দরজার পাশ থেকে ছোট্ট একটা ছায়া যেন সরে গেল। রমিতা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, মেয়ের প্রতি আমার কোনো দাবি নেই। সেদিন যেভাবে তাকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল, তাতে আমার অযোগ্যতাই প্রমাণিত। তবুও তো আমি ওর মা-ই। কিন্তু মা হিসেবে ওর কাছে আমার কোনও জায়গা নেই আমি জানি। আমার সত্যিকারের পরিচয় ওকে না-ই বা দিলে। ওকে বোলো, ওর মা মরে গেছে। আমি কখনই ওর সামনে মায়ের দাবি নিয়ে আসব না। ও একমাত্র তোমার মেয়ে হয়েই বেঁচে থাকুক।
কান্নায় রমিতার গলা বুজে এল। অনুতোষ কথা বলতে পারে না। সেদিনের সেই জেদি তরুণীকে খুঁজে পায় না কোথাও। আজকের রমিতার মধ্যে প্রাজিত মাতৃহৃদয়ের বিষাদ ঘনিয়ে আসতে দেখল আনুতোষ। সেদিনের সেই ঔদ্ধত্য যেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনুতোষের করার কিছু নেই। সেও আজ শক্তিহীন। অসহায় অথর্ব মানুষ হয়ে গেছে কখন, বুঝতেই পারেনি। নিশ্চল আনুতোষকে ও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় রমিতা। দরজার চৌকাঠেতে পা রাখতেই সে নিশ্চল মূর্তির মতো থেমে গেল হঠাৎ। বদ্বার ঘরের ভেতরের দরজায় তখন একখানি কচি মুখের উপর দুটি কালো ছলছলে চোখ নিয়ে রণিতার কণ্ঠ আছড়ে পড়েছে মা তুমি যেও না। আমি সব শুনেছি। তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না মা। আমি সব জানি। তোমাকে আমি কিছুতেই যেতে দেব না।
রণিতার কণ্ঠে সেই জেদ, সেই অভিমান। যা এক আনন্দধ্বনির মধ্যে রমিতার হারানো অধিকারকে ফিরিয়ে দিতে চাইছে।
মণিবালার প্রথম ও পঞ্চম বাবু – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
আর পাঁচটা দিনের মতো আজকের কাগজও একরাশ যুদ্ধের খবর নিয়ে এল। মিত্রশক্তির সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যারিস্টার বরদাকান্তের রক্তচাপ বাড়ে কিংবা কমে। একেক দিন ভোরের আলোয়ও তিনি গাঢ় অন্ধকার দেখেন, যখন কাগজ বলে ইউরোপ কি আফ্রিকার কোনো নগর, প্রান্তর জঙ্গল কী মরুভূমিতে অক্ষশক্তির দখল কায়েম হল। তখন কাগজ থেকে চোখ না উঠিয়েই হাঁক পাড়েন, অবনি, রেডিয়োটা ধরো।
রেডিয়ো ধরার অর্থ আরেকটু এগিয়ে পড়া খবর ধরা, তাতে অন্তত যদি নতুন কোনো পরিস্থিতির আভা মেলে। রেডিয়ো ধরো মানেই আবার বিবিসি ধরা কারণ সাহবদের ওই রেডিয়ো নাকি গভীর সংকটে পড়েও সহসা মিথ্যে রটায় না। মিত্রশক্তির হেনস্থার বার্তায় খুব দমে যান বরদাকান্ত, কিন্তু তারই মধ্যে ওই অন্ধকারে, কিছুটা সমীহে আক্রান্ত হন জার্মানদের প্রতি। কী প্রবল প্রতিভা এই একটি দেশের। তখন ভাই চপলাকে বলেন, জানিস চপল, জার্মানরা দিনে আঠারো ঘণ্টা পড়াশুনো করে। না, তুই মূখ, তুই এটা ভাবতেও পারবি না।
ভাই চপলাকান্ত কোনো অর্থেই মূখ নন, যদি অকৃতদার থাকাটা কোনোভাবে মূখামির ইঙ্গিতবহ না হয়, কিন্তু তিনি দাদার এই নিত্যভৎসনার প্রতিবাদ করারও কারণ দেখেন না। প্রতিবাদ না করেও দাদাকে উসকে দেওয়ার রাস্তা তাঁর জানা আছে, তাতে দিব্যি জ্ঞান লাভ হয়। তিনি সেই পথই ধরলেন। বললেন, যারা সারাক্ষণ যুদ্ধ করে বেড়ায় তারা আঠারো ঘণ্টা সময়টা পায় কোত্থেকে?
