শ্রীকান্তর শরীরটা তেমন আর নড়াচড়া করছিল না। নেশায় চুর। চোখ মুখের ঘোরও অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। বেঘোরে ঘুমোচ্ছিল। কানা বাগদির বউ অনেক টানাটানি করে তার শরীরের খানিকটা অংশ চেটাইয়ে রাখতে পারলো। মাথায় তেলচিটে পাতলা শক্ত বালিশটা থান হঁটের মতো কোনো রকমে ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু শ্রীকান্ত ঠাকুরপোর ঘুম, সে আর ভাঙাতে পারল না রাত পর্যন্ত। তখন সত্যিই ভয় পেল। বাড়ির লোক বলতে সুষমা আর লীলা খবর পেয়েই ছুটলো কানা বাগদির ভাটিখানায়।
শ্রীকান্তর বডি কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল। কানা বাগদির ঘরের পাশে ঝোঁপের মধ্যে পচা গুড়ের কলসি নিশাদলে তখনও ফুটছিল। কানাকানি হয়ে গেছে পাড়ায়। লীলার বাবার অবস্থা খারাপ। মদে বিষক্রিয়া হয়ে গেছে। হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এতরাতে গাঁয়ে ডাক্তার পাওয়া যাবে কোথায়। অগত্যা বাঁশের খালি করেই কয়েকজন ছেলে ছোঁকরা তাকে নিয়ে গেল হেলথসেন্টারে।
হেলথসেন্টারের বড় ডাক্তার শ্রীকান্ত্র নাড়ী ধরে বলল, হয়ে গেছে। ওর বডি বাড়িতে নিয়েই চলে যান। লীলা ককিয়ে কেঁদে ওঠে বাপের বুকে আছাড় খেয়ে পড়লো। সুতো কাটা ঘুড়ি গোৎ খেয়ে পড়ে যেভাবে, ঠিক সেইভাবে। উবু হয়ে বসেছিল সুষমা পাথরের মতো ছোটো ছেলেকে বুকে আগলে ধরে। শ্মশানের বন্ধুরা এসে গিয়েছে প্রধানের জ্বালিয়ে দেবার সার্টিফিকেট নিয়ে। তারা খাটুলি তুললো। বল হরি, হরি বল। বল হরি, হরি বল। বল হরি, হরি বল। শ্রীকান্ত নস্করের মরদেহ চোখের আড়ালে চলে গেল। লীলা ককিয়ে কেঁদে উঠল, ‘বাবা তোমার মনে এই ছিল’ সুষমা পাথরের মত নির্বাক, চোখে মুখে শোকে ছল ছল করছিল যন্ত্রণার ভয়াবহ অশ্রু। তখনও শোনা যাচ্ছিল বল, হরি, হরি বল। চারিদিকে তখন ঘোর অন্ধকার। গাঁয়ের মাটির রাস্তার মোড়ে কুকুরগুলো তারস্বরে চিৎকার করছিল, না কাঁদছিল কে জানে।
বুমেরাং – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
পারচেজ ডিপার্টমেন্টের টেণ্ডারগুলো পাওয়ার পর থেকে এই বছর তিনেক একটু সুখের মুখ দেখেছেন সুপ্রভাতবাবু। প্রথমেই ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট টিভি-টা ফেলে দিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন একটা কালার। কালার না থাকলে সবাই কেমন গরিবি-গরিবি চোখে তাকায়। তারপর রমলা কয়েকদিন ‘ফ্রিজ নেই, ফ্রিজ না থাকলে আজকাল কোন সংসার কি চলে?’