–এখনও বাকি? সুপ্রভাত আগাপাশতলা ভাবলেন, কিন্তু কোন ফাঁকই খুঁজে পেলেন না জীবনে। তারপর হেসে বললেন, হুঁ, এখন চাঁদে যাওয়াটাই বাকি।
–নাহ্, পীতাম্বর মাথা নাড়তে লাগলেন। তোর বউটাও তো বেশ পুরনো হয়ে গেছে।
–বউ? সুপ্রভাত প্রথমটা চমকে গেলেও পরমুহূর্তে হো হো করে হেসে উঠলেন। পীতাম্বর বেশ রসিকতা করতে পারে। বললেন, যা বলেছিস। প্রায় পনেরো বছরের বউ।
পীতাম্বর আবার হাসি-হাসি মুখে বললেন, তোর বউটাও এবার বদলে ফ্যাল, সুপ্রভাত।
—যাহ্, সুপ্রভাত হাসতে লাগলেন, তৎক্ষণাৎ রমলার ফুলো-ফুলো ফর্সা গাল দুটোর কথা মনে ভেসে উঠল। সুখের মুখ দেখার পর থেকে গায়ে আর একটু মেদ জমেছে। বড়লোকদের বউদের যেমন হয়ে থাকে আর কি।
–না রে, সিরিয়াসলি বলছি, পীতাম্বর তার বক্তব্য থেকে একচুলও নড়েন না। নতুন একটা বউ নিয়ে আয় ঘরে, সবসময় পরীর মতো ফুরফুর করে উড়বে, লাইফ আর কালার, ফুল হয়ে যাবে।
—তুই এখন ভাগ তো, সুপ্রভাত যেন চটে ওঠেন, আমাকে এখন একটু বেরুতে হবে।
পীতাম্বর চলে গেল বটে, কিন্তু মাথার ভেতরে একটা ফুরফুরে পরী রেখে গেল। সেদিন বাড়ি ফিরে রমলার দিকে একবার ভয়ে-ভয়ে তাকালেন। রমলা যথারীতি গম্ভীর মুখ করে ঘরদোর গোছাচ্ছে। এত বড় বাড়ি, কিন্তু বাড়ির কাজের লোকদের ওপর যে সব ছেড়ে দিতে পারে না। ওপরতলা নিচতলা মিলিয়ে সব ঘরেই সে নিজে ঘুরে-ঘুরে সাজানো-গোছানোর কাজটা করে থাকে। সুপ্রভাতকে দেখেই মেজাজি স্বরে বলল, গ্যাস কিন্তু ফুরিয়ে গেছে।
সেদিন রাতের বেলা ভারী অস্বস্তি লাগল সুপ্রভাতের। রমলা প্রায় আধখানা বিছানা জুড়ে শুয়ে থাকে। যখন পাশ ফেরে নতুন খাটেও মচমচ শব্দ হয়। বোধহয় খাটটাও ভয় পায় তাকে। সুপ্রভাতের মাথার ভেতরে দু-চারবার ঘাই দিয়ে গেল নীল ডানার একটা চমৎকার পরী। পরীটা তাকে দেখে একবার হাসলও।
কয়েকদিনের মধ্যে কাজের ঝামেলায় অবশ্য ভুলে গেলেন ব্যাপারটা। একটা বিশাল পারচেজ অর্ডার এসেছে, সেটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কমাস ধরে খুব ভাবছেন, কিছু টাকা পেলে একবার স্টেটস ঘুরে আসবেন। রমলা রোজ তিনবার করে শোনাচ্ছে তার কলেজের তিন-নিজন বান্ধবী তাদের হ্যাজব্যান্ডের সঙ্গে কেউ ইউরোপ কেউ আমেরিকা ঘুরে এসেছে। আর তাদের দৌড় এ-পর্যন্ত মাত্র হরিদ্বার মুসৌরি। কাশ্মীরটা পর্যন্ত তারা ঘোরেনি।
স্টেটস-এর কথাই মনে-মনে ভঁজছিলেন সুপ্রভাত। এমন সময়ে হঠাৎ আবার পীতাম্বর। মুখে আগের মতো সেই দুষ্ট হাসি, কিরে, কিছু ঠিক করলি?