আর যায় কোথায়! দপ পরে জ্বলে উঠে বরদা বললেন, এবার বোঝ, কেন তোকে আমি সারাক্ষণ মুখ বলি।
চপলা মিটিমিটি হেসে বললেন, বুঝলাম।
বরদাকান্ত আরও খেপে উঠে বললেন, কোথায় বুঝলি? তুই জানিস আজকালকার যুদ্ধে একটা সামান্য ইনফ্যান্ট্রিম্যানকেও কতখানি বিদ্যে ধরতে হয়? বারো আনা যুদ্ধ কেবল ম্যাপের উপর ছক কষে জেতা হয়ে যায়, জানিস? জার্মান সেনাদের বস্তা ঘাঁটলে দু-চারটে দর্শন কি অঙ্কের বই বেরিয়ে পড়বে দেখিস।
চপলা আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, আর ব্রিটিশদের?
কীরকম চোখ বুজে আসছিল বরদাকান্তের। স্মৃতিতে ভারী হয়ে আসা চোখ দুটোকে কোনোমতে মেলে ধরে কী এক আবেগের সঙ্গে বললেন, ও-ও এক অপূর্ব জাত, চপল। মেধা আর শ্রম মিশে ভয়ানক সাত্ত্বিক জাত। এই যুদ্ধে ওরা আমার অর্জুন।
চপলা প্রশ্ন করলেন, আর জার্মানরা?
প্রায় অন্যমনস্কভাবে বরদা বললেন, আমার কর্ণ।
আজকের কাগজে মিত্রশক্তির ফ্রান্সের নর্ম্যাণ্ডি তটে অবতরণের বিস্তৃত খবর। এতে বরদাকান্তের হৃদয়ে ব্যাপক উত্তেজনা ঘটার কথা, কিন্তু ভদ্রালোক কীরকম ব্যথায় ও বিভ্রান্তিতে ঝিম মেরে আছেন। এক অন্য যুদ্ধের উত্তেজনা একটু একটু করে লয়ে বাড়ছে তাঁর শরীরের তাবৎ তন্ত্রীতে। কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে তিনি ঢুকতে পারছেন না। কাল রাতের ঘটনার সামান্য আভাসই তাঁকে ভিতরে ভিতরে পেড়ে ফেলেছে। চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়েই তাঁর মনে হল এক্ষুণিই হারামজাদা ভাগনে ন্যাপাকে ধরে খড়মপেটা করা দরকার। শুধু মার নয়, একেবারে তুলোধোনা।
এমনটা ভাবতেই পায়ের খড়ম নাচানো শুরু হয়ে গেল বরদাকান্তের। তিনি ফের এক চুমুক চা খেয়ে একটা থ্রি ক্যাসলস ধরিয়ে চেষ্টা চালালেন বিশ্বযুদ্ধে ঢাকার; কিন্তু তাতে ভিতরের যুদ্ধটা আরও বাড়ল। ন্যাপা শেষকালে কিনা বায়োস্কোপের মাগ ধরেছে। বরদাকান্ত ‘ধুত্তোর’ বলে একই সঙ্গে কাগজ আর সিগারেট ছুড়ে ফেলে কলতলার দিকে হাঁটা দিলেন।
দাদার ছুড়ে ফেলা কাগজটা কুড়িয়ে নিয়ে এবার সেটার হেডলাইন নজর বোলাতে লাগলেন চপলা। কিন্তু তাঁরও মনে উত্তেজনা ন্যাপাকে নিয়ে, শেষমেষ কী যে হয় কোথেকে কে জানে। তিনি ডাক দিলেন, অবনী!
