তবু সে বললো, আরে তুমি ভাবছ কেন? যাওয়া হবেই। না হয় পরের প্যাসেঞ্জারে যাব। আমি তো ডিউটিতে যাচ্ছিনে। তুমি হ্যান্ডব্যাগটা হাতে নাও, নইলে এবারও কেউ টানাটানি করবে হয়তো।
বলতে বলতেই মুখে রুমাল চাপা দিলো শিবনাথ। বালির তাত কমেছে বটে, ঝাপটার দাপট এপারে দ্বিগুণ। রাশি রাশি ছুঁচ ছুঁড়ে মারার মতো। বাতাসের বেগ আরো প্রবল। খ্যাপাটা যে এপার থেকেই ডাক ছাড়ছিলো, বোঝা গেল এবার তীব্র গর্জনে। এপারে যেন সে সত্যি একটা নারে ফাঁদ-ই পেতেছে। বাতিগুলো শুধু ছায়াময়ী কুয়াশার মতো কী এক রহস্যে যেন হাসছে।
সুলতা প্রায় হাল ছেড়ে দেবার মতো, বললো ‘কী হবে? এ যে আরো ভয়ংকর!’
হেসে ফেললো শিবনাথ। বললো, ‘কী আবার হবে। তখন যেমন করে এসেছ, এখনো তেমন করেই যাবে। গাড়িতে উঠলেই সব শেষ। তারপরে হিমালয়ে গিয়ে যখন উঠবে—’
—থাক।
ধমক দিলো সুলতা। আঁচল চাপা মুখ থেকে তার স্বর ভেসে এলো, এরকম অবস্থায় অনেক গোলমাল হতে পারে। কেন যে মরতে হার-চুড়িগুলি পরে রেখেছিলুম। টাকা পয়সা খুব সাবধান, কিছু হারিও না যেন।
—আরে না না, কিছু হারাবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাক।
শিবনাথ সান্ত্বনা দিলে হেসে। সুলতা বললো, কি করে নিশ্চিন্ত থাকবো। এসব আপদের কথা তো তুমি কিছুই বলো নি।
শিবনাথ বললো, ‘আমি কি জানতুম নাকি?’
এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘রোজ রোজ কি আর এমন ঝড় ওঠে এখানে। মাঝে মধ্যে হয়। আজ আমাদের কপালে জুটে গেছে।‘
স্টীমারটা একটা দীর্ঘ বাঁক নিয়ে জেটির গায়ে ঠেকলো। পরমুহূর্তেই ডাকাত পড়ার মতো, আবার সেই প্রেতছায়া কুলিরা। এবার ঝড়টা যত বেগে, কোলাহল তার চেয়ে বেশী। নিচের ডেকে হুড়োহুড়ি মারামারি লেগে গেছে। কুলিরা ওপরে এসেও মালপত্র ধরে টানাটানি শুরু করেছে। ওপরের লোকও হুড়মুড় করে নিচে নামতে চাইছে তাড়াতাড়ি। শিশুর কান্না, মেয়েদের চীৎকার, আর কুলিরা যেন এরই সঙ্গে তাল রাখছে হৈ-হৈ শব্দে।
আর এবার স্টীমারে থাকতে থাকতেই মনে হলো, যেন কেউ মুঠো মুঠো বালি চোখে মুখে ছুঁড়ে মারছে। এখন আর লু বইছে না বটে। পশ্চিমের এই দিগন্ত উন্মুক্ত রুক্ষ্ম চরার বাতাসে এখনো উত্তাপের আভাস। মেঘ কিংবা নক্ষত্র কিছুই নেই সামনে। আকাশটা উধাও হয়ে গেছে কোথায়। আছে শুধু কতকগুলো এক-চোখো ভুতুড়ে আলো। যেগুলো কোনো নিশানই দেয় না।
শিবনাথ ছটফটিয়ে উঠলো। অনেকেই নেমে পড়ছে তার সামনে দিয়ে। সে আর কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না। কুলিকে মাল তুলতে বললো।
