সুলতা শিবনাথের পাঞ্জাবি ধরে হ্যাচকা টান মেরে বললো, ‘গেছে, মানিব্যাগটা গেছে?’ বলতে বলতে সে নিজেই হাত ঢুকিয়ে দিলো পকেটে। শিবনাথ বললো, ‘না তো। মানিব্যাগ আছে।’ সুলতার হাতে উঠে এলো মানিব্যাগটা। দু’চোখে তার দ্যুতি ফিরে এলো। বললো, ‘তবে তুমি ওরকম করে আছো কেন?’
সচেতন হতে চাইলে শিবনাথ। বললো, ‘কেমন?’
-কেমন যেন। কি যেন একটা হয়েছে তোমার। এখনো তোমার ভয় করছে? কেন, আমাকে তো পেয়ে গেছ।
সবই তো ঠিক আছে। কিছু তো হারায় নি।
হারিয়েছে কিনা দেখবার জন্যেই সুলতা আর একবার তার সমস্ত মালপত্রের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো।
শিবনাথের সারা মুখে ঘামের ওপর বালি পড়ে পুরনো ঘরের ভাঙা খসা পলেস্তারার মতো দেখাচ্ছে। শুকনো ঠোঁট দুটিতে জমে গেছে বালি। মাথার চুল সাদা। সে প্রায় একটা ক্লাউনের মতো পেশার দায়ে জোর করে হেসে বললো, হারায় নি কিছু। মানে কিরকম একটা অব্যবস্থা, হট্টগোল…’
সুলতা মুখ মুছতে মুছতে বললো, ‘জঘন্য!’
গাড়িটা কখন চলতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে, ঝড়টা এখনো গাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এখনো নানান ফাঁকে ফাঁকে সোঁ সোঁ করে ঢুকছে বালি। এখনো সেই খ্যাপাটা হাসছে অট্টরোলে। হাততালি দিচ্ছে নেচে নেচে।
শিনাথ বাথরুমে ঢুকলো। দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াতেই আয়নার বুকে নিজের মুখোমুখি হলো সে। আর তক্ষণাৎ সেই আলিঙ্গনের অনুভূতিটা পিলপিল করে, বেয়ে বেয়ে বেড়াতে লাগলো তার সারা গায়ে। শিকনাথ ধিক্কার দিলো নিজেকে। ছি ছি করলো। মুখ ফিরিয়ে নিলো, নিজের ছায়ার দিক থেকে। তু তার সারা গায়ে বিস্মিত বাবা তীব্র অনুভূতিটা দপদপ করতে লাগলো। তার দু’চোখের শূন্যতা ভরাট হতে চাইলো না কিছুতেই। সে যেন সভয়ে দেখলো, কত অব্যর্থভাবে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি তুলে নিয়েছিলো মেয়েটি। কিন্তু ব্যাগ সে নেয় নি। শেষ পর্যন্ত যা সে নিয়েছে তার কোনো মূল্য নেই সংসারে। কোনো কৈফিয়ত নেই সমাজের কাছে, নীতির কাছে যুক্তির কাছে। একজন বিবাহিত পুরুষ একজন সাধারণ সব-এডিটরের লজ্জাকর ধিকৃত তৃষ্ণার গ্লানি, মৌমাছির মত নিজেরই গায়ে হুল ফুটিয়ে একটি আস্বাদ খুঁজবে।
আর একজন, দেখে মনে হয়েছে, স্বামীকে সে বলতে পারে নি। কেবল কুটনা অবিশ্বাসী এক পুরুষের জেনে শুনে স্বেচ্ছাকৃত আলিঙ্গনের গ্লানি অনুভব করবে। এবং সেও দার্জিলিং যাচ্ছে। হয়তো দেখা হবে। তীব্র সন্দেহে ঝলকে উঠবে আয়ত চোখ দুটি। রুদ্ধ তীক্ষ্ণ স্বক্সের ভৎর্সনা হানবে পাহাড়ের বাতাসে, আপনি কেন? আপনি কেন?
