শুক্লা অনায়াসে হাত বাড়িয়ে রীতিমত হ্যান্ডশেক করল। বেশ নরম তুলতুলে হাত। রমলার হাতটা এই ক’বছরে কেমন যেন দরকচা মেরে গেছে। ভাবতে না ভাবতেই শুনলেন শুক্লা কীরকম উচ্ছ্বসিত হয়ে বলছে, দারুণ হ্যান্ডসাম কিন্তু আপনি, সুপ্রভাতদা। আনার কথা পীতাম্বল্পের কাছে এত শুনেছি, অথচ এমন যে সুন্দর পুরুষ আপনি তা কিন্তু বলেনি।
সুপ্রভাত তখন বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মেয়েটা কে, তাও বুঝতে পারছে না। তার অবাক অবাক চোখে তাকানো দেখে সেটা অনুমান করে পীতাম্বর তৎক্ষণাৎ তার ভুল শুধরে দিলেন, ওহহো, তোকে বলা হয়নি। তুই তো ডিসিশন নিতে পারলি না। আমি কিন্তু চটপট ডিসিশন নিয়ে নিলাম। এই মাসতিনেক হল শুক্লাকে বিয়ে করেছি।
–বিয়ে! সুপ্রভাত যেন চমকে উঠলেন। পীতাম্বরের বাড়ি তিনি অবশ্য প্রায় ছমাস যাননি, এর মধ্যে তলে-তলে এত ব্যাপার ঘটে গেছে।
পীতাম্বর তখন বলছে, জীবন নতুন ভাবে শুরু করাই ভাল। সবই যখন একে একে বদলে ফেলছি!
হাঁ হয়ে গেলেন সুপ্রভাত, পীতাম্বর বলে কী! এই বয়সে–
—কেন, কত আর বয়স? পঁয়তাল্লিশ। বয়সটা আসলে কোন ফ্যাক্টর নয়। বিদেশে লাইফ স্টার্ট অ্যাট সিক্সটি। আমাদের আরও পনোরো বছর দেরি আছে যাটে পৌঁছুতে। বলা যায় টু-উ ইয়ং’ লাইফ এনজয় করে নেওয়ার এখনই তো সময় আমাদের।
আমাদের কথাটা কানে খটখট করে বাজছিল সুপ্রভাতের। তারও তো পয়তাল্লিশ। কন্ট্রাক্টরির কাজে ব সাত-আট হল বেশ নাম করছে পীতাম্বর। বাড়িখানাও করেছেন তিলা প্রায় ছবির মতো অট্টালিকা। ভেতরে ঢুকলে মনে হয় সিনেমার বাড়ি। বেশ কিছু কাঁচা পয়সা দু’হাতে ওড়াচ্ছেন কিছুদিন। কিন্তু তাই বলে একটা আস্ত বউ।
শুক্লা একপাশে বসে মিটিমিটি হাসছিল। সুপ্রভাতের বিস্ময় দেখে বলল, পীতাম্বর ঠিকই বলেছে, সুপ্রভাবাবু। বয়স ধরে রাখতে হয়। আপনাকে অনায়াসে এখনো বিলো ফর্টি বলে মনে হয়।
খানিকক্ষণ দুজনের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেবার পর মনে হল, এমন মেয়ের সঙ্গ পেলে অনায়াসে বয়স দশ বছর কমে যায়। ওরা চলে যাওয়ার প্র দু-তিনদিন শরীরে মনে একটা আলাদা ফুর্তি পেলেন সুপ্রভাবু। চলনে বলনে গতি বেড়ে গেল অফিসে, বাইব্বে কাজে। কিন্তু ঘরে ফিরতেই কেমন যেন অস্বস্তি! একদিন রমলা হঠাৎ বলে বসল, বেশ আক্রমণের ভঙ্গিতে, তোমার কী হয়েছে বলো তো?
সুপ্রভাত বেশ ঘাবড়ে গেলেন, কী আবার হবে?
