অথবা রবিকেই সঙ্গে করে নিয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যেতে পারতাম, রীণা রবিকে দেখাও তুমি কি কি রান্না শিখেছে।
কিন্তু এই সবই ফিল্মী কায়দা। স্থায়ী হয় না।
তাহলে সহজ পথটা কি? আমি কি চাই যে আমার অন্যান্য বন্ধুর মতোই রবিকেও রীণা সৌজন্যে, আপ্যায়নে প্রীত করবে?
আমি ভেতরে গিয়ে রীণাকে বললাম, একটা নিঃশ্বাস চেপে রীণাকে বললাম, রবির সঙ্গে তোমার বোধ হয় একবার দেখা করা উচিত ছিলো।
মুখ না ফিরিয়ে মৃদু গলায় রীণা বললো, দেখা তো হবেই এক সময়। তাড়াতাড়ির কি আছে।
.
চাকরটাকে নিয়ে বাজারে বেরুবার মুখে রবি এসে দাঁড়ালো, চলো আমিও বাজারে যাই।
না, না, রাত জেগে এসেছে। তুমি বিশ্রাম করো।
আসলে আমার ভয় ছিলো, একসঙ্গে বাজারে বেরুলে পথে এতোক্ষণ কি কথা বলা যাবে। সে আসার আগে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা যেভাবে ভেবে রেখেছিলাম, সে ভাবে কিছুই ঘটছে না। এতো সহজে যে ঘটবে না, জানতাম। তবু যার সাথে কথা কোনো কালে শেষ হবে না বলে ভাবতাম, তাকে নিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াও তো যায় না।
পথে প্রচুর ঘুম হয়েছে, বলে পায়ে জুতো গলিয়ে রবি তৈরী হয়ে দাঁড়ালো। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললো, তোমার মতো মনের জোর তো সবার না-ও থাকতে পারে, এ কথা ভুলে যেও না মনি। আস্তে আস্তে সইয়ে নিতে দাও।
পথে নেমে বললাম, মনের জোর-টোর কিছু নয়। বাইকে বেঁচে থাকতে হবে। গৃহধর্ম সন্তান পালন যাই বলো, সবই এর অঙ্গ। কিছু বাড়তি ডালপালা ঘেঁটে এই জীবনবৃক্ষটিকে একটু সোজা করে নিতে আপত্তি কি?
রবি বললো, ও সব কথা থাক মনি। আপত্তি থাকলে আমিই কি আর তোমার কাছে আসতাম?
.
দুপুরে খাওয়ার সময়ে অন্তত রীণা কাছে থাকবে ভেবেছিলাম। সে রকম কোনো আভাস পেলাম না। ফলে, ক্রমেই শংকিত হয়ে উঠছিলাম। শংকা এই জন্যে যে, রবিকে যদি এমন অবস্থার মধ্যে পুরো দিন কাটাতে হয়, সে সত্যিই হোটেলে গিয়ে উঠবে। আর আমি যে জন্যে তাকে ডেকে এনেছি, সহজ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেবো বলে আমার যে উদ্যম, তারই বা কি হবে?
অথবা আমি যেভাবে মানুষের অনুভবগুলিকে ওজন করতে চাই, কেউ তা করে না। হয়তো আমি নিজেই যা করছি তার সাফল্যে বিশ্বাসী নই।
তবু এ-ভাবে ছেড়ে দেয়া যায় না। পৃথিবী বিশাল হয়তো। কিন্তু আমাদের এই চারপাশ বন্ধ, ছোটো দম-আটকানো দেশ, খোলা হাওয়া তার কোনো জানালা দিয়েই ঢুকতে চায় না। অতএব ছোটো ফাঁকগুলো বন্ধ করে লাভ কি?
আমি আরও ভেবেছিলাম, সবই এমন কিছু দু’য়ে দু’য়ে চার হয়ে যায় না। অংকের বাইরেও কিছু রয়ে গেছে সন্দেহ কি?
