শিবনাথ বললো, এসে পড়েছ?
সুলতা তখনো হাঁফাচ্ছে।–উঃ, কী নির্জন রাস্তা। এত ভয় করছিলো একলা একলা। কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ?
শিবনাথ বললো, এমনি এগুচ্ছিলাম। জানি তুমি এ পথেই ফিরবে। তবে ভয়ের কিছু নেই।
সুলতা হাত ধরলো শিবনাথের। শিবনাথ বললো, এস এই গাছতলাটায় বসি।
ওরা বসলো। রাস্তাটা একটু জেগেছিলো। আবার যেন পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো। একেবারে নিঃশব্দ, শুধু ঝিঝির ডাক। কুয়াশা ঘনাতে লাগলো।
তারপরে দুদিন শিবনাথ অনেক দূর-দূরান্তে বেড়ালো পায়ে হেঁটে। তৃতীয় দিন ঘোষণা করলো, বিছানাপত্র বাঁধা যাক।
–এর মধ্যেই?
—আর কি, পরশু তো যেতে হবে।
—তা বলে এখুনি বিছানা বাঁধতে হবে।
—ওই আর কি কথার কথা বললুম। আর কি, পুরনো লাগছে দার্জিলিং।
তোমাদের সবই তাড়াতাড়ি পুরনো লেগে যায়। একদিন তো ভালো করে কাঞ্চনজঙ্ঘাও
সে তো কাঞ্চনঝঙঘার মর্জি।
একথা হচ্ছিলো রাত্রে। পরদিন সুলতার চিৎকার ও দাপাদাপিতে ঘুম ভাঙলো শিবনাথের। গা থেকে লেপটা খুলে নিলো সে।
শিবনাথ বললো, কী হয়েছে?
সুলতা জানলার দিকে দেখিয়ে বললো, দেখ দেখ, আজ একটু দেখ।
শিবনাথ দেখলো, সুনীল আকাশের বুকে রুপোর মুকুট মাথায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। ধূসর রক্তাভ তার মুখের রেখা। গরাদহীন জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সে আরো দেখলো, উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় অর্ধচন্দ্রাকারে তুষার ধবল হাসি গলে গলে পড়ছে নীল আকাশে। আর ভুটিয়া বস্তি থেকে ভেসে আসছে ব্যাগপাইপের বিচিত্র এক আদিম পাহাড়ী রাগিণী। বস্তিতে আজ দলা পাকানো জটলা নেই, ঝর্ণার মতো চলমান। ছেলেমেয়েরা দৌড়ে চীৎকার করে বেড়াচ্ছে।
নীল আকাশ, তুষার শৃঙ্গের উদয়, ঝকঝকে রোদ আজ যেন কিসের উৎসব লাগিয়ে দিয়েছে পাহাড়ে। শুধু বাইরের নয়, পাহাড়ের ঘরের মানুষেরাও যেন আজ আমন্ত্রিত।
সুলতা ছুটে গেল দরজার কাছে। থেমে বললো, আমি যাচ্ছি বাইরে, তুমি এস।
চলে গেলও। শিবনাথ বসতে যাচ্ছিলো, পারলো না। হাত মুখ ধুতে হলো তাকে। চা খেয়ে জামা চাপাতে হলো। ম্যালে এসে উঠলো সে। চেনা বেঞ্চিটার দিকে তাকিয়ে দেখলো। লীলা নেই, স্বামী আছেন। কিন্তু আজ বসে নেই। উত্তরে দক্ষিণে পায়চারি করছেন অলেস্টার পরে।
সুলতা ছুটে এলো কোত্থেকে। বললো, তুমি কোথাও যাবে।
—তুমি যাবে?
–না। আমি বসে বসে খালি দেখব। আজ হয়তো আর কাঞ্চনজঙ্ঘা ঢাকবে না, না?
