কিন্তু ড্রাইভার অবনীর সঙ্গে জুটে গেল দাদার সেরেস্তার ছোকরা গৌরও। দু-জনাই যেন মুখিয়ে ছিল মুখ খোলার জন্য। বেশ চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কাল রাতে ব্যাপারটা কী ঘটেছে বলত অবনী?
অবনীর আগেই মুখ খুলল গৌর, আর বললেন না মেজোবাবু, ন্যাপাদার যা কান্ড! মুখে আনা যায় না।
চপলা দ্রুত চালে কিন্তু সেই চাপা স্বরে বললেন, না বলার কী আছে! ন্যাপা মেয়েছেলে ধরে এনেছে তো? সে তো কদিন ধরেই শুনছিলাম, সে আর নতুন কথা কী।
গৌর এবার চপলার কানের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে নীচু গলায় বললে, শুধু ধরেনি মেজোবাবু, বিয়ে করেছ।
চপলা চমকে উঠলেন রেডিয়োর তারে শক খাওয়ার মতন, অ্যাঁ। বিয়ে করেছে? সে মেয়ে কে?
এবার অবনী বলল, বায়োস্কোপের মণিবালা।
বায়োস্কোপের মণিবালা! তাকে বিয়ে করে পাশের বাড়িতে তুলেছে ন্যাপায় এক পয়সা আয় নেই, দাদার টাকায় ওপেনহুড হাম্বার গাড়ি কিনে বসেছে, আর এখন বিয়েটাও সেরে ফেললে ছোকরা! চপলাকান্তের পায়ের খড়ম আপনা থেকে নাচতে শুরু করল। গোটা সমাচার দাদার কানে গেলে যে দক্ষযক্ষ বাধবে তার আশঙ্কাতেই বাঁ-হাতটা মড়মড় করতে লাগল চপলার। তিনিও কাগজ ফেলে মাথায় তেল ছুইয়ে কলতলায় ছুটলেন। লোকে আপিস কাটে, চপলাকান্ত বেগতিক দেখলে বাড়ি কেটে অপিস পালান।
কিন্তু কলতলায় পড়বি তো পড় সাক্ষাৎ দাদার সামনে। কলতলায় চাতলাজুড়ে দাদা বসে, তাঁর মাথায় বালতির পর বালতি জল ঢালছে বড়ঠাকুর। ভাইকে দেখে বরদা বললেন, শুনেছিস? চপলা বললেন, হুঁ।
-কী শুনেছিস?
–কাল কী সব গোলমাল করেছে ন্যাপা।
–ও কি ড্রিঙ্ক করে?
–বোধ হয়।
–আর?
—বোধ হয় একটা বিয়েও করেছে।
-বিয়ে! বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে মেঝে থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন বরদাকান্ত। ন্যাপা বিয়ে করেছে? তোয়ালে দিয়ে গা মোছানোর জন্য পিছু পিছু ছুটছে বড়োঠাকুর, বরদাকান্ত ভিজে কাপড়ে, ভিজে গায়ে হন হন করে চলতে লাগলেন ঘরের দিকে। মুখে কোনো কথা নেই।
খাবার টেবিলে টোস্ট, অমলেট, কফি রাখা হল, বরদাকান্ত সেদিকে দৃকপাতও করলেন । গ্যালিজ দেওয়া প্যান্ট পরে গলায় টাই গলালেন, আনমনাভাবে বুরুশ দিয়ে কোঁকড়া চুলগুলোকে সামান্য বশে এনে কোট চাপালেন, তারপর সাদা মোজামোড়া পা দুটো কালো পাম্পশুয়ে গলিয়ে হাঁক দিলেন, অবনী!
