এরপর পীতাম্বর অফিসে দেখা করতে আসতেই বললেন, কী করে ছাড়লি বল তো নোটিসটা? সে তত বেশ ঝড়ঝাপ্টার ব্যাপার।
পীতাম্বর এবার বিজয়ীর হাসি হাসলেন, বরং বলতে পারিস, ঝড়ের ধাক্কায় অপর পক্ষই ধরাশায়ী আর তারপরই অনন্ত সুখ।
বলেই যেন রেডিই ছিল এমনভাবে কোর্টের একটা কাগজ বার করলেন। নে, এখানে সই কর। তারপরের যা ধাক্কা আমিই সামলাব। আর একজন পামেলাও দেখে রেখেছি। শুক্লারই বান্ধবী। দেখলে তোর চোখ ট্যারা হয়ে যাবে। তোর জীবনের ওয়েসিস। কথা বললে মনে হবে জলতরঙ্গ বাজছে।
পীতাম্বর চলে যাওয়ার পরও সেই জলতরঙ্গ বাজতে লাগল সুপ্ৰভারে কানে। সারাক্ষণ মনের ভেত্র একটা রিমরিম সঙ্গীত, মন মোর মেঘের সঙ্গী
কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় ছাঁত করে উঠল বুকের ভেতরটা। সই তো করিয়ে নিয়ে গেল পীতাম্বর। নোটিশ কি আজকেই দিয়ে দেবে নাকি?
বাড়ি ফিরে অবশ্য একটু স্বস্তি পেলেন। রমলা ক’দিন ধরে একটু গম্ভীর গম্ভীর আছে বটে, কিন্তু ততটা আক্রমণাত্মক মনে হচ্ছে না। শুধু ফেরার পর চায়ের টেবিলে বসে বলল, দার্জিলিঙ থেকে পনেরোদিন হল চিঠি আসছে না। অন্যমনস্ক হয়ে সুপ্রভাত কোনওক্রমে হৃদয়ঙ্গম করছে কথাগুলো। সুপ্রভাত যেন একটা ট্রাঙ্ককল করে ছেলে বুম্বার খবর নেয়। সুপ্রভাতের তো এধ্ব দিকে একদম খেয়াল থাকে না। ছেলেটাকে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করেই যেন দায় সারা হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। নাহ, নোটিস আসেনি।
কিন্তু সব তালগোল পাকিয়ে গেল দিন তিনেক পর। সুপ্রভাত অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পরও রমলার সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। জামাকাপড় ছেড়ে, বাথরুমে হাতমুখ ধুয়ে যখন তাকাচ্ছে, এদিক ওদিক, হঠাৎ দেখল, মুখে ঝড়ের আগেকার থমথমে ভাব নিয়ে ঘরে ঢুকল রমলা। হাতে চায়ের কাপ। অন্যদিন দু’হাতে দু-সেট কাপ-প্লেট থাকে, আজ একটিই। ধুপ ধাপ শব্দ করে ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর সশব্দে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখেই ফের বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কাপটা আর একটু হলেই ভেঙেছিল আর কি! বিয়াল্লিশ টাকা পেয়ার।
সুপ্রভাত গিয়ে টেবিলে বসলেন, দু-এক চুমুক দেবার পরও রমলার দেখা নেই। অন্যদিন দুজন একসঙ্গে বসে চা খান, টুকিটাকি কথা হয়। আজ একা।
শুধু তখনই নয়, রাতের বেলা খাবারের টেবিলেও দেখলেন একপ্লেট ভাত। খানিকক্ষণ উসখুস করার পর অগত্যা একাই খাওয়া শুরু করলেন। রমলা। আশেপাশেই আছে, কিন্তু তাকে এড়িয়ে চলছে। হয় ভেতরের ঘরে, না হয় কিচেনে এটা-ওটা করছে, কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে দ্বিগুণ শব্দ করে। মুখে শব্দটি নেই, কিন্তু হাঁটাচলা কাজে-অকাজে ঝড় বইছে।
