কিন্তু এ তো সে চায়নি!
কুণালকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে ফিরে পেতে চেয়েছে, আঁধার নয়, আলোর দিকে যেতে সে চায়। কিন্তু দিনের পর দিন যাচ্ছে–সুমুখে নৈরাশ্য ছাড়া কিছু তো সে দেখতে পাচ্ছে না!
নিজের অবস্থার কথা ভেবে শিউরে ওঠে কাজরী। তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে তার দেহ-মন–কুণালের মৃত প্রায় চেতনার দিবারাত্রির সান্নিধ্য তার সমস্ত সত্তাকে যেন হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে।
অথচ সে তো বাঁচতে চায়।
সে দিন গভীর রাত্রে বিছানা থেকে উঠে এসে লেখবার টেবিলে আলো জ্বালিয়ে ডক্টর মুখার্জিকে চিঠি লিখতে বসল কাজরী।
ডক্টর মুখার্জিকে সে লিখল, কুণালকে উপযুক্ত ক্লিনিকে ভর্তি করবার ব্যবস্থা তিনি যেন করে দেন।
চিঠি লেখা শেষ হতেই মৃদু আহ্বান কাজরীর কানে এল।
কাজরী!
সুদীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সে কান পেতে আছে এ আহ্বানের জন্য। ভুল শোনেনি তো সে?
কাজরী!
আবার স্পষ্ট শুনতে পেল কাজরী। ভুল শোনেনি, কুণালই ডাকছে তাকে।
কাজরীর বুকের রক্তস্রোত উদ্দাম হয়ে ওঠে।
টেবিল-ল্যাম্পের স্বল্পায়তন আলোকবৃত্তের বাইরে গাঢ় ছায়ার মধ্যে বিছানার আদলটুকুই শুধু চোখে পড়ে। কুণালকে সে দেখতে পাচ্ছিল না।
তাড়াতাড়ি খাটের কাছে এগিয়ে এল কাজরী। তার হাত পা কাঁপছে। কোনমতে বেড-সুইচটা টিপে কুণালের শিয়রে এসে দাঁড়াল সে।
নীলাভ আলোয় কুণালের উন্মীলিত চোখ দুটি দেখতে পেল কাজরী। পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আলো প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে তার চোখের তারায়।
কুণালের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে কাজরী ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠে, এই যে আমি, তোমার কাজরী। চেয়ে দেখ কুণাল!
কাজরীর চোখে চোখ রাখল কুণাল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপর ধীরে ধীরে আবার তার চোখ দুটি থেকে সব আলো নিবে গেল। আবার অর্থহীন শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে।
দু হাত দিয়ে ব্যাকুলভাবে কুণালকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাজরী। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে বলে, আমাকে চিনে যাও কুণাল। আর কিছু চাই নে—শুধু আমাকে চিনে যাও।
কুণাল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। কাজরীর বুকফাটা কান্না তার অসাড় চেনায় শুধু নিষ্ফল মাথা কোটে।
বেড সুইচ নিবিয়ে লেখবার টেবিলে আবার এল কাজরী। ডক্টর মুখার্জিকে লেখা চিঠিখানা তুলে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিল সে।
আজীবন দিন-রাত্রি – জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত
রবিকে বাসায় নিয়ে আসার জন্যে আমি স্টেশনে যাচ্ছিলাম।
রীণা বললো, আর একবার ভেবে দেখলে হতো না?
.
তার স্বর এতে নিরুত্তাপ, নির্লিপ্ত যে জবাব দিতে সময় নিতে হলো। আর মুখেও কোনো রেখা নেই। আমি বললাম, ভেবে দেখার সময় নেই রীণা। ট্রেন আসবে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে। আমার স্টেশনে যাওয়া উচিত। আর—। কথা শেষ করার আগে আবার ভেবে নিলাম, আর দেখো, রীণা, আরও অনেক দিন কাটাতে হবে, এমনি করে কেউ বাঁচে না।
ঘর ছেড়ে বেরুনোর মুখে বললাম, স্ব কিছু সহজ করে নাও।
আগের মতো গাঢ় আলিঙ্গনে আর তাকে ধরা যাবে না জানতাম। তবু প্রফু মুখে তার হাতে ঝাকুনী দিয়ে বললাম, কি রবি, কেমন আছো? গাড়ীতে ঘুম হয়েছিলো তো?
রবি অবাক হবার ভাণ করছিলো, আরে মনি, তুমি কি দারুণ ভদ্র হয়ে গেছে।
আমি চাইছিলাম, এই কষ্টকর ব্যাপারটা যাতে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। জোর দিয়ে বললাম, বিয়ে করলে বাই কিছুটা পালটায়। তুমিও তো কিছু কম পালটে যাওনি।
যদি সে আমার ইচ্ছা বুঝতো, যদি সে প্রশ্ন করতো, রীণা কেমন আছে, আমাকে ভালোবাসে কি না, তার কথা মনে রেখেছে কি না তাহলে কি হতো বলা যায় না, হয়তো সহজে বেড়াগুলো পার হয়ে আসা যেত। কিন্তু আমরা কেউ তা করি না। আমরা অনেককাল বাঁচতে চাই।
রবি আমার ইচ্ছেয় সাড়া দিলো না। খানিক ইতস্তত করে বললো, আমার চিঠি পেয়েছিলে তো। কোন হোটেলে।
তার দিকে তাকিয়ে বললাম, হোটেল এখনো কিছু ঠিক করিনি। এখন বাসায় চলো। আগে এলেও তো আমার বাসায়ই উঠতে। তার ঠোঁট একবার দু’বার নড়তে চাইলো দেখে আমি আর স্কুটার নিলাম না। শব্দে কারো কোনো কথা শোনা যাবে না।
রিক্সায় উঠে আমার চাকরির কথা, পুরনো বন্ধু, যারা এখানে আছে, তাদের কথা জিজ্ঞাসা করলো রবি।
বাড়ী তখনো কিছুদূরে। রবি আমার দিকে চাইলো, মনি, আমি তোমার মতো নই, তুমি জানো, কিছু ভেবো না, আমাকে নিয়ে যাবে, রীণার আপত্তি হবে না তো?
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, প্রথমেই জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিলো। আমরা তিনজন লোক। আমি, তুমি, রীণা। কিছু কিছু জায়গা ছেড়ে দিলে বোধ হয় সকলেরই চলে যাবে। রীণা জানে তুমি আসছো, তোমাকে বাসায় নিয়ে যাবো তাকে বলেছি। তবু, রীণা স্ত্রীলোক, তুমি কিছু মনে করো না।
রবি হেসে বললো, পাগল।
.
হাত-মুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে বসলে চাকরের হাতে চা-খাবার পাঠিয়ে দিলো রীণা। আমি জানতাম, সে সামনে আসবে না। সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করার ক্ষমতা আদৌ তাৎক্ষণিক নয়। ব্যক্তিবিশেষে তার পার্থক্যও স্বীকৃত।
আমি পারতাম আরো দ্রুত সব কিছু সহজ করার চেষ্টা করতে। কিন্তু সে সব ফিল্মী কায়দা স্থায়ী হয় না। আমি রীণার হাত ধরে টেনে এই ঘরে এনে বলতে পারতাম, রবি, এই যে রীণা, এতোকাল যাকে চিনেছো সেই রীণা নয়, আমার স্ত্রী রীণা, বলতে পারতাম, অনর্থক তোমরা অপরিচিতের ভাণ করো না। স্মৃতি যে মানুষের কি সম্পদ আমরা সবাই জানি।
