ন্যাপার হঠাৎ সংবিৎ ফিরেছে, ও বলল, পুলিশের কী দরকার। আমিই মেরে ভাগাচ্ছি। বলেই ন্যাপা দাঁড়িয়ে মুরারির ঘাড় ধরল।
মুরারি গর্জাল, খবরদার। গলা ধরবিনি।
ন্যাপা খিঁচিয়ে উঠল, গলা ধরব কীরে! ঘাড় মটকাব। ভালো চাস তো মানে মানে বের হ। মুরারি গেলাস রেখে উঠে দাঁড়াতে ন্যাপা হাতটা সরিয়ে নিল ওর ঘাড় থেকে। আর তক্ষুণি বাইরে গাড়ির হর্ন বাজা শুরু হল। মুরারি প্রচন্ড খেপে খিঁচিয়ে উঠল, হারামির বাচ্চা ড্রাইভার হর্ন দিয়ে ডাকছে। এত বড়ো স্পর্ধা! আমি দেকছি…
বলতে বলতে সিগারেট কেসটা তুলে নিয়ে ঘরের বাইরে পা দিল মুরারি। ওর পকেট গলে এক বাণ্ডিল একশো টাকার নোট পড়ে গিয়েছিল খাটে, সেদিকে চোখ পড়তে মণিবালা বলল, দাঁড়াও। ওই টাকা তোললা, তারপর যাও। এ বাড়িতে কারও ভিক্ষে নেওয়া হয় না। লোকের বাড়িতে এইরকম টাকার টোপ ফেলার কায়দা আমার জানা আছে।
মুরারি থমকে দাঁড়িয়ে, তারপর ঘুরে ওই টাকার দিকে চেয়ে ছদ্ম বিস্ময়ে বলল, আমার টাকাগুলো উপচে পড়ে গেছে বুঝি। ন্যাপা তোড়াটা ওর হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবুমশায়। এখন ফেরত নিয়ে ধন্য করেন।
মুরারি টাকাটা হাতে নিয়ে কী ভাবল এক দন্ড, তারপর সেটা মণিবালার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, নতুন বে হল তোর। এটা না হয় আমার উপহারই রইল। নেমতন্ন তো করলিনি…
আর তখনই চটাস করে চড়টা কষাল মণিবালা। কিন্তু এবারে মারটা আর আমোদর সঙ্গে হজম করতে পারল না মুরারি। ও রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। ন্যাপাও দেখল প্রৌঢ়ের মুখের রসিক ভাবটা দপ করে নিভে গেল। গালে হাত বুলোতে বুলোতে মুরারি বললে, তুই আমার মারলি, মণি?
মণিবালা কথাটার আমল না দিয়ে নতুন বরের দিকে তাকিয়ে হুকুম জারি করল, ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো। আর এক মুহূর্তও আমি এসব সহ্য করব না।
মুরারি টাকাগুলো পকেটে ভরতে ভরতে বলল, তার দরকার হবে না। আমি নিজেই যেতে পারব।
বলেই ঘরের বাইরে পা রাখল মুরারি এবং চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে দড়াম করে পড়ল মেঝেতে। ন্যাপা ওকে ধরে তুলতে যাচ্ছিল, চোখের ইশারায় নিষেধ করল মণিবালা। মুখে বলল, ছেড়ে দাও, ও নিজেই যাবে।
মুরারি দ্বিতীয়বার পড়ল ফ্ল্যাটের দরজায়, তারপর অন্ধকার গলির মাঝমধ্যিখানে। গাড়ির ড্রাইভার দৌড়ে এসে বাবুকে তুলে নিয়ে বসাল যখন পেল্লায় আর্মস্ট্রং-সিডলিতে ততক্ষণে পাড়ার বেশ কিছু জানলার খড়খড়ি ফাঁক হয়ে একরাশ জোড়া চোখ ঘটনার মাপজোক নেওয়া শুরু করেছে।
ফ্ল্যাটের দরজা থেকে লজ্জা আর উত্নষ্ঠার সঙ্গে সব দেখলে ন্যাপা, ওর মনের চোখের সামনে ভাসছে তখন মামা বরদাকান্তের মুখটা। কী সম্মান লোকটার গোটা পাড়ায়। আর কী স্নেহ তাঁর অপদার্থ ভাগনেটির প্রতি। আর তাঁরই বসতিভিটের পাশেই এইসব ঘটিয়ে ফেলল ও।
একটা বিকট ধাক্কার আওয়াজ এল গলির মুখ থেকে। ন্যাপা বুঝতে পারল মুরারির গাড়ি বোধ হয় ব্যাক করতে গিয়ে সপাটে ভেড়াল ওর সদ্য হাজার টাকায় কেনা সেকেণ্ড হাম্বার হকের বনেটে। কিন্তু গলির মুখে যাওয়ার এতটুকু সাহসও আর টিকে নেই। অর্ধেক পাড়া গোয়েন্দাগিরিতে নেমে পড়েছে।
ন্যাপা তাড়াতাড়ি ঘরে এসে ব্র্যাণ্ডির গেলাসে ঢালা মদগুলোকে চোঁ চোঁ করে মেরে দিলে। মণিবালা করছ কী!’ করছ কী!’ বলার মধ্যেই শেষ। মণিবালা মদের পাঁইটটা চট করে হাতিয়ে নিয়ে পাশের ঘরে ছুটে গেল জায়গা মতন সেটাকে সরিয়ে আসতে।
তারপর ফিরে এসে দেখে উলুঢুলু অবস্থার বরটা বিছানায় পড়ে অকাতরে ঘুমুচ্ছে। মণিবালা একবার ভাবল, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল ছোকরা? কাছে গিয়ে আস্তে ঠেলা মারল, কোথায় কে। দেখল ওর পাজামাটা বিশ্রীভাবে নেমে গিয়ে ফের সেই দিগম্বর দশা। ও চেষ্টা করল সেটাকে তুলে কোমর অবধি আনার, কিন্তু উপায় কী, মড়া মাতলের ওজন নাকি লোহার সমান। মণিবালা সে-চেষ্টা ত্যাগ করে গায়ের চাদর দিয়ে বরকে ঢেকে দিয়ে, লাইট নিভিয়ে এসে সেই চাদরের তলায়ই সেঁধিয়ে গেল। চুমু দিল বরের ঠোঁটে, গালে, কপালে, চোখের পাতার উপর। তারপর দু-বাহুতে তাকে আঁকড়ে ধরে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল তার বুকের উপর।
