কে দু’জন লোক চলে গেল দুদিকে। ওরা দু’জনে তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে। শুকনো পাতা পড়লো খসে একটা। দু’জনেই পাতাটার দিকে তাকিয়েছিলো। চোখাচোখি হলো আবার। হাসলো দু’জনই। শিবনাথ আরো এগিয়ে এলো কাছে। বললো, দেখুন সেদিন সেই বালির ঝড়ে–
লীলাও বলে উঠলো, আমিও সেই কথা বলবো ভাবছিলুম, বালির ঝড়—
শিবনাথ প্রায় ফিফি করে বললো, বলুন।
লীলার দু’চোখে যেন সহসা একটি নতুন হাসি লজ্জায় ঝিলিক দিয়ে উঠলো। বললো, কী আর বলবো। বালির ঝড় বলেই এমন হয়েছিলো নিশ্চয়।
—তাতে আপনার মনে কোনো গ্লানি–?
শিবনাথ কথাটা শেষ করতে পারলো না। উগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলো লীলার নত মুখের দিকে। রেলিং-এ আঙুল ঘষতে গিয়ে লীলার সোনার বালাটা লোহায় লেগে বাজতে লাগলো ঠুনঠু করে।
মাথা নিচু করেই ঘাড় নেড়ে বললো, নেই। আপনার?
লীলা তাকালো শিবনাথের দিকে। শিবনাথের মুখে সেই বোব অসহায় অনুভূতিটা যেন ফিরে এলো। পরমুহূর্তেই নিশ্বাস ফেলে বললো, আপনার গ্লানি না থাকার আনন্দটাই আমার ভাগে রয়েছে।
লীলা তাড়াতাড়ি চোখ নামালো। অস্ফুটে বললো, কী বিচিত্র! আবার চোখ তুললো। তারপর দুজনেই হেসে ফেললো। বালির ঝড়ের ঝাপসা বোবা কথাগুলি যেন বিশ্বের ওই সকল আলোর মাঝখানে হাসির ছটায় ঝলকে উঠলো। পাতা হাসছে, ফুল হাসছে, কনক কিরীট মাথায় কাঞ্চনজঙঘাও হাসছে। ওই আদিম বাঁশটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটা হাসিরই উচ্ছ্বাস যেন সুর হয়ে ভাসছে।
আর হাসি দিয়ে এই শেষ কথার পর, বরফলেহী বাতাস যেন সহসা ব্যাকুল হয়ে উঠলো। ব্যাকুল বাতাসে ওরা আবার চুপ করে অনেকক্ষণ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইলো। আরো অনেক ক’টা পাতা ঝরলো। বাঁশীটা বাজতে লাগলো। কাঞ্চনজঙ্ঘা আজ কিছুতেই বিদায় নিচ্ছে না।
তারপরে আবার ওরা দু’জনে চোখাচোখি করে হাসলো। লীলা বললো, যাই এবারে।।
শিবনাথ বললো, আসুন।
লীলা চলে গেল রাস্তাটার ঘুম ভাঙাতে ভাঙাতে। শিবনাথ আবার নেমে গেলো বাৰ্চহিল রোডে, যে-পথে এসেছিলো। দূরের উঁচুতে একবার যেন দেখা গেল লীলাকে। তারপরেই ঘন জঙ্গল।
বিষাক্ত মদ – পরেশ সরকার
এই পূজা পার্বণের দিনে আবার সাত সকালে মদ গিলে এয়েচো। লজ্জা করে না। এমন ভাতারের মুখে ছাই। বলি কোন লজ্জায় মুখ দেখাও। কথাটা রাগে গজরাতে গজাতে চিৎকার করে বলেছিল সুষমা।
—খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল শ্রীকান্ত নস্কর। সেই বা কম কিসে। দস্তুর মতো হপ্তা প্রায় সাতশ আটশ টাকা, সুতাকল থেকে। তুই মেয়েমানুষ, মেয়েমানুষের মতো থাকবি। বেশী ফ্যাচ ফ্যাচ করবিনা তো। আমি কি তোর বাপের টাকায় মদ গিলি। পয়সা উপায় করে খাই। আমাকে বেশি ঘাঁটাবি না বলে দিচ্ছি। মদের তুলনা দিবি না খবরদার।