জবাব দূরের কথা। শিবনাথের অনুভূতির পিঞ্জরে বোবাটা বু মরবে দাপিয়ে দাপিয়ে। বিশ্বের এক ভয়ংকর বিস্ময়ে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকবে তার স্ত্রী সুলতার স্নেহে ও ভালোবাসায় রচা সংসারের দিকে।
ট্যাপ খুলে দিলো কিনাথ। জল গরম আর বালি মেশানো। এ বালি কোনো রই বাদ দেয়নি দেখা যাচ্ছে। বালি মেশানো গরম জল শিবনাথ আঁজলা মুখে ছিটিয়ে দিতে লাগলো।
বাইরে যখন এলো, তখনো বালি উড়ছে সারা কামরায়।
.
সুলতা ডাকলো, ‘এই। এই, ওঠো না।’
শিবনাথের দ্বাঙ্গ তখনো লেপের তলায়। সুলতা রীতিমতো প্রসাধন করে উলেন ক্লোক চাপিয়ে বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত। ওরা দশদিন হলো দার্জিলিং এসেছে।
শিনাথ ক্লান্ত সুরে বললো, উঠতে ইচ্ছে করছে না। উত্তরে জানালাটা খুলে দাও না সুলত।
সুলতা জানালা খুলে দিতে দিতে বললো, ‘কী হবে ছাই খুলে দিয়ে। ওই ছিচকেপোড়া রোদ, কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা নেই।’
জানলাটা খুলে দিতেই এক ঝলক রোদ ঢুকলো ঘরে। সামনে ধূর আকাশ। পুব ঘেঁষে। দূরে কালিম্পং-এর ইশারা। সামনে ভুটিয়া বস্তির ধাপে ধাপে নেমে-পড়া বনস্পতির শীর্ষ। তারপরের শূন্যতাটা যেন লেবং মালভূমির মাথার ওপরে। ভুটিয়া বস্তির পুব উঁচুতে—ভাড়াটে বাংলোর একটি ঘর নিয়েছে ওরা। খাবার আসে হোটেল থেকে। চায়ের সরঞ্জামটাই শুধু রেখেছে সুলতা নিজের হাতে।
ঘুম-জড়ানোমোটা স্বরে বললো শিবনাথ, ‘ও কি অত সহজে দেখা দেয়। কত সাধ্য সাধনা করতে হয়, তবেই না আবির্ভাব।‘
সুলতা এসে বসলো শিবনাথের শিয়রে। বললো,’ তা তো বুঝলুম, কিন্তু তোমার কি হয়েছে বলছ না কেন, বলো তো? তুমিও যে কাঞ্চনঝঙঘার মতো মেঘে ঢাকা হয়ে রইলে।‘
শিবনাথ হাসবার ভান করে বললো, ‘কি আবার হবে।‘
—সেইটাই তো শুনতে চাই। সেই যে মণিহারিঘাট থেকে কি হলো, তারপরে আর ঠিক সে মানুষটাকে তো খুঁজে পাচ্ছিনে।
–কী খুঁজে পাচ্ছ না?
—সেটা হাতে করে তুলে দেখাতে পারছিনে। ওরকমভাবে দেখানো যায় না, না হলে দেখাতুম।
—তা হলে চেখে দেখাও। সুলতা পা দাপিয়ে, ঠোঁট ফুলিয়ে বললো, না সত্যি, ফাজলামো নয়।
শিবনাথ যেন কথা বাড়াবার ভয়েই তাড়াতাড়ি সুলতাকে টেনে এনে চুমু খেলো। তারপর বললো, ’বোকা কোথাকার।‘
সুলতা বললে, হ্যাঁ, ভোলানো হচ্ছে আমাকে।
বলেও কিন্তু সুলতা উঠে পড়ে বললো, আমি তাহলে যাচ্ছি। ফ্লাস্কে চা আছে, খেয়ে এসো তাড়াতাড়ি।
চলে গেল সুলতা। ম্যালে গেল, বেড়াবে, বসে থাকবে বলে। প্রথম প্রথম দু’দিন শিবনাথের সঙ্গে এখানে সেখানে হেঁটে হেঁটে গেছে। কিন্তু পারে না। ওর হৃৎপিণ্ডে চাপ লাগে। রক্তহীন রুক্ষতাটা রুগ্নতায় পর্যবসিত হয়। ভিটা ওর অনেকখানি শূন্য।
