তাই সুলতা ম্যালে বেড়ায়, বসে থাকে। শিবনাথ তাকে বুড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘুরে বেড়ায় অরণ্যে, খাদে, ঢালুতে পাহাড়ী জনপদে।
আর শিবনাথ দেখেছে, ওরাও এসেছে। ও আর ওর স্বামী। ও কেন, নামটাই বলা যাক। লীলা আর ওর স্বামী। লীলার স্বামীও বসে থাকেন ম্যালের বেঞ্চে। শান্ত, চিন্তিত। মোটা লেন্সের চশমায় একটা ঝকঝকে তীক্ষ্ণতা নিয়ে চারদিকে তাকান। বোধহয় ভদ্রলোক অসুস্থ। হেঁটে ফিরে বেড়াবার উপায় নেই হয়তো। তাই তন্ময় হয়ে দেখেন চারদিক। লীলা যেন পা টিপে টিপে কাছে কাছেই ঘোরাফেরা করে। তার বুড়ি ছোঁয়া দৌড়ের পাল্লা বেশী দূর নয়। অবজারভেটারির একটু এপাশে, নয়তো একটু ওপাশে। ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরীর কাছাকাছি, নয়তো দেশবন্ধুর স্মৃতি-মন্দিরটার সীমানায়। এদিকে শহর আর হ্যাপিভ্যালীর সীমানায় চোখ যায়। ওদিকে ভুটিয়া বস্তি আর সর্পিল পক্ষের পাকে জড়ানো লেবং।
ফিরে আসে আবার। মুখখামুখি হয় স্বামীর। দু’জনেই হাসেন। তারপর ভদ্রলোকের প্রসারিত হাতটা লীলাকে অনেক দূর যাবার নিশানা দেখিয়ে, তার জন্য নিশ্চিন্ত থাকতে বলেন।
লীলা হেসে তাকায় সেই দূরের দিকে। পায়ে পায়ে এগোয়। টিপে টিপে, আস্তে আস্তে, সভয়ে। যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে, সেই ভয়ংকর পায়ের শব্দ তার কানে যায়। সেই শব্দ পায় সে, সন্ত্রস্ত হৃৎপিণ্ডের তালে। কিংবা হয়তো, শিবনাথই শুধু এমনটা ভাবে। লীলা কিছুই ভাবে না।
শিবনাথ জানে, লীলা টের পেয়েছে তার উপস্থিতি। শুধু উপস্থিত নয়, শিবনাথের সঙ্গে তার সহসা দৃষ্টিবিনিময় হয়েছে দু একবার। লীলা তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়েছে। শিবনাথও চোখ ফিরিয়েছে। লীলা ওর আয়ত চোখ তুলে, ঈষৎ স্কুল ঠোঁটে বিচিত্র হেসে কী বিচিত্র কথা না জানি বলেছে তখন স্বামীকে।
সুলতা তখন শুধু ধমকেছে হয়তো শিবনাথকে, কী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যালের শো-কেস দেখছো? কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। আচ্ছা চলো, আমি গভর্ণর হাউস পর্যন্ত হেঁটে আসি। ও রাস্তা তো উঁচু নিচু নয়।
আশ্চর্য। লীলাকে আর চিনতেও পরে না সুলতা।
শিবনাথ চলে যায় সুলতার সঙ্গে। হয়তো গভর্ণর হাউস পর্যন্ত। কিংবা সিনেমা হল অবধি।
তারপর সুলতা ফিরে যায়। শিবনাথ চলে যায় দূরে। কোনো পাহাড়ে, চা বাগানে কিংবা শহরেরই অলিতে গলিতে।
এর মধ্যে এরা গাড়িতে ঘুম মনারিতে গেছে, দেখে এসেছে লেবং-এর ছোট্টা মালভূমিকে। আর পাঁচদিনের মেয়াদ আছে ওদের তারপরে নেমে যেতে হবে।
কিন্তু অনুভূতির পিঞ্জরে বোবাটার দাপানি গেল না। মুখও খুলল না। কী একটা ব্যক্ত করার আকাঙক্ষা রয়ে গেল। কেউ ধরে রাখে নি, বেঁধেও রাখে নি এমনি একটা ছুতো তবু খেলা, খাওয়া, বেড়ানো আর পাহাড়ী জনপদের পায়ের তলায় রইলো পড়ে।
বিছানা ছেড়ে উঠলো শিবনাথ। দাড়ি কামালো আগে। ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে খেয়ে, জানলায় উঁকি দিলো। গড়িয়ে গড়িয়ে এঁকেবেঁকে নেমেছে ভুটিয়া বস্তি। কোথাও কতকগুলো বিচিত্রবেশিনী মেয়ের দল, কোথাও কতগুলো বিচিত্রবেশ পুরুষের ঝিমুনো জটলা। লোক নামে, লোক ওঠে, পায়ে পায়ে খেলে বেড়াচ্ছে বাচ্চারা। গাছে মাথা পেরিয়ে লেবং-এর সামান্য সমতল উঁকি দিচ্ছে।
চপ্পল পরে, সার্জের পাঞ্জাবিটা চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লো শিবনাথ। পাঁচ মিনিটেই ম্যাল। মরশুমী ফুলের মতো আগন্তুক জনতার ভিড়। ভিড় করেছে পাহাড়ীরা। ওরাও গালে হাত দিয়ে এই সমতলবাসী মানুষদের দেখতে থাকে।
কী দেখে, কে জানে!
