উকিলবাবুও তখনও হতবুদ্ধি হয়ে বসে আছে, মক্কেলদের দেখে বললেন, কী বুঝছেন?
সুপ্রভাত তখনও কিছুই বোঝেনি, আমতা আমতা করে বললেন, ঠিক বুঝতে পারছি না।
—তাহলে কোর্টে মামলা তুলব?
–তুলবেন? সুপ্রভাত ঠিক ধাতস্থ হতে পারছে না, আমি বরং ব্যাপারটা একটু বুঝে নিই। দেখছেন তো, দারোগার মতো কথাবার্তা। তিনদিন পরেই না হয় মামলা হবে।
—ঠিক আছে, উকিলবাবু সায় দিলেন।
সুপ্রভাত বাড়ি ফিরে দেখলেন, আগের চেয়ে রমলার হাঁটাচলায় কাজেকর্মে শব্দ বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। যেন নিঃশব্দ বিপ্লব চলছে ঘরে। রক্তপাতহীন বিপ্লব। উকিলবাবুকে রমলা প্রায় হুমকি দিয়ে এসেছে, আপনার মক্কেলকে সাবধান করে দেবেন। তা মক্কেল তো বেশ সাবধানী লোকই। তবু এমন হুমকির কারণ বুঝে উঠতে পারছেন না সুপ্রভাত।
তিনদিন অফিসে গিয়েও স্বস্তি নেই। সারাক্ষণ একটা দুশ্চিন্তা বুকের মধ্যে। রমলার চালচলন যেন কীরকম অদ্ভুত ঠেকছে। সেদিন বাড়ি ফিরে দেখলেন, রমলা কোথায় বেরিয়েছে। ফিরল বেশ দেরি করে। ডুপ্লিকেট চাবি বার করে ঘরে ঢুকে বসে রইলেন চায়ের প্রত্যাশায়। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল, টেবিলে ফ্লাস্কের ভেতর গরম চা। পাশে ঢাকা কাপ-প্লেট।
দিন-তিনেক এরকম টেনশনে কাটানোর পর আবার উকিলবাবুর কাছে গেলেন। আগের দিনের মতোই রমলা হাজির হয়েছে কোর্টে। এবং সুপ্রভাতদের আগেই তাদের উকিলবাবুর কাছে হাজিরা দিয়েছে সে। ব্যাগ থেকে এক তাড়া জেরক্স করা কাগজ বার করে জেরার ভঙ্গিতে বলছে, আপনি ওকালতি করেন, কিন্তু মক্কেল কীসে রক্ষা পায় সে কলাকৌশল জানেন না।
উকিলবাবু আজ প্রস্তুত হয়ে আছেন লড়াই-এর জন্য। তবু প্রথম ধাক্কাতেই যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন, চশমা নামিয়ে বললেন, কেন, কেন।
রমলা আরও গলা চড়িয়ে বলল, শুধু ডিভোর্সের মামলা কোর্টে তুললেই মক্কেলকে জেতানো যায় না, বুঝলেন উকিলবাবু। আরো পাঁচসাত চিন্তাভাবনা করতে হয়।
উকিলবাবুও গলা চড়ানোর চেষ্টা করলেন, সে আমি বুঝব, আমার মক্কেল বুঝবে। আপনার তাতে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। আপনি আপনার উকিলবাবুকে নিয়ে কোর্টে যান। একটু পরেই মামলা উঠবে।
রমলা বিন্দুমাত্র না ঘাবড়িয়ে বলল, একশো বার মাথা ঘামাবো। আমার স্বামীর কিসে ভাল আর কিসে মন্দ তা নিয়ে আমারই মাথা ঘামানোর দরকার, আপনার নয়। আপনাদের তো ফি নিলেই হয়ে গেল।
ফিজের কথা শুনে ভারী রাগ হয়ে গেল উকিলবাবুর, বললেন, আপনার স্বামী তো আর থাকছে না উনি। তাহলে আর মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করছেন কেন? যান, মামলা লড়ার জন্য রেডি হোন, আর সময় নেই।
–মামলা আমি এখানেই লড়ব, কোর্টে নয়। বলে কাগজের তাড়া খুলে একগাদা জেরক্স কাগজ বার করতে থাকে রমলা। আর পর্দার আড়াল থেকে তখন দুই মকেল হাঁ করে দেখছেন ভিতরের জেরা আর কাণ্ডকারখানা। রমলার মুখচোখ দেখে সুপ্রভাত তত অর্ধেক ফ্ল্যাট।
