শিবনাথ বললো, এ বালি এত সহজে যাবে না সুলতা। এখন থাক।
সুলতা ভ্রূ কুঁচকে একটু শাসন করলো শিবনাথকে, ধুলো বালিতে তোমার একটু ঘেন্না নেই আমি দেখছি। মুখটা অন্তত মুছবে তো।
শিবনাথ দেখলো, সুলতা মুখ মুছে নিয়েছে ইতিমধ্যে। সুতরাং তারও মুক্তি নেই। রুমালটা নিয়ে শিবনাথ মুখ মুছলো। তারপর হ্যান্ডব্যগটা খুলে আর একটি রুমাল বার করতে করতে, মুগ্ধ চোখে আর একবার ব্যাগটি দেখলো সুলতা। বললো, ‘গেছলো একটু হলেই।‘
তারপরই তার ঠোঁটদুটি বেঁকে উঠলো শ্লেষে, ‘এদিকে তো সারাটি পথ টেনে স্বামীর সেবা আর বই পড়ে কেটে গেল। যেন ভাজা মাছটিও উল্টে খেতে জানেন না। কিন্তু আমাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঠিক দেখছিলো।‘
শিবনাথ ভয় ভয় চোখে তাকালো আশেপাশে। কী জানি, যার উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলা হচ্ছে, তিনি হয়তো আশেপাশেই আছে। আর সুলতার কথাগুলিও প্রায় সেই রেল কর্তৃপক্ষের নোটিসের মতো, …জুয়াচোর চোর ও পকেটমার নিকটেই আছে।‘ শিবনাথ হেসে গলা নামিয়ে বললো, আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন, আমাদের ব্যাগটার দিকে নয় তো?’
সুলতা হাসলেও, ঠাট্টা করলো না। বললো, তা কি বলা যায়। শিবনাথ উঠে পড়লো।
-কোথায় যাচ্ছো?
—বসোখাবারের ব্যবস্থা দেখি। ওপারে গিয়ে আর খাওয়া যাবেনা শুনছি। সেই একেবারে কাল দুপুরে দার্জিলিং গিয়ে।
স্টীমার তখন ছেড়েছে। সকলেরই ছুটোছুটি পড়েছে ডাইনিং রুমের দিকে।
সুলতা কুঁচকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো শিবনাথের চলে যাওয়ার দিকে। এই নোংরা হাতে পায়ে, ভিড়ের মধ্যে কেউ খেতে পারে?
পারে। না পারলে এত লোক ছুটোছুটি করছে কেন। আর শিবনাথ লোকের হাতে প্লেট চাপিয়ে এভাবে ভাত মাংস একেবারে কোলের ওপর এনে উপস্থিত করতে পারে নাকি?
অগত্যা গ্লাসের জলে হাত ধুয়েই আরম্ভ করতে হলো। খোঁপাটা ভেঙেছে সুলতার আগেই। আঁচলটা লুটোচ্ছে এখনো। বালির ঝাপটায় নাইলনের প্রাণও মূৰ্ছ। গেছে প্রায়। কেবল শিবনাথ একবার কানে কানে না বলে পারলো না, তোমার জামার একটা বোতাম কিন্তু অনেকক্ষণ ছেড়েছে। আঁটবে কখন?
সুলতার মুখ পাংশু দেখালো। সে একবার চোরাচোখে তাকিয়ে দেখলো, সত্যি তাই। ফিসফিস করে বললো, অসভ্য! এতক্ষণ বললানি কেন?, বাঁ হাতে আঁচলটা তুলে দাও শীগগির।
আঁচলটা তুলে দিতে দিতে বললো শিবনাথ, যা ঝড়!