অফিসে কোনরকম ঝামেলা পাকিয়েছ মনে হচ্ছে? রমলা তাঁকে ভোলাতে দেখে আরও নিঃসন্দেহ হয়েছে। তাই গলার স্বরে একদম সাঁড়াশি আক্রমণ।
ঝামেলাই বটে, তবে রমলাকে সে কথা তো আর খুলে বলা যায় না, চেপে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, নানা, কিছু তো হয়নি–
রমলা কয়েক মুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকে জরিপ করল, চোখে সেই হেডমিস্ট্রেসের মতো এক্স-রে চাউনি। পনেরো বছরের পুরনো বউ, সুপ্রভাত হা করলে রমলা বুঝতে পারে তিনি হাবড়া বলতে চাইছে। তার চোখকে ফাঁকি দেওয়া ভারী কঠিন ব্যাপার।
রমলা এর আগেও বেশ কয়েকবার সতর্ক করে দিয়েছে তাকে, দেখো, খারাপ। ডিপার্টমেন্টে চাকরি করো, কোন ঝামেলায় না জড়িয়ে পড়ো।
দিন-দুয়েক পরে পীতাম্বর আবার এসে হাজির, কী রে, কেমন দেখলি শুক্লাকে?
সুপ্রভাত ঢোক গিলে বললেন, বেশ ভালই তো
—ভাল মানে–? একদম রাজা করে দিয়েছে আমাকে শুক্লা। বেঁচে থাকা যে এত সুখ তা শুক্লা আমার জীবনে আসার আগে বুঝিনি। পীতাম্বরের যেন আরামে চোখ বুজে আসছে।
সুপ্রভাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেন পীতাম্বরের সুখে আবিষ্ট মুখ। তারপর আমতা-আমতা করে জিজ্ঞাসা করেন, তা কৃষ্ণার কী হল?
কৃষ্ণা মানে আগের বউ। অনায়াসে পীতাম্বর বললেন, কৃষ্ণার বদলেই তো শুক্লা। অমাবস্যার পর যেভাবে পূর্ণিমা আসে। কৃষ্ণাকে ডিভোর্স করে দিলাম। তুইও ডিভোর্স করে দে। দেখবি রমলার বদলে একজন পামেলা আসবে জীবনে।
—ডিভোর্সং সুপ্রভাত লাফিয়ে উঠলেন, তোর মাথা খারাপ? রমলাকে ডিভোর্স করব? মাথার ভেতরে তখন রমলার চোখের রঞ্জনরশ্মি চিরে ফেলছে সুপ্রভাতের ভয়ার্ত মুখ, আমাকে তাহলে আস্ত রাখবে রমলা?
সুপ্রভাতের মুখচোখ দেখে হা হা করে হাসলেন পীতাম্বর, বউকে খুব ভয় পাস মনে হচ্ছে। অবশ্য আমিও পেতাম। তবে যতক্ষণ বউ থাকে ততক্ষণই খাণ্ডারনী। তারপর যেই একটা উকিলের নোটিস ধরিয়ে দিবি অমনি দেখবি জোঁকের মুখ নুন পড়েছ আর রা-টি নেই।
সুপ্রভাত প্রবলভাবে মাথা নাড়ে, ওরে বাব্বা। তুই রমলাকে চিনিসনে তাহলে। একদম কুরুক্ষেত্র বানিয়ে দেবে জীবনটা।
–হে-স্-স্-স্, মুখে এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ করলেন পীতাম্বর, তোর দ্বারা কি হবে না। আমি হচ্ছি ঠেকে-শেখা লোক। তোর চেয়ে ঢের অভিজ্ঞ। তোর আগে আমি বাড়ি করেছি, গাড়ি করেছি। এমনকি তোর আগে বউও। অতএব আমার। কাছেই তোকে শিখতে হবে। জীবনে একটা শুক্লা কি পামেলা এলে জীবন এমন রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে, সেই সুখ তুই কল্পনায়ও আনতে পারবি নে। এমন ফুরফুরে। তুলতুলে শরীর
বাড়ি ফেরার পর সুপ্রভাতের মনে হতে লাগল, পীতাম্বর ঠিকই বলেছে। তার জীবন এখন একেবারে মরুভূমি। সারাক্ষণ রমলা যেন দারোগার মতো ধমকাচ্ছে তাকে। একেই তো মেদ জমে শরীরটা ভারী হয়ে উঠেছে, তার ওপর হাতগুলো কেমন শক্ত-ইট। রাতের বেলা উত্তেজনার আগুন বলতে এখন আর কিছু নেই। অথচ তার কতই বা আর বয়স, মাত্র পঁয়তাল্লিশ। এই বয়সে তার বাবা মাত্র সেজদাকে জন্ম দিয়েছিলেন। তারপরও ছোড়দা, ছোড়দি, আর তিনি নিজে। আর তার মাত্র একটি সন্তান, সে-ও এখন তেরো বছরের। থাকে দার্জিলিঙ কনভেন্টে। কিন্তু ওই ডিভভার্সের ব্যাপারটিই তো ঝামেলার। রমলা এবং ঝামেলা দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক।
