গাড়িটা কতদূর? লোকের ধাক্কা, ছুটোছুটি, চিৎকার। তারই সঙ্গে কতকগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়া উটের মতো ঘরের ছায়া থেকে গরম চা আর খাবারের ডাকাডাকি চলছে।
শিবনাথের মনে হলো সুলতা হাসছে। শিবনাথ মুখ নামিয়ে প্রায় বদ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলো, হাসছ নাকি?
চকিত মুহূর্তের একটি আড়ষ্টতায় যেন সুলতা স্তব্ধ হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই। সহজ হয়ে বললো, হ্যাঁ। তোমার গায়ে হঠাৎ এত শক্তি এলো কোথা থেকে তাই ভাবছি। আমাকে পিষে ফেললে যে!
হেসে উঠতে গিয়ে শিবনাথের সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুৎচমক লাগলো। সে তখনো হাঁটছিলো সামনের দিকে। সামনের আলোটার দিকে তাকাবার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু তার সমস্ত অনুভূতি দুটি হারে আলিঙ্গনের ঘন স্পর্শে বোমার মতো দাপাতে লাগলো। বালিতে ভরে যেতে লাগলো তার উদ্দীপ্ত চোখ। সে ডাকতে গেল। ঝড় যেন থাবা মারলো তার মুখে। সে আবার মুখ খুললো। ডাকলো, ‘সুলতা।‘
আর একটি চকিত মুহূর্তে স্তব্ধতা। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে সরে গেল শিবনাথের দেহসংলগ্ন ছায়া। ঝড়ের শাসানির মধ্যেও শোনা গেল অস্ফুট আর্তস্বর। শিবনাথ দেখলো, লাল বোম্বাই সিল্ক নয়, হালকা আসমানি জর্জেট। ফর্শা নয়; শ্যাম চিকন বর্ণ। সুলতা নয়, লীলা। আশ্চর্য!
ঝড়টা, যেন থমকে গেল। বালি সরে গেল। দপদপিয়ে উঠলো বিশ্বের সব আলো। ক্ষোভে ও বিস্ময়ে প্রায় অস্ফুট কান্নার মতো শোনা গেল, ‘আপনি? আপনি কেন? আপনি কেন?’
শিবনাথের মনে হলো তার কান বন্ধ হয়ে গেল বালিতে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। চোখ অন্ধ হয়ে গেল। সে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, মাপ করবেন; আমি, আমি জানতে পারি নি।
বলেই সে চিৎকার করে উঠলো, ‘কুলি! কুলি দাঁড়াও এখানে।‘
আবার সে ভদ্রমহিলার দিকেই ফিরলো। বললো, ‘আমি এখুনি দেখছি আপনার স্বামী কোথায়। আপনি দাঁড়ান একটু দয়া করে। মাপ করবেন, আমি সুলতাকে—’
কথা শেষ না করেই, পিছনদিকে ছুটলো। ঝড়টা এবার তাকে তাড়া করলো পেছনে থেকে। মনে হলো সে উড়ে যাচ্ছে! আর খ্যাপা ঝড়টা হাসছে তার পেছনে হাততালি দিয়ে। কাঠের সিঁড়ির কাছে এসে সে চিৎকার করে ডাকলো, সুলতা! সুলতা!
কয়েকটি লোকের ভিড়ের মধ্যে, সুলতার রোরুদ্যমান গলা শোনা গেল, এসেছ, এসেছ তুমি? এই যে, এই যে আমি? এই যে।
ভিড় ঠেলে প্রায় ঝাঁপিয়ে এসে পড়লো সুলতা শিবনাথের বুকে। বোঝা গেল, সুলতার চিৎকারেই লোক জমে গেছে। চারদিক থেকে শুধু শোনা গেল, যাক, পাওয়া গেছে।
সুলতা তখন সমূহ আতঙ্কটা পার হয়, না কেঁদে পারছে না। কিন্তু খানিকটা অমনোযোগীভাবেই শিবনাথ তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলো, কেঁদ না সুলতা। কদবার কি আছে? এখানে কি মানুষ হারায় নাকি? ওই তো স্টেশন, ওখানেই থাকতুম নিশ্চয়। তোমাকে ফেলে তো আর চলে যেতুম না গাড়িতে করে।
কান্নার মধ্যেও সুলতার অভিমান ফুটে উঠলো, কি করে আমাকে ফেলে চলে গেলে তুমি?
