না, না। ব্যাপারটা কিন্তু অন্যরকম।
কি রকম?
পত্রিকা পড়া আর নিজের চোখে সামনাসামনি দেখতে পাওয়া, দু’টো দু’রকমের।
যুক্তির সামনে মাথা নত করে জবাবদিই, তাও ঠিক। কিন্তু তুমি নিশ্চিত হলে কি করে যে মেয়েটি খারাপ?
রোজ সন্ধ্যা বেলায় সেজেগুঁজে বের হয় যে!
তাতে কি। জন্মেই তো মেয়েদের সাজ সাজ ভাব।
স্ত্রীকে চিন্তিত দেখায়। ঐ কুঁচকায় একবার। তারপর জবাব দেয়, না–না। ব্যাপারটা কিন্তু সে রকম নয়।
কি রকম তাহলে?
মেয়েটা সন্ধ্যায় বেরোয়, ফেরে সকালে।
গার্মেন্টসের চাকরি হবে। বাইরে তো যাও, দেখবে দিন-রাত এমন কত চাকুরিতে যায় মেয়েরা।
না, না। প্রতি রাতে হোটেলে থাকে।
অবাক প্রশ্ন করি, অত খবর কই পেলে?
মিশু ভাবীর কাছে।
তারপর এ নিয়ে অন্য কথা ওঠেনি। প্রসঙ্গ বদলে গিয়েছিল হবে। মাঝখানে দিনও কেটে যায় অনেকগুলো। ফের একরাতে টেবিলে স্ত্রীর আবির্ভাব। এদিকে লেখাটাকে তেমন বাগাতেও পারছিলাম না। ভাবনা নিয়েই বসেছিলাম অনেকক্ষণ। ওকে পেয়ে একটু মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করি। হেসে বলি, কলম থাক। এসো আজ কথায় কথায় দু’জনে সকাল করে দিই।
শোন, সব সময়ে তোমার ওই প্রেম প্রেম ভাল লাগে না। একটা খবর জানিয়ে চলে যাব।
দাও তাহলে।
মেয়েটার না একটা ভাল বিয়ে হয়েছে।
কি করে জানলে? এইমাত্র মিশু ভাবী ফোনে জানালেন।
আমার দায়িত্ব কিছু না থাক, যেভাবেই হোক, মেয়েটির মিলেছে তো ঘর। সেটাই আসল কথা। খুশি হই। নিশ্ৰুপ প্রার্থনা জানাই, ও সুখী হোক। জীবনের কোন বিড়ম্বনাই যেন স্পর্শ করতে না পারে মেয়েটিকে। অতীতের নানা পারিপার্শ্বিকতায় হয়ত ওকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকারে। সময়েরই ঘুরপাক আসলে। আবার সময়ই তো ওকে দিয়ে গেল ঠাই। মঙ্গল হোক। ওর মঙ্গল হোক।
তারপর ব্যাপারটা ভুলেই থাকি। বেঁচে থাকার নানা তাগাদা। যেখানে যা-ই ঘটুক না কেন, মানুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে বেশি। স্ত্রীর মুখেও এ নিয়ে কোনো আলাপ শুনি না। হঠাৎ একদিন চলতি পথে রিকশায় মেয়েটির সাক্ষাৎ পাই। সাথে স্বামী। বেশ পুরুষ। স্ত্রী তুলনায় খানিক বেঁটে অবশ্য। স্বাস্থ্য চমৎকার, রঙ ফর্সা,খুবই তরুণ। সদাহাশ্য মুখশ্রী। আবার পাশাপাশি ওর বরণ কিছুটা ময়লা হলেও লক্ষ্য করতে পারি ডাগর ডাগর চোখ দুটি। দৃষ্টি চকিতে চকিতে ঘুরে মরে। হয়ত আপনাতে আপনি বিভোরও অনেকক্ষন। কল্পনা করি, এই সুন্দর চোখের সম্মোহন দিয়েই ও ছেলেটিকে প্রথম আকৃষ্ট করে। ক্রমে ক্রমে জমে যায় প্রেম। মেয়েটি আজ দয়িতের কাছে সমর্পিতা। হয়ত আপন পুরুষের ছোঁয়া পেয়ে অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে ও হয়েছে নির্মল। তারপর ঠাহর করি, ঘটনা অন্য কোনো রকমও হতে পারে। প্রেমিক-প্রেমিকার বাঁধন যে কোথা হতে কেমন রূপ নেবে তা কি আগে থেকে জানা যায়? ঘটনা যেমনই হোক, বুঝি সুখী দম্পতি। সেটাই প্রকৃত পাওয়া।
পরমুহূর্তেই দুয়ের রিকশা ভিড়ে কোথায় হারিয়ে যায়। তারপর সেই পুরনো নিয়ম। কাজের কত রকম তাগাদা থাকে। ছুটতে হয় মানুষকে। কিছুকাল পর রাতের বিছানায় ঘুমোতে গেলে স্ত্রী আমাকে চমকে দিয়ে মেয়েটির প্রসঙ্গ তোলে। বলে, মেয়েটার খবর কিছু জান?