আর শোবার সময়ও দেখলেন বিছানা খালি। একটি বালিশ পাতা। রমলা তার বিছানা করেছে অন্য ঘরে।
পরদিন জানতে পারলেন, যা ভেবেছে, ঠিকই। নোটিস সার্ভড় হয়েছে। কোর্টে হাজিরা আছে দিন পাঁচেক পর। ফলে পাঁচটা দিন ঘরে একইভাবে নিঃশব্দ বিপ্লব পালিত হয়ে চলল রমলার মুখের অভিব্যক্তিতে, কাজে-কর্ম, হাঁটাচলায়। সুপ্রভাতের মনে হল, যে-কোন মুহূর্তেই সশব্দ বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যাবে, কিন্তু হচ্ছে না। একই ছাদের তলায় মাত্র দুটি মানুষ অথচ মাঝখানে একটা কাঁচের দেওয়াল।
কোর্টে হাজিরার দিন ছুটি নিতে হল সুপ্রভাতকে। স্নান করে খাওয়ার সময় খেয়াল করলেন রমলার মান আগেই সারা। সুপ্রভাত রেডি হওয়ার আগেও সে-ও শাড়ি বদলে হনহন করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, বোধহয় কোর্টের দিকেই। যাওয়ার ধরনটা রীতিমত ম্যাজিস্ট্রেটের ভঙ্গিতে।
নাহ্, পীতাম্বরের কথা তো মিলল না। বলেছিল, জোঁকের মুখ নুন পড়বে। এখন দেখা যাচ্ছে, জোঁক তার লম্বা নাক নেড়ে চলেছে হনহনিয়ে।
কোর্টের মুখেই পীতাম্বরের সঙ্গে দেখা। পীতাম্বর ফিসফিস করে বললেন, রমলা এসেছে।
সে তো সুপ্রভাত জানেনই। কয়েক মুহূর্ত ফিসফিস করে কথা বলে দুজনে কোর্টে উকিলবাবুর কাছেই চললেন। কখন ডাক পড়বে কোর্টে কে জানে।
কিন্তু উকিলবাবুর ঘরে ঢুকবার মুখেই থমকে দাঁড়ালেন তারা। দেখলেন, রমলা আগেই ঢুকে পড়েছে সেখানে, এবং হাজির হয়েছে তাদের উকিলের কাছেই। এখানে রমলা কী করছে?
পর্দার আড়াল থেকে কান পেতে শুনলেন, এই যে মশাই, খুব তো ডিভোর্সের নোটিস জারি করেছে। তা করেছে ভালই। এতে আমার খুব একটা যাবে আসবে না। তবে আপনার মক্কেল কিন্তু ডাহা মারা পড়বে।
উকিলবাবু ঘোড়েল লোক। চশমার ওপর দিয়ে হাঁ করে বোঝবার চেষ্টা করছেন ব্যাপারটা। বিপক্ষের মক্কেল এসে তার কাছে চোপা করছে এ-দৃশ্য তার কাছে অভাবনীয়। চশমাটা নাকের কাছে নামিয়ে বললেন, কী রকম, কীরকম।
—সেটা আজকেই বলছি না। আমার এখনও কাগজপত্তর জোগাড় হয়নি। তবে বলে যাচ্ছি, মামলা তুলে নিন। নইলে আপনার মক্কেলের কপালে অনেক ঝঞ্ঝাট আসছে। দিন তিনেক পরে আমি কাগজপত্তর নিয়ে আসছি।
বাইরে তখন উকিলবাবুর মক্কেল দাঁড়িয়ে ঘামছে। পীতাম্বরও রীতিমত ঘাবড়ে গেছেন। ভুরু নাচিয়ে সুপ্রভাতের কাছে জানতে চাইলেন, ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াচ্ছে!
রমলা ততক্ষণে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এল দুমদাম শব্দ করে। বেরিয়ে দুই মক্কেলকে দেখে চোখে এমন আগুন বর্ষণ করল যে তাতে দুজনেরই ঝলসে যাবার উপক্রম। তারপর রমলা বেরিয়ে যেতেই দু’জনেই বিভ্রান্ত মুখে গিয়ে ঢুকলেন উকিলবাবুর ঘরে।
