পরদিন হঠাৎ নোটিশে পাড়ি জমাই শহরের বাইরে। পত্রিকার প্রয়োজনে একটা কভারস্টোরি তৈরি করতে হবে। সেই কাজে কাজে কেটে যায় পাঁচদিন। দীর্ঘ পথ ছিল। ভ্রমণের ক্লান্তি নিয়ে ফিরি ঘরে। স্নান সারি। স্ত্রী খাবার নিয়ে বসে সামনে। পাতে নানারকম তুলে দিতে দিতে বলে তোমাকে একটা খবর শোনাব।
এরকম কথায় কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু যেন অনুমান করতে পারি। জানতে চাই, কি? আবার কি বাঁক নিল কাহিনী?
স্ত্রী জবাব দেয়, ঠিক ধরেছ। ও না বড় পোড়াকপালি। সত্যিই, কি ভেবেছিলাম আর কি হল শেষে।
মুখের খাবার সরে। বিষণ্ণ হয়ে যাই। সেদিন না দেখলাম দু’জনকে রিক্সায়। কেমন উড়তে উড়তে যাচ্ছিল দম্পতি। সুখী ছিল নিশ্চয়। তাহলে কি নতুন বিপদের সূচনা কাহিনীতে? জিজ্ঞেস করি, কেন? বেশ তো সুন্দর ছিল। দেখেছিও দু’জনকে পথে একদিন। কি হল আবার ওদের?
তুমি যেদিন সিলেট চলে গেলে সেদিনই জানতে পারলাম বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে। বৌ ছেড়ে দিয়ে ঘরের ছেলে নাকি ফিরে গেছে বাবা-মায়ের কাছে।
এবার সত্যি সত্যিই উত্তেজিত হই। আমার অসহিষ্ণু কণ্ঠ, বলি, কেন? ওদের ছাড়াছাড়ি হল কোন কারণে?
তা তো জানি না। মিশু ভাবীর কাছ থেকে যা শুনি সেটুকুই তো শোনাই তোমাকে। হবে হয়ত কিছু। নইলে কি আর ছাড়াছাড়ি হয়? কে জানে বাবা! ভাবতে গেলে আমার তো মাথা গুলিয়ে আসে।
ভাবনা এখন আমার মধ্যে। কত কি কল্পনা করি। আচ্ছা, ছেলেটির সাথে মেয়েটির কবে প্রথম পরিচয়। হয়ত কোন এক কেনাকাটার সময়ে পরস্পরের চোখাচোখি। অথবা আর কি হতে পারে? দুর, অনুমান দিয়ে কি আর কারণ আবিষ্কার করা যায়। তাও গল্পের কারণে গোপনে গোপনে অনুসন্ধান চলে। হয়ত মেয়েটিরই দোষ হবে। একবার স্বভাব হয়ে গেলে তা বোধহয় নিবারণ প্রায় অসম্ভব। স্বামীর অজান্তে পরপুরুষের সাথে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়তেও পারে মেয়েটি। কিন্তু পরমুহূর্তেই খানিকটা কাটাকুটি সারি। হতে পারে স্বামীর কাছে মেয়েটির অতীত পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে। সেই ক্ষেত্রে ওকে কি দোষ দিতে পারি আমি?
নতুন রহস্য খুঁজে পাই। গল্পের বাঁক দরকার। কিন্তু মেয়েটির নামই তো জানা হল না আজ অবধি। ফের ভাবি, কি হবে জিজ্ঞেস করে? স্বামীর সাথে ওর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দুঃখটুকুই আমার মধ্যে একটা নাম হয়ে জেগে থাকে। কিন্তু এও তো অন্যায়, প্রতিবেশি যেমনই হোক মানুষ, নাম জানার সৌজন্য থাকতে হবে। প্রশ্ন করি, ওর নামটা যেন কি? জানাই হল না।
স্ত্রী রেগে যায়। বলে, তুমি খুব লেখক তো! সব তোমার ভান। তবে না শুনি, মানব দরদি না হলে সে কখনো বড় শিল্পী হয় না। মানুষকে ভালোবাসাটালোবাসা আসলে তোমার ফাঁকা বুলি। কচু লেখক তুমি। আচ্ছা, কি ধরন তোমার? চেনা একটা মেয়ের জীবনে কত কি ঘটে গেল চোখের সামনা দিয়ে, আর তুমি নামটা পর্যন্ত একবার খোঁজ নিলে না? বাহ! বেশ তো।
গম্ভীর উচ্চারণ করি, ক্ষমা চাই।
উত্তর আসে, থাক। হয়েছে। পারো যদি ওর কথাটা গল্পে গল্পে লিখে রেখো। না যদি পারো তাহলে নেই।
সবিনয়ে জানাই, তুমি খুশি হও আমি তাই চাই। কথা দিচ্ছি লিখবো। ওকে নিয়ে লিখবো। আজ না হয় দাগ কাটবো কলমে।
সত্যিই তো?