-এই যে!
সুলতার চড়া গলা ভেসে এলো দূরের বেঞ্চি থেকে। সেই ডাকে অনেকেই ফিরে তাকালো ওদের দুজনের দিকে।
সুলতাই এগিয়ে এলো তাড়াতাড়ি। বললো, উঃ, অপেক্ষা করে করে আর পারিনে। নিশ্চয় ঘুমোচ্ছিলে আবার।
শিবনাথ বললো, একটুখানি।
–কুম্ভকর্ণ কোথাকার!
তারপরেই বললো, আচ্ছা, তুমি তো একদিনও ঘোড়ায় চাপলে না?
—আমি?
হো হো করে হেসে উঠলো শিবনাথ। আর ওর হাস্কি শব্দে চমকেই বুঝি লীলা ফিরে তাকালো। চোখাচোখি হয়ে গেল দু’জনের। কিনাথ দেখলো, লীলা তার স্বামীর পাশে বসে। ওর স্বামীর ঘাড়ের পাশ দিয়ে, মুখটা একেবারে উল্টোদিকে ঘুরিয়েছে।
—না সত্যি, তুমি একবার ঘোড়ায় চাপ না?
—আমার ভয় করে। তুমি চাপবে তো বলো।
সুলতা বললো, অসভ্য!
—অসভ্য কেন? কত মেয়েরা তো চাপে।
–বাব্বা আমি মরেই যাব।
অতএব ইতি। শিবনাথ বললো, আজ তুমি অবজারভেটরি রাউন্ড দিয়ে এস, আমি বসি।
সুলতা বললো, প্যাচার মতো?
—প্যাচার মতো কেন? আমি ততক্ষণ খবরের কাগজটা পড়ি।
—বেশ।
সুলতা সত্যি হাঁটতে আরম্ভ করলো। শিবনাথ ফিরতে গিয়ে দেখলো, লীলা উঠে দাঁড়িয়েছে। শিবনাথ ফোয়ারাটা পর্যন্ত গেল। আবার ফিরলো। দেখলো লীলা সুলতার পথটাই ধরেছে।
শিবনাথ দোকানে গিয়ে একটা বাসি খবরের কাগজ কিনলো। মুড়ে রাখলো পকেটে। এলোমেলোভাবে। ছবি দেখলো শো-কেসে, তারপর আবার এলো ম্যালের সমতলে। লীলা নেই। কিন্তু ও পথে পা বাড়াতে তার ভয় করতে লাগলো। সে অবজারভেটরির উত্তরদিকের পথটা ধরে হাঁটতে লাগলো। এ পাথরের পটার ওপিঠেই, সুলতা আর লীলার অস্তিত্বটা সে যেন টের পাচ্ছে। ঘুরে এলো, ওরা এ পথেই আসবে।
শিনাথ এগুতে লাগলো। কতক্ষণ এগিয়েছে, খেয়াল নেই। সহসা দূরে একটি লালের ইশারা পেয়ে থেমে গেলো সে। লীলার গায়ে একটা লাল স্কার্ফ ছিলো না? ছিলো। কিন্তু সামনের লালটা সুলতার লাল ক্লোক। তারই হাই হিলের ঘায়ে চকিত হচ্ছে—এই নির্জন পাহাড়ের গা।