—কি আশ্চর্য!
বলছে, কিন্তু শিবনাথের দৃষ্টি ছায়াদের ভিড়ে। বললো, তোমাকে কি আমি ইচ্ছে করে ফেলে গেছি নাকি? আমি মনে করেছি, তুমি আমার সঙ্গে আছ।
বালি খেয়েও সুলতা একবার মুখ না ঢেকে বললো, কি করে মনে করলে? আমি তো তোমার গায়ের সঙ্গে লেপটে ছিলাম।
শিবনাথ যেন সচেতন হলো একটু। একটু চুপ করে রইলো। বলতে গেল, কিন্তু পারলো না। মনে হলো, সুলতা ব্যাপারটাকে তার নিজের প্রতি অবিচার ভেবে নেবে। বললো, আরে! সবাই তো সবার সঙ্গে লেপটে যাচ্ছে। এর আবার
থেমে গেল। সেই লাইটপোস্টটা। চোখের উপর থেকে রুমালটা একটু সরালো শিবনাথ। দেখলো, ভদ্রমহিলা একটি বেডিং-এর ওপর মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে
আছেন। পাশে ভদ্রমহিলার স্বামী। কাছে যাবে নাকি শিবনাথ?
সুলতা বললো, ‘দাঁড়ালে কেন?’
–না, কুলিটাকে দেখছি। এখানেই ছিলো।
তার গলার স্বর শুনেই যেন ভদ্রমহিলা চোখ তুললেন। বালির ঝড়, মানুষগুলো সব ছাড়া। লু মনে হলো শিবনাথের ভদ্রমহিলা তার দিকেই তাকালেন। তারপরে দৃষ্টিটা আনুসরণ করেই নিজের কুলিটাকে চোখে পড়লো শিবনাথের। সুলতাকে নিয়ে সে এগিয়ে গেল।
তারপর গাড়িতে ওঠার পালা। সেখানেও ধস্তাধস্তি মারামারি। রিজার্ভেশন ক্লার্ক ভদ্রলোকটি প্রায় দয়া করে তাদের তুলে দিলেন। কিন্তু গোটা কামরাটা ভরতি শুধু বালি আর বালি। সবুজ রং চামড়ার সীটগুলি সাদা বালিতে ভরা। মানুষগুলো সব বালির পুতুল। সুলতা চিনতে পারে না শিবনাথকে। শিবনাথ পারে না সুলতাকে। সবাই ঝঋ করে কাঁচের শার্সি ফেলতে লাগলো। ফেলতে না ফেলতে বালির স্তর পড়তে লাগলো কাঁচের গায়ে। এ ঝড়ের এই জেদ, যতই সে বাধা পাবে রুদ্র হবে ততই। শার্সির তলায় সামান্য যে পিপড়ে ঢোকার মত ফাঁক, সেখান দিয়েও বালি ঢুকছে বাতাসের ঝাপটায়। যেন বালি নয়। চাক ভাঙা বোলতারা গর্জন করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
সুলতা বসলো। শিবনাথ বসতে গেল, পারলো না। বাইরে যাবে মনে করে দরজার দিকে এগুতে গেল। তার পা সরলো না। এখনো সে হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তবু তার দু চোখ ভরে একটি অদ্ভুত শূন্যতা।
সুলতা শিবনাথকে এই অবস্থায় দেখে, মুহূর্তে পাংশু হয়ে উঠলো। ছোট কামরাটার সবাইকে চমকে দিয়ে সে প্রায় আর্তস্বরে বলে উঠলো, হয়েছে! সর্বনাশ হয়েছে!
শিবনাথ ফিরলো, কিন্তু তার শূন্যতা ঘুচলো না চোখের। গলার স্বরে কোন সুর নেই যেন। বললো, ‘অ্যাঁ?’