কাগজ বার করে সেগুলো টেবিলের ওপর রাখে রমলা, দেখুন উকিলবাবু, আপনার মক্কেল আমার নামে ব্যাঙ্কে প্রায় লাখ ছয়েক টাকা ফিক্সড করে রেখেছে। তার সুদ ভাঙিয়ে আমি সারাজীবন পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে খেতে পারি। আপনার মক্কেলের ঝঞ্জাট তাহলে বইতে হয় না আমার। কিন্তু কোর্টে মামলা তুললে আপনার মক্কেল একদম মারা যাবে। এই দেখুন, তার নামে পাঁচটা ব্যাঙ্কে প্রায় লাখ পাঁচেক ক্যাশ টাকা আছে। দুটো লকারে টাকা গয়না মিলিয়ে লাখ তিনেক। তাদের ডুপ্লিকেট চাবি সব আমার কাছে। কোর্টে মামলা উঠলে যদি জজের সামনে কাগজগুলো ফেলে দিয়ে বলি, যা ব্যবসা করে, ততে তার নামে আটলাখ টাকা কোত্থেকে এল? তারপর তো গাড়ি বাড়ি আছেই। এক পয়সা ইনকামট্যাক্স দেয় না। বুঝলেন? সঙ্গে সঙ্গে হাজতে চালান করে দেবে আপনার মক্কেলকে। ভাল চান তো ভালয় ভালয় মামলা তুলে নিন এক্ষুণি। আমি চললাম। আর হ্যাঁ, আপনার মক্কেলকে বলবেন,আজেবাজে বন্ধুর সঙ্গে যেন না ঘুরে বেড়ায়। আর কোর্টের কাজ মিটিয়ে যেন সকাল-সকাল বাড়ি ফেরে।
বলেই আর একবার পর্দা সরিয়ে দুই মূর্তিমানকে প্রবলভাবে ভস্ম করে দিয়ে বেরিয়ে গেল পায়ে দুমদাম শব্দ তুলে।
উকিলবাবু আর তার দুই মক্কেল তখন ধরাশায়ী। একে-অপরের দিকে তাকাচ্ছেন পিটপিট করে।
বেলী – বুলবুল চৌধুরী
লেখার টেবিলে বসি রাতের বেলায়। ঘর আলাদা। সবদিনেই যে বিশেষ গতি পাই, তা নয়। কখনও কখনও কাটাকুটি হয় প্রবল। আবার পাতার পর পাতা ভরেও ওঠে কোন কোন দিন। আজ বেশ টানা চলছিল কলম। গল্পের একটা বিশেষ বাঁকে পৌঁছে হঠাৎ থামতে হয়। ঘাড়ের কাছটায় জমে উঠছে গভীর নিশ্বাস। এগারো বছরের সংসার। টের পাই ওকে। এই গন্ধও বহু চেনা আর আপন আমার।
মুখ ফেরাই। পরমুহূর্তেই টেবিলের কোণে নিজেকে ঠেক দিতে দিতে স্ত্রী জবাব দেয়, যা ভেবেছি তাই। জানো, মেয়েটা না খারাপ! আমার সন্দেহটাই ঠিক। তাই বলি, রোজ রোজ যায় কই।
কোন মেয়েটা?
ভুলে গেলে? ওই যে, রাস্তার ওই পাশের দোতলা ফ্ল্যাটে গত মাসে নতুন ভাড়াটে উঠেছে না?
এতক্ষণে খেয়াল করতে পারি। আমরাও দ্বিতলবাসী। আর ঠিক উলটো দিকে মেয়েটির বাস। ফলে উভয়েই বেশ মুখোমুখি। তাকালে ভেতরকার অনেকটাই দেখতে পাই। মাঝখানে শুধু একটা গলির ব্যবধান। অন্যের ঘরের জানালা। আড়ি পাতা উচিত নয় ভাবি। তাও একদিন উঁকি দিয়েছিলাম। মেয়েটির ছিপছিপে গড়ন। দীর্ঘাঙ্গিনী। শ্যামলা। বয়স একুশ-বাইশ হবে। পিঠময় চুল ছড়িয়ে সারা ঘর চঞ্চল ঘুরে বেড়ায়। ব্যস। এই অবধিই। তারপর সবটা ভুলে যাই। মানুষের জীবনাচরণ কত রকম। এই শহর দিনে দিনে আলো-অন্ধকারে কত হাবুডুবু। পত্রিকায় চাকরি আমার। অসংখ্য ধারার লোক চারপাশে। কত রকম আলাপ হয়। অনেক কিছুই টের পাই এই শহরের। স্ত্রী অত অতল জানবে কোত্থেকে? সহানুভূতি নিয়ে বলি, এরা সত্যি দুঃখী। কত ধরাও পড়ে পুলিশের হাতে। হোটেলে মেয়ে, বাসায় মেয়ে। কখনও কখনও ওদের সাথে সাথে দালাল ও কাস্টমারের ছবিও ছেপে দেয় পত্রপত্রিকা।