কেন, কি হয়েছে?
ও কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে জায়গা পায়নি।
কেন? কি অপরাধ?
প্রেমের বিয়ে তো! আত্মীয়-স্বজন কারো পছন্দ নয়। ছেলে চাকুরি করে। তাই রাগারাগি করে বউ নিয়ে আলাদা বাসায় উঠে গেছে। হয়ত ঐ টাকায় চলে যাবে সংসার। যাক, যেমনি ছিল, বাঁচলো তো মেয়েটা।
এখন আমার বিছানার সময়। তার আগে স্ত্রীসান্নিধ্য কামনা থাকায় শুই পাশাপাশি। ওকে কাছে টানার জন্যে ডাকি, এই!
সাড়া আসে কই! ও আছে নিজের বলয়ে। জবাব দেয়, ভাগ্যিস ছেলেটার একটা চাকুরি ছিল। তাই বউ নিয়ে আলাদা হতে পেরেছে। নইলে মেয়েটাকে নির্ঘাৎ ঐ হোটেলের দরজায় দরজায় ঘুরতে হত।
আমার স্নায়ুতে তখন চেনা ঘ্রাণ। স্ত্রীকে পেতে চাই। ফলে খানিকটা বিরক্তি নিয়েই জবাব দেই, অন্যকে নিয়ে তোমার ভাবাভাবিটা দয়া করে কমাও দেখি। সারা পৃথিবীতে নিরন্তর কত কি ঘটে। এর চাইতেও চমকে ওঠা কাহিনী আছে। হাতড়াতে যাও, দেখবে ভেতর কত জটিল, জটিল। গিয়ে দেখ, একই মানুষ অন্তরে হাজারো রূপ। আমরা সেই খবরের কে? চাইলেও কি জানতে পারি?
স্ত্রী জবাব দেয়, দুর, তুমি কিসের লেখক! কি অদ্ভুত কাহিনী। আমি লিখতে পারলে কবেই একটা গল্প লিখে পত্রিকায় ছেপে দিতাম।
তাও তো কথা। ওর জবাব বেশ যুক্তির ধার গড়ায়। কিন্তু তখন আমার নেশা অন্যত্র। ওর গায়ে হাত রাখি। সত্যিই, পরশ পেয়ে ও ছেড়ে দেয় তাবৎ আবরণ। এও যেন লেখায় কাটাকুটি শেষে রূপ পায় শিল্পে এমন! গতি আমি পাই বহুক্ষণ। ধুয়েই জাগি দুজন। তারপর পাশাপাশি, গায়ে গায়ে শুয়ে থাকা আমাদের। সেখানে সঙ্গীতের মতো নিশ্বাসের সঘন ওঠা-নামা টের পাই। আর হঠাৎ করেই মেয়েটির মুখ মনে পড়ে যায়। স্ত্রী যে বলে, ওকে দিয়ে কি সত্যি লেখা যায়? গল্প কি অতই সহজ? সরল পথ এর নয়। লেখালেখির আরও আলাদা মোচড়। সত্যের পাশাপাশি আরও আরও খেয়ালচারিতা লাগে। ওকে নিয়ে একদিন হয়েও যেতে পারে আমার কাহিনী। গল্পের ভার ব্যাপারটা অন্তরে বেশ রেখাপাত করে। জান, পৃথিবীর শব্দ, দৃশ্য, কোনটাই ফেলনা নয়। একটা সূত্র অন্যকে যুক্ত করে। শেষে গায়ে গায়ে হয়ত বেশির ভাগটাই লেপটে যায়। কি জানি, এগুলো কি বলে-কয়ে হয় কোনোকালে?