–কী ঠিক করব? সুপ্রভাত বিস্মিত হলেন।
–ওই যে, জীবনটা বদলে ফেলা—
—ও, মনে পড়তে সুপ্রভাত খুব হাসতে থাকেন। ও আমার দ্বারা হবে না। এই দ্যাখ, গোঁফে পাক ধরেছে, চুল চারভাগের একভাগ সাদা হয়ে এসেছে।
পীতাম্বর যেন জাঁকিয়ে বসলেন, গোঁফটা ফ্যাক্টরই নয়। একদিন শেভ করতে বসে জম্পেস করে উড়িয়ে দে ওটা। যেমন আমি দিয়েছি।
সুপ্রভাত বিস্মিত হয়ে পীতাম্বরের গোঁফের দিকে তাকালেন। কিছুদিন আগেও পীতাম্বরের নাকের নীচে একটি মিলিটারি গোঁফ ছিল। দু’পাশে মুচড়ে তা দিত মাঝে মাঝে। কেন যে হঠাৎ অমন দশাসই গোঁফ উড়িয়ে দিয়েছে পীতাম্বর, তা এতদিনে মালুম হল।
—আর চুলের কথা বলছিস! এরকম হেয়ার ভিটামিন বেরিয়েছে যে স্বয়ং ভগবানবাবুও বুঝতে পারবেন না, তোর চুল কোনকালে পেকেছিল কিনা।
সুপ্রভাত আবার চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকেন পীতাম্বরের মাথায় ঘনকালো চুলের দিকে। রহস্য ক্রমশ উদঘাটিত হচ্ছে।
কিন্তু এত সবের পরও হঠাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠেন সুপ্রভাত, সে তুই যাই বলিস, আমি জীবন যেটুকু বদলেছি, ব্যস ওই পর্যন্ত। এখন আমি স্টেটস-এ যাবার জন্যে তোড়জোড় করছি।
—তাহলে তো ভালই হল। স্টেটস-এ যেতে হলে সঙ্গে ইয়ং ব্লাড নিয়ে যেতে হয়। দেখবি, একদম স্বর্গ।
সুপ্রভাত ফের ভাগিয়ে দিলেন পীতাম্বরকে, জরুরি কয়েকটা চিঠি লিখতে হবে আমাকে। এখন ওসব ভাবার সময় নেই আমার।
—ভাববি, ভাববি, পীতাম্বর উঠে দাঁড়িয়ে হাসলেন, যখন দেখবি চারপাশে ঘুরঘুর করছে একটা পরীর মতো মেয়ে। বয়সটা একদমকায় দশ-পনেরো বছদ্র কমে গেছে। জীবন আবার প্রথম যৌবনের মতো রঙিন হয়ে উঠেছে, তখন ঠিক ভাববি
সুপ্রভাত ভারী অস্বস্তিতে পড়লেন। যতবার অন্য কথা ভেবে অন্যমনস্ক হতে চাইলেন, তবার একটি ফুরফুরে চড়ুই ঘুরঘুর করতে লাগল তার মনের মধ্যে। বাড়ি ফেরার পর রমলার সঙ্গে যখন চা খেতে লাগলেন, রমলার কথায় দু’চারবার বিষম। খেয়ে ফেললেন খামোখা। রমলা ভুরু কুঁচকে বলল, কী হয়েছে তোমার? আমার কথা কানে যাচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে।
সুপ্রভাত পুনর্বার বিষম খেয়ে বললেন, কেন, কেন, শুনছি তো–
–শেষ কথাটা কী বলেছি বলো তো?
—কেন, ওই যে গয়না কিনবে বলছিলে–
রমলা চায়ের কাপ ধুপ করে সেন্টার-টেবিলে ফেলে পায়ে শব্দ করে উঠে গেল সেখান থেকে। আসলে সে তখন বলছিল, পাশের বাড়ির লাবণ্য নতুন একসেট জড়োয়া-গয়না আনাচ্ছে সেই বোম্বাই থেকে।
এরই মধ্যে আবার একদিন হুট করে পীতাম্বর হাজির হলেন অফিসে, কিন্তু এবার তিনি একা নন, সঙ্গে এক তরুণী। তরুণী রীতিমত সুন্দরী। পীতাম্বর এসে কোন ভণিতা না করেই বললেন, শুক্লা, মিট সুপ্রভাত। আমার ছোটবেলার বন্ধু। হাফপ্যান্ট পরার বয়সে একসঙ্গে ফুটপাতে ক্রিকেট খেলতাম।