বলতে আমার বয়েই গেছে? তুই মরবি অকালে। আমার আর কি? ছেলে পুলে নিয়ে পথে বসবো। তোর ছেলেমেয়েরা ভিগ মেগে খাবে। পরের বাড়িতে খুদকুড়ো ভেঙে খাবো। কথা শোনার লোক হলে তো শুনবে। সবই তো আমার কপাল গো। নাহলে এমন মোদোমাতাল ভাতার কারোর কপালে জোটে? বলেই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলো সুষমা।
ছেলেমেয়েরাও বড় হয়েছে। দুটি ছেলে একটি মেয়ে। মেয়েই বড়, ক্লাস নাইনে পড়ে। বাবামায়ের এই কদর্য ঝগড়া দেখে, বিষিয়ে উঠেছে তাদের মন। পরের দুটি ভাই একটি সেভেনে, অন্যটি ফাইভে পড়ে। বাবার এই পুজোর দিনে এভাবে মদ খেয়ে মাতলামি করা, তাদেরও ভাল লাগে না। সূতোকলের কাজ। কখনও ডে ডিউটি কখনও নাইট ডিউটি। আর নাইট ডিউটি হলেই শ্রীকান্ত সকালে বাড়ি ফিরবে টলতে টলতে। তখন বাড়ির সবাই বুঝে ফেলে, বাবা তাদের তৈরি হয়েই এসেছে। ছেলেমেয়েরা চুপচাপ ভয়ে জড়ো হয়ে থাকে। তারা জানে ঈশান কোণে মেঘ জমলে যেন ঝসৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি বাবা মদ খেয়ে ঘরে ঢুকলে মা ঝগড়া করবেই। আর সেই ঝোড়ো ঝগড়া দক্ষযজ্ঞও বাধিয়ে দিতে পারে। আর এসব ভয়াবহ বাবা মায়ের কাণ্ডকারখানা দেখে ছেলেমেয়েরাও বিগড়ে যেতে বসেছে। অথচ সেদিকে বাবা মায়ের খেয়াল নেই। পাড়ায় বাড়িটির নাম হয়ে গেছে, ঝগড়াটে বাড়ি। বড় মেয়ে লীলা পাড়ায় মুখ দেখাতে পারেনা, লজ্জায়। তাকে দেখলেই তার স্কুলের বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, কিরে, কি নিয়ে তোদের বাড়ি ঝগড়া হচ্ছিল। বাবা মায়ের মধ্যে তো দিনরাত ঝগড়া হয়, তোদের বাড়িতে। তোরা থামাতে পারিস না।
ছেলেমেয়েরা ঝগড়া করলে বাবামায়েরা বকে। ভাইবোনের মধ্যে মারামারি। করলে, বাবামারা মারধোর করে। কিন্তু বাবামায়ের মধ্যে ঝগড়া রাগারাগি হলে, কে তাদের বকবেন। বকার যে কেউ থাকে না। তখন ছেলে আর মেয়েরা দিশেহারা। ছোট ভাই দিদিকে বলল, মা, বাবার ওপর খুব রেগে গেছেরে বড়দি। বড়দি লীলা তাকে বলল, ছোটো চুপ কর। মা রেগে আছে। তোর পিঠেই ভাদ্দরে তাল ফেলবে। ভ্যাবাচেকা খাওয়া ছেলেমেয়েরা একেবারে কেঁচো হয়ে গিয়েছিল। মায়ের অশ্রাব্য গালাগাল শুনে—আর সুষমা তার দজ্জাল গলায় তখনও সমানে গালি দিয়ে যাচ্ছে, শ্রীকান্তকে শুনিয়ে শুনিয়ে। মদ্দ মানুষ হয়েছে গো। হপ্তা পাওয়া টাকার অর্ধেকটা মদ গিলে শেষ করে এসে আমাকে কিছু টাকা ছুঁড়ে দিল। তুমি শালা সংসার সামলাও, চোদ্দগুষ্ঠির পিণ্ডির যোগাড় আর আমি করতে পারবো না, বলে দিলাম। বাবু আমার নবাবপুর। বন্ধু বান্ধবদের মদ গিলিয়ে টাকা সাবাড় করে দিচ্ছে। আমি কি এ সংসারের ঝি চাকর নাকি? রইল তোর সংসার পড়ে, যেদিকে দুচোখ যাবে চলে যাবো। এ সংসারের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিই।