—গম্ভীর মুখে কথাগুলো দু-চারবার বলতেই ঘরে চলে এল একটা একশো পঁয়ষট্টি লিটার। হালকা নীল রঙ। কিন্তু হালকা নীলের পাশাপাশি ঘরের পুরনো পর্দাগুলো কেমন ম্যাড়মেড়ে দেখাচ্ছে। সেগুলো ফেলে দিয়ে ঘরে চলে এল আকাশী রঙের নতুন পর্দা, তার মধ্যে আবার ঝরনা ডিজাইন। রমলা তখন ভুরু কুঁচকে বলল, দূর, এমন সুন্দর পর্দার সঙ্গে ঘরে ডিসটেম্পার না করলে কি মানায়? শিপ্রাদের ড্রইংরুমটা দেখেছো? যা দারুণ না— এমন করে বললো যে তৎক্ষণাৎ তিনটে ঘরই ডিসটেম্পারের ব্যবস্থা করে ফেললেন সুপ্রভাতবাবু। তারপর মনে হল ঘরের মেঝে মোজাইক না করে দেওয়াল ডিসটেম্পার করানোটা ভারি মুখামির পরিচয় দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দুর্দান্ত ডিজাইনের টাইলস দিয়ে বাঁধানো হল ঘরের মেঝে।
কিন্তু এতসব করার পরও বাড়িটা ঠিক পছন্দ হচ্ছে না যেন! সেই কবে তার বাবা বাড়িটা তৈরি করেছিলেন মান্ধাতার প্যাটার্নে। সুতরাং বছর দুয়েকের মধ্যে নতুন ডিজাইনার ডেকে গোটা বাড়িটাই বদলে ফেললেন একেবারে। চারপাশ দিয়ে পিলার তুলে সোজা দোতলা। বাইরে হালকা বিস্কুট রঙ দিয়ে ডিজাইনারের নির্দেশমত ডিপ ম্যাজেন্টা রঙের কিছু নকশা, আর ছোটবড় কয়েকটা ভার্টিকাল লাইন টেনে দিতে একদম ছবি। দেখে দেখে চোখের পলক আর পড়ে না। রমলার এমনিতে ভারী গম্ভীর, সব সময় হেডমিস্ট্রেসের মতো মুখ, বু তারও টেয়ো উপচে ঝকমক করতে লাগল হাসির ঝিলিক।
পুরনো বন্ধু পীতাম্বর এসে বললেন, একতলা আর দোতলার কী তফাত। আমি তো ভুল করে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিলাম। খোলনলচে একদম বদলে গেছে।
অবশ্য বাড়িটা করার পেছনে পীতাম্বরের অবদান অনেক। তিনি-ই মোজাইকের ডিজাইন, বাথরুমের জাপানি টাইলস, গিজার, জলের পাম্প সবই যোগাড় করে এনে দিয়েছেন, এখান-ওখান থেকে। বোধহয় একটু সস্তায়ও। তারপর বললেন, এবার একটা গাড়ি কিনে ফ্যাল।
খালি গ্যারেজটায় বেশ কিছুদিন ধরে সুপ্রভাতের পুরনো মোটর সাইকেলটা রক্ষিত হচ্ছিল। সেটাও প্রায় ফেলে দেওয়ার মতো বিক্রি করে দিল জলের দরে। তার বদলে গ্যারাজ আলো করে চলে এল একটা চকোলেট রঙের ঝকঝকে মারুতি ভ্যান। কিন্তু এত কিছুর পরও রেহাই দিল না পীতাম্বর। একদিন গিয়ে দেখল তখনও ড্রইংরুমে পুরনো রেকর্ড-প্লেয়ারটা রয়ে গেছে। সেটা বাতিল করে তৎক্ষণাৎ ঘরে নিয়ে এল নতুন ভি সি আর।
গোটা বাড়িটা প্রায় জমজম করতে লাগল। তিন বছর আগের সুপ্রভাত আর তিন বছর পরের সুপ্রভাতে একদম মিল নেই। বদলে গেছে গোটা লাইফ-স্টাইলই।
বুও একদিন পীতাম্বর এসে হাজিল হলেন সুপ্রভাতের অফিসে, কী রে? কেমন লাগছে।
–দারুণ, দারুণ। সুপ্রভাতের চোখমুখ থেকে উপছে পড়তে লাগল সাফল্যের হাসি। সবই এখন নতুন। এমনকি ব্যবসার কল্যাণে তার এই ছোট অফিসটাও নতুন করে সাজিয়েছেন।
পীতাম্বর এবার কৌতুক-কৌতুক মুখে গভীর করে তাকালেন সুপ্রভাতের দিকে, উঁহু, সব এখনও নতুন হয়নি। বাকি আছে একটা।