ঠিক ভাবনা শুরু করতে পেরেছি। আগে তো আবছা আবছা হলেও মুখটা দরকার সেটুকুও পেয়ে গেছি। দেখবে যে কোন সময়ে হয়ে যাবে লেখা। সত্যিই তো, ওর জন্যে আমরা কি করতে পারি আর? দয়া করে এবার ওর নামটা শোনাও।
স্ত্রীর জবাব, বেলী। বেলী গো। ফুলের নামে নাম। হলে কি হবে! এমন সুন্দর মেয়ে, ভাগ্য কেমন দেখলে?
দিন বয়ে যায়। মাঝে মধ্যে উঁকি দিই মেয়েটির ঘরে। ওকে দেখি কখনো কখনো। বাইরে থেকে কি এর বেশি আঁচ করা যায়? গল্পের বিচ্ছিন্ন দু’একটি অংশও আঁকি মাথায় মাথায়। তা হলেই তা সাথে সাথে পাতা ভরানো যায় না। অপেক্ষা করতে হয়। গভীর দৃষ্টিতে কারণ খুঁজে বেড়াই। মেঘের ঘনঘটার মতো কোন সূত্র এসে বিচ্ছেদ ঘটায় মেয়েটির জীবনে। কোন সত্য লুকিয়ে আছে পেছনে?
দিন কয়েক পরের কাহিনী। অফিসে বসে আছি। স্ত্রীর ফোন। বলি, হ্যালো।
শোন, নতুন খবর আছে।
কি?
বেলী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল।
তারপর?
ক্লিনিকে গিয়ে বাচ্চা ফেলে এসেছে। অন্য কি উপায়? বাপের পরিচয় লাগবে না? মারাত্মক খবরটা তাহলে শোন। জানো, কদিন থেকে নাকি শুধু ব্লিডিং হচ্ছে। দেখলাম কি ফ্যাকাসে মুখ মেয়ের। আচ্ছা, এম. আর. করালে কি এমন বিপদের ভয় থাকে মেয়েদের?
কথা বন্ধ হয়ে যায়। সারা দেশ জুড়ে এ ধরনের ক্লিনিক কম নয়। পত্রপত্রিকায় এসব নিয়ে নানা লেখাও পড়েছি। নানা দুর্ঘটনার তথ্য সেখানে। অপটু ডাক্তারকে। মেয়েদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ঢাকায় এমন গজিয়ে ওঠা ক্লিনিক যথেষ্ট আছে। কিন্তু সব মিলে কেন জানি মাথায় মাথায় বেলী খেলতে শুরু করে। কি হয়েছিল। ওর? হয়ত এক সুন্দর বিকেলে স্বামী-স্ত্রী মিলে বেরিয়েছিল পথে। রিকশাওয়ালা চলতে চলতে থেমেছিল সেই হোটেলের দরজায়। স্বামী ধমকে উঠেছিল, এই থামলে কেন? চালাও।
চেনা রিকশাওয়ালা ছিল বেলীর। আগে-পরেও প্রায় সময়েই ওকে নামিয়ে দিয়ে গেছে হোটেলে। আজও তেমনটা ভেবে দুয়ারে থামায় রিকশাওয়ালা। ঠিক এরকম কোন ঘটনাতেও বেলীর বিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। আবার আমার এই অদ্ভুত কল্পনাও তো বাস্তব হতে পারে না। অদৃশ্য কত কি ঘটে। সেটুকু কল্পনা দিয়ে মেলাবার চেষ্টা চালাই। কিন্তু কল্পনা সত্য নয় সত্যি। তবে যা কিছু সম্ভব সেটাও তো সত্য এক রকম!