অবনী তখনও ঘরে পৌঁছেছে কি পৌঁছোয়নি; শুনতে পেল বড়োবাবু বলছেন, গাড়ি বার কর, আমি বেরুব।
অবনী অবাক হল দেওয়ালের ঘড়ি দেখে, মোটে তো পৌনে সাতটা। এখন আবার কোর্ট কীসের। কিন্তু বড়োবাবুকে প্রশ্ন করবে সে কলজে কার! ও ‘আসছি’ বলেই পরনের লুঙি ছেড়ে পায়জামা গলাতে গেল। বরদাকান্ত টেবিল থেকে বেছে বেছে দুটো ফাইল তুলে নিয়ে বাড়ির বাইরে রওনা হলেন। চপলাকান্ত স্নান সেরে যখন ঘরে এলেন তখন বেজায় আওয়াজ করে দাদার গাড়ি গেট থেকে রওনা দিল। সাতসকালে কোথায় যে গেলেন দাদা ঈশ্বর জানেন। টেবিলে পড়ে থাকা দাদার না-খাওয়া ব্রেকফাস্ট দেখে প্রথমে খিদে উবে গেল চপলার, পরমুহূর্তে সেই খিদেটাই যেন সবেগে ফিরে এল, তিনি ‘ইস, দাদাটা খেলও না!’ বলতে বলতে দাদার খাবারটা খাওয়া ধরলেন। আর তারপর দাদার কফিতে চুমুক দিতে দিতে চোখের সামনে ভাসতে দেখলেন ন্যাপার তরুণ, সুদর্শন, অসহায়, পাপী-নিস্পাপ মুখ। পাশ থেকে শুবলেন বউদি বলছেন, ঠাকুরপো, তুমি ন্যাপাকে ও বাড়ি থেকে এক্ষুণি পার করে এসো। না হলে দাদা ফিরলে লঙ্কাকান্ড বাধবে।
ধুতির উপর সাদা শার্ট চড়ানো হয়ে গেছে। চপলাকান্তের। পায়ে সাইডকাট পাম্পশু। ওর অফিস ড্রেস। কিন্তু অফিসে যাওয়াটাই আজ সমস্যার হবে। সাইড পকেটে মানিব্যাগ খুঁজতে খুঁজতে চপলা বললেন, তুমি এসব কবে শুনলে বউদি? মালিনী বললেন, সেই যবে ঘটছে।
—সে কী! অথচ আমাদের কিছু বললে না?
–বলে কী হত? ভেবেছিলাম রস মিটলে আপনা-আপনি চুকে যাবে। তো…
–তো?
–কই আর মিটল?
–তোমাকে এসব কে বলল?
—কেন, ন্যাপা নিজে।
–ন্যাপা নিজে?
-হ্যাঁ ও-ই। এসে বললে, মামি, তোমার জন্য বউ এনেছি। বায়োস্কোপের হিরোইন। পছন্দ? বললাম, তোর কি মাথাটা গেল শেষে? এ বাড়িতে বায়োস্কোপের হিরোইন। ও কীরকম গোমড়া মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ ; তারপর কিছু না বলে চলে গেল। কিন্তু সত্যি বলছি ঠাকুরপো, ভীষণ লোভ হয়েছিল একবারটি ঢু মেরে দেখে আসি। বায়োস্কোপের নায়িকা বলে কথা। আর মোটে তো পাশের বাড়ি।
-তাই গেলে?
-একদিন দুপুরে গেলাম বই কী। কাউকে না জানিয়ে। আর গিয়ে কড়া নাড়তে দোর খুলল কে জানো?
—সেই নায়িকাই, আবার কে?
—হ্যাঁ, সেই নায়িকাই। মণিবালা। দুর্গাদাস, প্রমথেশের মণিবালা। আমি অবাক হয়ে নায়িকাকে দেখছি, আর সে দেখছে আমাকে। হঠাৎ পিছন থেকে ন্যাপা বললে মণি, এটা মামি। তখন মাথায় ঘোমটা টেনে প্রণাম করতে নীচু হল মণিবালা। কিন্তু ওর প্রণাম আমি নিতে পারিনি; কেন নেব? কতদিন সিনেমার পর্দায় ওকে দেখে দেখে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলেছি। ওর ডিজাইনে চুলে খোঁপা দিয়েছি। কানের ঝুমকো কাটিয়েছি। তা বলে বাড়ির বউ করব তো ভাবিনি। তাও ন্যাপার…
-ন্যাপার থেকে কত বড়ো হবে মহিলা?
—তা বছর সাতেক তো বটে।
—অপূর্ব। তা কেমন দেখলে মহিলাকে?
–বড় সুন্দরী রে।