—বোধ হয়। তুমি তবে বস, আমি একটা চক্কর দিয়ে আসি।
শিবনাথ ভুটিয়া বস্তিরই পাশ দিয়ে, নেমে চললো বার্চ হিল রোডের সর্পিল ঢালুতে। যে-পথে চললে, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সঙ্গী বলে মনে হবে। আজ বুঝি কোন্ ভুটিয়া জোয়ান সকাল থেকেই মাতাল হয়ে গেছে। কিংবা কোনো ধর্মীয় উৎসব আছে। ব্যাগপাইপটা নামবে না ওর মুখ থেকে আজ। তুষার শৃঙ্গে পাঠাবে ওর সুর।
বাৰ্চহিল রোডের একটা সীমান্ত, গভর্ণরের বাড়ির পশ্চিম দরজার কাছে এসে উঠলো শিবনাথ। সামনেই অবজারভেটারি পাশেই উত্তর দিকের নির্জন রাস্তাটা।
উত্তর দিকে নির্জন রাস্তাটায় বেঁকে গিয়ে দাঁড়ালো সে। লীলা। লীলা দক্ষিণের পথ দিয়ে এসে উত্তরের বাঁকে থমকে দাঁড়ালো। দাঁড়ালো পিছন ফিরে তাকালো একবার। তারপর শিবনাথের কয়েক হাত দূর দিয়ে, উত্তরের ঘুমন্ত রাস্তাটাকে জাগিয়ে দিলো।
যেন পথরোধ হলো শিবনাথের। সে দাঁড়িয়ে রইলো তেমনি। লীলা চলেছে ধীরে, অতি ধীরে। অনেকক্ষণ পর পর তার ছোট হিলের একটি একটি শব্দ, যেন একটু একটু করে ঘুম ভাঙাচ্ছে রাস্তাটার। শিবনাথ দু’পা সরে, রাস্তার রেলিংটা চেপে ধরলো। লীলাও দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে উত্তরদিকে ফিরে সেও রেলিংটা ধরলো। একই রেলিং, পনের হাত দূরে। শিবনাথের মনে হলো লীলার হাতটা যেন তারই হাতের ওপর এসে পড়লো।
কে একটি লোক চলে গেল আপন মনে। উত্তরে বাৰ্চহিল রোডের পাড়াগুলি নেমে গেছে নিচে। রোদে চক করছে লেবং-এর সমতল। আর গোটা আকাশব্যাপী তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার বিস্তৃত বাহু। লাল, নীল, সবুজ বুনো ফুলের ছড়াছড়ি ঘাসে গাসে। পাথারে পাথারে পাথরের গোলাপেরা রোদে চলকাচ্ছে। সবুজসোনা গলে পড়ছে দেবদারুর পাতায় পাতায়। প্রজাপতিরা হারিয়ে যাচ্ছে ফুলের রঙে রঙে। বাতাস বইছে। পাতা ঝরছে দু একটি। আর পাগলা ভুটিয়াটার ব্যাগপাইপের আদিম সুর থামবে না।
এত আয়োজন কি আজই হলো। কি করবে শিবনাথ? তার মনে হলো তার পিঞ্জরাবদ্ধ বোবা অনুভূতিটারই এতো প্রকাশ সমারোহ। তাই ওর বুকের রক্তধারা যেন নাচতে লাগলো। ফিরে তাকালো লীলার দিকে। দেখলো, লীলা, ঠিক ওর দিকে নয়, ওরই দেহের সীমায় তাকিয়ে আছে। ওর শ্যামচিকন মুখে রোদ লেগে কচি পাতার মতো দেখাচ্ছে। আয়ত চোখ দুটিতে রৌদ্রচকিত তুষারশৃঙ্গের ছায়া।
শিবনাথ রেলিং ধরে ধরে কয়েক পা এগিয়ে গেল। লীলা চোখ তুললো। তুলে, হাসল সলজ্জভাবে।
শিবনাথ অনেক কষ্টে বললো, আপনার স্বামী ভালো আছেন?
—আছেন।
লীলা বললো নিচু গলায়। কপাল থেকে তুলে দিলো কয়েক গোছা রুক্ষ চুল। বললো, আপনার স্ত্রীকে নিয়ে বেরোন না কেন?
শিবনাথ বললো, ও উঁচু নিচু করতে পারে না।
একটু চুপ। আবার বললো, আপনার স্বামীর কি শরীর ভালো নেই?
লীলার স্বাভাবিক রক্তাভ ঠোঁটে অতি সাধারণ হাসি একটি অসাধারণ মায়ায় উজ্জ্বল। বললো, না। ওঁর ধারণা, ওর শরীর মোটেই ভালো নেই। দিনরাত্রি ফার্মের ব্যবসার হিসেবে সব সময় টায়ার্ড থাকেন।