সুলতা তাকে কঠিন বাহুপাশে আঁকড়ে ধরেছে। শিবনাথের সামনে লোক, পিছনে লোক। তাকে কে ঠেলছে আর সে কাকে ঠেলছে, কিছুই বলা যায় না। সবাই সবাইকে ঠেলছে। তার মনে হলো সিঁড়ি না ভেঙেই হুস করে নেমে এলো নিচে। সুলতা বারে বারে আর্তনাদ করে উঠছে। কিন্তু এখন আর কান দিতে গেলে চলবে না। বরং শিবনাথের মনে হলো, লোকের মধ্যে থাকলে বালির আক্রমণের সামনে থেকে অনেকখানি রেহাই পাওয়া যায়।
সিঁড়িটার নিচে নামতেই সুলতা ককিয়ে উঠলো, ‘উঃ, কিছু দেখতে পাচ্ছিনে।’
—দেখতে হবে না তোমাকে। কথা বলো না, আবার বালি ঢুকে যাবে মুখে।
এবার বোধ হয় সত্যি কাঁদছে সুলতা। বললো, ‘বাকী আছে নাকি! বালি তো খাচ্ছিই।’
শিবনাথ দম বন্ধ করে বললো, ‘জোরে ধর সুলতা। এখানটায় কাঠের সিঁড়িটা। খুব ভিড় এখানে।’
–কোথায় যে কম।
রাগে এবং দুঃখে সুলতা বললো শিবনাথেরই শরীরের কোনো একটা অংশ থেকে।
কিন্তু সিঁড়িটা পার হতে হতে শিবনাথের মনে হলো, সুলতার বন্ধন যেন শিথিল হয়ে যাচ্ছে!
-কি হলো!
—কিছু না। সুলতার প্রায় অস্ফুট গলা শোনা গেল।
সিঁড়ির বাইরে আসতে আসতে সুলতা ছিঁড়ে গেল শিবনাথের গা থেকে। আর সিঁড়ির কাছে আসামাত্রই প্রচণ্ড বালির ঝাপটা চাবুক কষালে চোখে মুখে। চোখে। একরাশ পিঁপড়ে হুল ফুটিয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে, হাত বাড়িয়ে ডাকলো শিবনাথ, সুলতা।
কাছের ভিড় থেকে জবাব এলো, ‘এই যে।‘
শিবনাথ লোকের ধাক্কায় সরে গেল একপাশে। সে ডাকলো ‘এস! এই, এই কুলি।‘
কুলিটা দাঁড়িয়ে পড়েছিলো আগেই।
চোখ ঘষে শিবনাথ সামনে তাকালো কোনোরকমে। দেখলো, সামনেই সুলতার চুড়ি-পরা প্রসারিত হাত। শিবনাথ ধরলো হাতটা, একেবারে টেনে নিয়ে এলো বুকের কাছে। রুমাল কামড়ে ধরে মুখে কোনোরকমে বললো, কথা বলো না।
সুলতা খালি বললো, ‘উঃ!’
সে শিবনাথের কাঁধ না ধরে, দু’হাতে সর্বাঙ্গ বেষ্টন করলো।
মানুষের মন বড় বিচিত্র। শিবনাথের সহসা সুলতাকে বড় বেশী ভালো লাগতে লাগলো। শুধু আপন প্রাণ বাঁচানো নয়। যেন শিবনাথকে বাঁচাবার জন্য তার বুক দিয়ে আলিঙ্গন করেছে। এবার সে ঝুলে পড়ে নি। যেন শিবনাথ হোঁচট খেলে, সেও ধরে ফেলবে।
শিবনাথ বাঁ হাত দিয়ে তাকে আরও ঘনিষ্ট করে নিলো। এতো ভালো লাগলো, মনে হলো, এ দুর্দৈবের মধ্যে সুলতাকে সে যেন নতুন করে পেলো। আর অবাক্ হলো শিবনাথ, ঝড়ের দোলাটা যেন তার রক্তেই লেগেছে। সে দ্রুত এগুতে লাগলো অস্পষ্ট ছায়া ট্রেনটাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু বালির ঝড়টা এগুতে দিতে চায় না। সামনের মাটিই যেন চৌচির হয়ে ছিটকে লাগছে চোখে মুখে। বাতাস শাসাচ্ছে, ফুসছে, পরমুহূর্তেই দূরে সরে গিয়ে হাহা করে হাততালি দিয়ে হাসছে।