যদিও সুলতার শরীরের লক্ষ্যটা ঔদ্ধত্যের দিকেই, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক নয়। অতি দুরন্ত বিজ্ঞাপনের সাহায্য বোধ হয় সেজন্যই তাকে নিতে হয়েছে। গোটা শরীরের কাঠামোটা নিখুঁত ছিলো সুলতার, সৌন্দর্যটুকু ধরা দেয়নি প্রায় কোথাও। সর্বত্র একটা কাঠিন্যের স্পর্শ। এমন কি চোখের কোণে, ঠোঁটের কুঞ্চনেও। ফর্সা রং টুকু বোধ হয় সেইজন্যেই কেনো দীপ্তি দেয়নি? দিয়েছে রক্তহীন রুক্ষতা।–তার পাশে শিবনাথকে মোটামুটি দেখাচ্ছে কালো, সাধারণ মাপের বলিষ্ঠ চেহারা। সহসা দেখলে ক্লান্ত আর চিন্তাশীল মনে হতে পারে। কিন্তু তিরিশ পেরিয়েও তার আপাত শান্ত চোখে, আলোছায়ার দ্যুতিতে, একটু স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে যেন ঠেকে আছে কোথায়।
সাত বছরের চাকরি আর আড়াই বছরের বিয়ে, এই নিয়ে ঘরে বাইরের লেনদেন। বিধবা মা আর দিদি আছেন। একই সংসারের তারা ভিন্ন লোকবাসী। সাব এডিটরের টেবিল থেকে সুলতার খাটে, জীবনটাকে এরকম ভাগ করে দেখলেও ক্ষতি নেই।
প্রেমের ফাঁদ নাকি পাতা বনে। তাই এক আধবার যে পা আটকায়নি তা নয়। জীবনধারণের মারে সেগুলি আপনি খুলে গেছে। শেষ পর্যন্ত সুলতা, রীতিমতো দর কষাকষি করে। নিশ্বাসের ওপরে একটু বাতাস, এরকম একটি অবস্থার বাড়ির মেয়ে ও। কিছু নগদ টাকা, কিছু গহনা, খাট আর ড্রেসিং টেবিল নিয়ে ও এসেছিলো। আরো কিছু ঘর আর দম্পতির সাজবার মতো অনেক উপকরণ।
বিয়ের পর প্রথম গিয়েছিলো মধুপুরে। সেটা ছিলো সুলতাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া। তারপরে এই দ্বিতীয় যাত্রা একেবারে হিমালয়ে, রফবাতাস এখন যেখানে শীত ধরাচ্ছে।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে সেই কথাটাই বললো সুলতা, মনে আছে সেই মধুপুরের কথা?
একটু যেন ভয়েই হেসে বললো কিনাথ, ‘খুব!’
অমনি সুলতা অভিমানাহত কটাক্ষ হেনে, কনুই দিয়ে খোঁচা দিলো শিবনাথকে। বললো, তাতে খুব হবেই। আমার সেই মাসতুতো বোন মিলিটা তো ডাইনীর মতো পেয়ে বসেছিলো তোমাকে।
হেসে ফেললো শিবনাথ। আরে, কী আশ্চর্য! কী যে বলো?
–না বাপু, তুমিও মেয়েন্যাকড়া কম নও।
–আমার তো ধারণা মেয়েরাই ছেলেনেকড়ি।
—ইস্।
তা বটে। আর সব বিবাহিতা মেয়েদের মতোই, সুলতারও স্বামী ছাড়া সব পুরুষ ছার। পাপের মধ্যে মিলি একটু জামাইবাবুর ভক্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু সুলতা নিশ্চয় মরে গেলেও বিয়ের আগে অমন জাহবাবুর ভক্ত হতে পারতো না। পারতো না বলেই তার রচিত সংসারটা প্রেমের সংসার বলে ঘোষিত। শিবনাথ সেইটুকু জেনেই শান্ত।
কিন্তু চোখগুলো জ্বালা করছে কেন? যাত্রীদের সকলের মধ্যেই যেন একটু চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে।
ক্লিথ সামনে তাকালো। দূরের বিন্দু আলোগুলো তখন একটু স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু আলোগুলো যতটা দূরে ভাবা গিয়েছিলো ততটা দূরে নেই। বোঝা গেল, স্টীমাঝে হুইসেল আর সুলতার প্রায় ডুকরে ওঠা ওগো আবার বালি। আবার বালির ঝড়।
ততক্ষণে কিনাথও চোখ ঢেকেছে। বাতাসটা যে এপর থেকেই ওপারে যাচ্ছিলো, তা বোঝা গেল। বালির ঝড়ের তাণ্ডবেই বাতিগুলোকে আরো দূরে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু যে মুহূর্তে বালি তার সীমার মধ্যে পেয়েছে স্টীমারটাকে, সেই মুহূর্তে চমকে উঠেছে ধ্বই। এবার ঝিনাথও যেন একটু মুষড়ে পড়েছে। কারণ এবার ভিড় বেশী। তাড়াতাড়ি গিয়ে গাড়িতে না উঠতে পারলে, জায়গা পাওয়াই দুষ্কর। যদিও, সীট রিজার্ভ আছে তাদের।