আরও ভেবেছিলাম, রবি এবং রীণা যদি তাদের অবস্থান মেনে নেয়, তাতে আমারই সুখ। পুরনো প্রথা, সংস্কার এমনকি পুরনো ধরনের অনুভূতিগুলোও কি কিছু পালটে দেয়া যায় না?
তারও চেয়ে বড়ো কথা, রবির সঙ্গে আমার হৃদ্যতা শেষ হয়ে যাক, আমি চাইনি। এমন ক্ষেত্রে যা হয় তেমন করে দূরে সরে যাওয়া এবং কদাচিৎ মুখোমুখি হলে না-দেখার ভাণ করা, অথবা কষ্টে মুখে হাসি ফোঁটানো, এর কোনোটাই আমি চাইনি।
রীণাকে এ কথাই বোঝাতে চেষ্টা করেছি। অতীতকে ভুলে যাও বলবো এত বড়ো মুখ নই, বু মানুষ তো পরিবর্তিত অবস্থার দাস।
সব বুঝেও রীণা বলেছে, কি জানি, বুঝি না, মানুষের দূর্বলতার ওপরে তুমি কি করে যাবে।
খাওয়ার টেবিলে বসার আগে রীণাকে বললাম, তুমি কি এখনও ওর সামনে। যাবে না ভাবছো?
রীণা স্থির চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলো, তুমি খুব স্পষ্টতা পছন্দ করো মনি, তোমার কাছে এসে আমিও করতে শিখছি। আচ্ছা ধরো রবিকে দেখে, তার কথা শুনে তোমরা যাকে সেলফ বলো, সেই পুরনো সেল যদি আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়। বিবর্ণ আমি হেসে বললাম, তাকে বাধা দেবো না— সেই শক্তি কারো থাকে না।
রীণা আমার মুখ থেকে চোখ নামালো না, তার দরকারও হবে না, তবু তোমার মতো অতে তাড়াতাড়ি এগুতে আমি পারি না।
রীণা কি ইচ্ছা করে আমায় ধুলোয় টেনে নামাতে চাইছে? আর শোনো, এখন আমাদের ব্যক্তিগত কথাবার্তা কিছু কমালে ভালো হতো।
আমি মলিন মুখে বললাম, আমিও তোমায় তাই বলবো ভাবছিলাম।
.
বিকেলে, বাইরে বেরুনোর আগে রবি বললো, মনি, হোটেলে একটা জায়গা করে নিলে হতো না?
আমি ভেবে বললাম, এত অল্পে ছেড়ে দেবো না রবি, আরও দেখা যাক। তুমি কি খুবই বিব্রত হচ্ছো?
রবি আগের দিনের মতো হেসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, পাগল। চিয়ার আপ ওল্ড বয়। উইশ ইউ সাসেস।
সারাদিনে একবার হাসতে পেরে আমি বেঁচে গেলাম।
.
পুরনো দু’একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে রবি শহরের অন্য মাথায় চলে গেলে আমি একবার বাসায় ফেরার কথা ভেবেছিলাম। রীণার কথা ভেবে অন্য পথে নেমে গেলাম। অথচ হাতে কোন জরুরী কাজ ছিলো না, কারো সঙ্গে দেখা করার কথা ছিলো না। অন্যদিন এমন অবস্থায় হয়তো বাসায়ই ফিরে যেতাম। হয়তো রীণাকে নিয়ে বাইরে বেরুতাম।
লক্ষ্যহীন, একা একা সেই সব পথে ঘুরে বেড়ালাম যে পথে আমি, রবি, রীণা সকলেই পায়ের দাগ রেখে গেছি।
রীণার কথা ভাবছিলাম সে আমাকে কেননা ধূলোয় টেনে নামাতে চাইবে? যা স্বাভাবিক, যা ঘটে যায়, যা ঘটবে, যা আমরা সবাই জানি তাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করে লাভ কি?
রবির ফিরতে রাত হবে, সে বলে গেছিলো। আমি আর কাঁহাতক একা একা পথে ঘুরবো?
